চিরনিদ্রায় শায়িত চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭ | আপডেট: ৭:৪১:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী চশমা হিলের পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।শুক্রবার (১৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে শুক্রবার বাদ আসর লালদীঘি ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তিল ধরার ঠাই ছিল না। জানাজার আগে মুক্তিযুদ্ধের এ সংগঠককে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এর আগে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য চট্টগ্রামবাসীর প্রিয় এ নেতার মরদেহ চট্টগ্রামে দলীয় কার্যালয়ের সামনে রাখা হয়। জানাজায় ইমামতি করেন নগরীর গরীবউল্লাহ শাহ জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা আনিসুজ্জামান।

বৃহস্পতিবার (১৪ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত তিনটার দিকে বন্দরনগরীর মেহেদিবাগে বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবিএম মহিউদ্দিন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন- চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুক্রবার পৃথক শোকবার্তায় তারা মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। বঙ্গভবন প্রেস উইং জানায়, শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রেস উইং জানায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ্ব মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন ও নির্যাতন সহ্য করেছেন কিন্তু কখনও আপোস করেননি।

জানাগেছে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের এমডি ডা. লিয়াকত আলী খান রাত সাড়ে ৯টায় বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। ওখানে ভর্তি করার পর মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পিতার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

গত ১১ নভেম্বর রাতে বুকে ব্যথা অনুভব করায় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে চট্টগ্রামের মেহেদিবাগ ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আইসিইউতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে একরাত রাখার পর ১২ নভেম্বর দুপুরে তাকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৬ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। সিঙ্গাপুরের অ্যাপোলো গ্লিনিগ্যালস হসপিটালে মহিউদ্দিন চৌধুরীর এনজিওগ্রাম ও হার্টের দুটি ব্লকে রিং বসানো হয়। ১১ দিন চিকিৎসা শেষে ২৬ নভেম্বর তিনি ঢাকায় ফিরে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। সিঙ্গাপুর ও ঢাকায় এক মাস চিকিৎসা শেষে ১২ ডিসেম্বর তিনি চট্টগ্রাম ফিরে আসেন।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবনঃ
১৯৪৪ এর ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্ম। বাবার নাম মরহুম হোসেন আহমদ চৌধুরী, আর মাতা মরহুম বেদৌরা বেগম। আট ভাইবোনের মাঝে মহিউদ্দিন মেঝ। বাবা চাকরি করতেন আসাম বেঙ্গল রেলওয়েতে। বাবার চাকরির সুবাদে মহিউদ্দিন পড়াশোনা করেছেন মাইজদি জেলা স্কুল, কাজেম আলি ইংলিশ হাইস্কুল, আর প্রবর্তক সংঘে। স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। মাধ্যমিকের শেষে বাবার আদেশে ভর্তি হয়েছিলেন ডিপ্লোমা ইন্জিনিয়ারিংয়ের কোর্সে। সেখানের পাঠ না চুকিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রামের অন্যতম বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজে। বছর না ঘুরতেই কমার্স কলেজ, পরে সিটি কলেজে। সিটি কলেজেই তার বিপ্লবী রাজনৈতীক জীবনের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরতেই সান্নিধ্যে আসেন জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাক বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হন অসংখ্যবার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি সদর দফতরের কাছে গ্রফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন দীর্ঘ চারমাস।

তার গ্রেফতারের খবরে ততদিনে ভারতের একটি মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে শহিদ মহিউদ্দীন ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। বেঁচে থাকার কথা ছিল না তার। শহীদ ভেবে বাবা ছেলের নামে দিয়েছিলেন ফাতেহা। এরই মাঝে একদিন মানসিক রোগীর নাটক করে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে পালিয়ে বের হন মহিউদ্দিন। পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে সক্রিয়ভাবে সম্মুখসমরে অংশ নেন। ছিলেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধীনে। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ঝাপিয়ে পড়েন নতুন সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের আর আদরের ছাত্রনেতা ছিলেন মহিউদ্দিন। কিছুদিন না যেতেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর। অল্পের জন্য মহিউদ্দিন ধরা পড়া থেকে বেঁচে যান, মৃত্যুবরণ করেন সাথী মৌলভি সৈয়দ। পালিয়ে গিয়ে ভারতে প্রতিবিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দেন। লক্ষ্য সামরিক জান্তা, খুনি মোশতাককে সামরিকভাবেই পরাস্ত করা। কিছুদিন পরেই দলের নির্দেশে পন্থা পরিবর্তন করে আবার সক্রিয় হন প্রকাশ্য রাজনীতিতে। দেশে এসেই সামরিক বাহিনীর হাতে নির্যাতন, আর একের পর এক কারাভোগ। তখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। দলের নির্দেশে চলে বৈপ্লবীক প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ।

তরুণ ছাত্রনেতা মহিউদ্দিনের জুজু-তে সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা তটস্হ। মাঝে আওয়ামী লীগের ভেতরেই ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়ে উঠল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার ভূমিকাকে নগণ্য করতে তাকে ঠেকাতে শত্রুরা উঠেপড়ে বসল। অদম্য সাহসী মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে দলবল নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার জন্য ঝাপিয়ে পড়েন। সব বাধা অতিক্রম করে শেখ হাসিনাকে দলের কা-ারির দায়িত্ব নিতে সহায়তা করেন। তারপর আসলো স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা এরশাদ। তারই শাসনামলে চট্টগ্রামে স্বয়ং জান্তা প্রধানকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে চক্ষুশূল হন সরকারের। ফলে আবারও রাজনৈতিক বন্দি। ততদিনে চট্টগ্রামের আপামর জনতার নয়নমণি হয়ে ওঠেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। পরবর্তীতে নব্বইয়ের গণআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির অন্যতম সুপুরষ বলে বিবেচিত হন সর্বমহলে। জনগণের ভোটে তিন তিন বার মেয়র নির্বাচিত হন মহিউদ্দিন। আজ শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই নেতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভুগছিলেন তিনি।