যৌনপল্লীর তিন মেয়ের গল্প

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৩৮:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হল ভারত। এরপর কে’টে গেছে ৭০ বছর। এই সময়কালে বদলে গেছে অনেক কিছুই। আবার অনেক কিছুই বদলায়নি। এই যেমন যৌন ব্যবসা। সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন পেশা হিসাবে সেমিনারে-বৈঠকে বিস্তর আলোচনা হলেও রেডলাইটের জীবন কি কিছুমাত্র বদলেছে? ভা’রতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে কলকাতার একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যৌ’নকর্মীদের জীবনযাপনের গল্প। সংবাদে যৌ’নকর্মীদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

সোনাগাছির কোহিনুর

কোহিনুর শিক্ষিকা হতে চেয়েছিলেন। বাবা-মা-ভাই আর কোহিনুর মিলে পরিবার। ছোটো বেলায় স্কুল থেকেই শিক্ষিকা হওয়ার বাসনা জাগে মনে। কিন্তু বাচ্চা মে’য়েটা জানত, অভাবের সংসারে পরিবারে তার এই ইচ্ছা বিশেষ পাত্তা পাবে না। তবু একদিন কোহিনুর মনের কথা বলে ফেলল বন্ধু শবনমকে। এরপর দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হল। কোহিনুরের স্বপ্ন সফল করতে শবনম বন্ধুকে নিয়ে এল কলকাতার শোভাবাজারে।

শবনম এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল কোহিনুরকে। কোহিনুরের বাড়ির লোক এসব কিছুই জানত না। কারণ কোহিনুর আর তার বান্ধবী বাড়িতে না বলে পালিয়ে এসেছে। শবনমের পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানুষটার হাত ধরে স্বপ্ন সত্য করার স্বপ্ন দেখছিল যে মে’য়েটা, তার হঠাৎ চেতনা ফিরল। এ কোথায় এসে পড়েছে সে! এখানে যে সবাই ছুঁতে চায়। শুতে চায়‍! অচিরেই সে জেনে ফেলে, সোনাগাছিতে একবার চলে এলে আর পালাবার পথ নেই।

কিন্তু, যে মে’য়ে শুধু পড়বে আর পড়াবে বলে বাবা-মা’র কোল ছেড়ে এসেছে, তাকে আ’ট’কানো কি এতটাই সহ’জ! বাবু আসে, বাবু যায় দিন বদলায় না। তবে এরমধ্যে হঠাৎ একটা মনের মানুষ (বাবু) খুঁজে পান কোহিনুর। সেই বাবু লাল-নীল স্বপ্ন দেখান। কোহিনুরকে সিনেমা দেখাবে বলে সোনাগছি থেকে বের করে নিয়ে যায়। এরপর সোজা বিহার। বাবু-বিবির লাল-নীল সংসার। অচিরেই গর্ভে আসে সন্তান। কিন্তু সুখ বেশিদিন সইল না।

কোহিনুর অচিরেই জানতে পারেন, তার স্বামীর একাধিক বিয়ে। অন্যত্র সংসারও আছে। তাছাড়া কোহিনুরকে পড়াতেও তার ইচ্ছা ছিল না। প্রতিবাদ করলে প্রতিরাতে রাতে শুরু হলো মা’রধর। একদিন ছে’লেকে নিয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে দিল কোহিনুর। কিন্তু যাবে কোথায়? ঠাঁই না পেয়ে সে ফিরে গেল সোনাগাছিতে। কোহিনুর চাননি ছে’লেকে দূরে রেখে মায়ের পরিচয় লুকিয়ে সমাজের দশ জনের একজন করতে। বরং তিনি চেয়েছিলেন, ছে’লে দেখুক মায়ের সংগ্রাম।

মাসের পর মাস দরজার কড়া দড়ি দিয়ে আ’ট’কিয়ে বাইরে ছে’লেকে রেখে ভেতরে খদ্দেরদের সঙ্গে কাজ করতেন কোহিনুর। প্রায়ই ছে’লের কা’ন্না, বাবুর মেজাজ মিলেমিশে বালিশ ভেজাত কোহিনুরের। তবু এক রোখা মা ছে’লেকে সোনাগাছিতে রেখেই মানুষ করার সিদ্ধান্তে অটল। নিজে শিক্ষক হতে পারেননি, তাই ছে’লের মধ্যে দিয়ে স্বপ্ন স্বার্থক করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কোহিনুরের ছে’লে শিক্ষক হয়েছে। মা এরপর ছে’লের বিয়ে দিয়েছিল এক যৌ’নকর্মীর সঙ্গেই। তবে, বিয়ের পর কোহিনুরের পুত্রবধূ কেবল ঘর-সংসারই করছেন, আর পুত্র করছেন উপার্জন। আজ দুই নাতি-নাতনি নিয়ে কোহিনুরের সুখের সংসার।

হাড়কা’টার নীলিমা

মুর্শিদাবাদের মে’য়েটার তখন সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে। সে কোনোদিন কলকাতা দেখেনি। বিয়ের পর স্বামীকে সে কথা জানানোর পরই যাওয়া হলো কলকাতায়। ভিক্টোরিয়া, হাওড়া ব্রিজ, জাদুঘর, গড়ের মাঠ- কত কিছু দেখার ইচ্ছা ছিল নীলিমা’র। স্বামী বললেন সবই হবে, কিন্তু আপাতত এক ‘বন্ধু’র বাড়িতে তো উঠতে হবে। বন্ধুর বাড়িতেই উঠল নব দম্পতি। এরপর ‘একটু আসছি’ বলে বের হলেন স্বামী। তারপর বেশ কয়েক ঘণ্টা তার আর কোনও খোঁজ নেই। কোথায় গেল লোকটা? দুই দিন কে’টে গেল।

এভাবে তো আর ঘরে বসে থাকা যায় না, তাই স্বামীর ‘বন্ধু’ বলল, খুঁজতে বেরতে হবে। এরপর সেই ‘বন্ধু’র হাত ধরে আরেক ‘বন্ধু’র বাড়িতে যান তিনি। হঠাৎ নীলিমা বুঝলেন, ‘বন্ধু’দের সৌজন্যে তার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি এসে পড়েছেন কলকাতার হাড়কা’টা গলিতে। সেই থেকেই নতুন বন্ধুদের সঙ্গে নীলিমা’র ‘নতুন জীবনের’ শুরু। সকাল-বিকাল খদ্দেরদের তুষ্ট করে চলছিল মে’য়েটা। আর এরসঙ্গে দুর্বারের সৌজন্যে চলছিল নাচ-গান শিক্ষা। সবকিছুর সঙ্গে বেশ ভালোই মানিয়ে নেয় নীলিমা।

হাড়কা’টার হিসাবের খাতা বলছে, নীলিমা এখানে অন্যতম ‘হাই ডিমান্ড’। খদ্দেররা তাকে নিত্য উপহারও দেন। বিয়ের প্রস্তাবও আসছে অহরহ। তবে এসব শুনলেই তার ঠোঁটে ঝিলিক দেয় চিলতে হাসি, পছন্দের টেডি বিয়ারটাকে জা’পটে ধরে হাট করে খোলা জানালা দিয়ে আকাশ দেখেন নীলিমা। নীলিমা শুনেছেন, ভিক্টোরিয়ার মা’থায় পরীটা আর ঘোরে না, থেমে গিয়েছে।

মাটিয়ার আমিনা

স্বামী-সন্তান নিয়ে আমিনা বিবির বেশ সুখেই কাটছিল দিন। সুখ আরও বাড়বে। কারণ, আমিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু, অচ’মকা স্বপ্নভঙ্গ! হঠাৎ আমিনার স্বামীর মৃ’ত্যু হল। গর্ভে তখন পাঁচ মাসের সন্তান। শ্বশুরবাড়ি তাকে রাখতে চাইল না। এক সন্তানের হাত ধরে গর্ভবতী আমিনা গেলেন বনগাঁয় বাপেরবাড়ি। কিন্তু সেখানেও অভাবের সংসার। একদিন বাবা জানিয়ে দিলেন, এতগুলো পেট তিনি চালাতে পারবেন না। কিন্তু নিজের মে’য়ে-নাতিকে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না।

আমিনা তারপর বসিরহাটে এক পরিচিতের কাছে নিয়ে গেলেন কাজের আশায়। সেই পরিচিত কাজ জোগাড়ের আশ্বা’সও দিলেন এবং কথাও রাখলেন। কয়েকদিনের মধ্যে আমিনার একটা ‘ব্যবস্থা’ হয়ে গেল। তিনি কাজ পেলেন মাটিয়া যৌ’নপল্লিতে। এরপর দেখতে দেখতে ২০ বছর কে’টে গেছে। লোকনাথ ও কালীভক্ত মু*সলিম আমিনার ঘরে ঈশ্বর-আল্লাহ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছেন। যে গর্ভের সন্তানকে নিয়ে সেদিন বাড়ি ছেড়েছিলেন আমিনা, সেই ছে’লে মায়ের পরিচয় জেনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

নিজের থেকে দূরে রেখে বোর্ডিয়ে ভর্তি করে ছে’লে-মে’য়ে দুটিকে মানুষ করতে চেয়েছিলেন মা। কিন্তু, মায়ের পেশার কথা জানতে পেরে ভেঙে পড়ে ছে’লে, মাধ্যমিকের পর ছেড়ে দেয় লেখাপড়া। অন্যদিকে মায়ের সঙ্গে স’ম্পর্ক ত্যাগের শর্তে বিয়ে হয়েছে মে’য়ের। সেই মে’য়ের ঘরে এক মে’য়েও হয়েছে। কিন্তু, মে’য়ে-নাতনি কাউকেই দেখতে পান না আমিনা। মে’য়ের শ্বশুরবাড়ির একটাই শর্ত ছিল, মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাবে না। বুকে পাথর রেখে সেই শর্তে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন মা। কিন্তু, এখন যে আর মন মানে না। ম’রার আগে একটিবার মে’য়ে-নানতিকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে চান আমিনা।

-সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস