জি কে শামীমের কল লিস্টে ৬ মন্ত্রীর নাম; বিস্তারিত…

নাজমুল হক নাজমুল হক

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১০:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ | আপডেট: ১০:৪৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯

অনলাইন ডেস্ক:

গুলশানের নিকেতনের কার্যালয় থেকে বিপুল অ’স্ত্র-মা’দক ও কোটি টাকাসহ আ’ট’ক হওয়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজে’লার জি কে শামীম শত শত কোটি টাকার মালিক। অথচ জানেন না প্রতিবেশীসহ তার আত্মীয়-স্বজনরা।

জি কে শামীম ঢাকায় ব্যবসা করে টাকা কামায় সেটা জানলেও তিনি এত টাকার মালিক কী’ভাবে হলেন সেটা ভেবে কূল পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। কোনো শিল্প কারখানা নেই, বড় ধরনের কোনো কোম্পানি নেই, শুধুমাত্র টেন্ডারবাজি করে শত শত কোটি টাকার মালিক কী’ভাবে হলেন সেই প্রশ্ন এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে।

রোববার সোনারগাঁ উপজে’লার সনমান্দি ইউনিয়নের চর বলুয়া এলাকায় যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের বাড়িতে গিয়ে এমন তথ্য পাওয়া যায়। ওই ইউনিয়নের চর বলুয়া সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফসার উদ্দিনের তিন ছে’লে, চার মে’য়ে।

এদের মধ্যে বড় মে’য়ে লুৎফুনেছা মা’রা যায়। বাকি তিন মে’য়ে বেলি, গো’লাপী ও ই’মামী সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তিন ছে’লে হলো, গো’লাম হাফিজ নাসির, জিকে শামীম ও হোসাইন।

এদিকে জিকে শামীমের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাবা মৃ’ত মো. আফসার উদ্দিন উপজে’লার হরহরদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি প্রায় ৪ বছর পূর্বে মা’রা গেছেন।

আর বাবার স্মৃ’তি ধরে রাখতে পৈতৃক সম্পত্তি ৫/৬ শতাংশ জায়গার উপর করা প্রায় ২/৩ কোটি টাকা ব্যয় করে তিন তলা ভবন করলেও বাড়িতে কেউ থাকে না। তবে বাড়িটিতে দামি দামি আসবাবপত্র রয়েছে। বাড়িতে বিশাল বৈঠকখানা রয়েছে।

বাড়িতে মাঝে মধ্যে এলে অচেনা লোকদের নিয়ে বৈঠক খানায় সময় দিতো। আর এত টাকা খরচ করে তিনতলা বিল্ডিং করলেও বাড়িতে শুধুমাত্র একজন কেয়ারটেকার থেকে বাড়িটি দেখা-শোনা করে। কিন্তু জি কে শামীম ঢাকায় আ’ট’ক হওয়ার পর টিভিতে সংবাদ দেখে বাড়ির মূলফট’কে তালা লাগিয়ে কেয়ারটেকারও আত্মগো’পনে চলে গেছে।

তবে শামীমের বাড়ির পাশের চায়ের দোকানগুলোতে টেলিভিশনের সংবাদ দেখার জন্য বেশির ভাগ সময় এলাকার লোকজন ভিড় জমায়। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, জি কে শামীম ছোটবেলা থেকেই মেধাবী।

প্রাই’মা’রি কে’টেছে বাবার স্কুলে। এরপর সোনারগাঁ বারদী আলিয়া মাদরাসা থেকে এসএসসি (দাখিল) পাস করেন। এরপর উপজে’লার পঞ্চ’মীঘাট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। ১৯৮৮ সালে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে সোনারগাঁ ত্যাগ করে ঢাকায় চলে যান।

ঢাকায় গিয়ে প্রথমে একটি মেসে উঠেন শামীম। সেখান থেকে তার বড় ভাই গো’লাম হাফিজ নাসিরের মাধ্যমে ঠিকাদারির একটি লাইসেন্স করেন। একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। প্রথমে বিএনপির রাজনীতি করতেন। ওই সময় জি কে শামীম ঢাকা থেকে বিএনপির বড় বড় নেতাদের নিয়ে আসতো সোনারগাঁয়ে।

জি কে শামীম শুধুমাত্র ঈদের সময় গ্রামের বাড়িতে আসেন। দিনের বেলা এসে রাতেই ঢাকায় চলে যেতেন। অনেক দামি দামি গাড়ি নিয়ে আসেন যান তিনি।

তার সিকিউরিটির জন্য সঙ্গে কয়েকজন গানম্যানও থাকতো। যখন গ্রামের বাড়িতে আসতো তখন জি কে শামীমের সঙ্গে এলাকার নিরীহ লোকজন পিছু ছুটে। জি কে শামীমের চলাফেরায় মনে হয় তিনি একজন নেতা।

শামীমের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিলের উপর দিয়ে সরকারিভাবে একটি নতুন রাস্তা করা হলে সেই রাস্তাটি নিজের বাবার নামে নামকরণ করলে রাস্তাটি পাকা করার প্রস্তাব দিলেও স্থানীয় চেয়ারম্যান তা মেনে নেননি।

জি কে শামীমের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের সখ্যতা থাকলেও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত হননি। সনমান্দি ইউনিয়নের চর বলুয়া এলাকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চা দোকানদার বলেন, বাবার রেখে যাওয়া ১০ কানি (৩০০ শতাংশ) জমি ছাড়া এখানে আর তাদের কোনো সম্পত্তি নেই।

শামীম ঢাকায় ব্যবসা করে সেটা আম’রা জানি। কিন্তু কী’ভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে তা বিশ্বা’স হচ্ছে না। এত টাকার মালিক হলেও এলাকার জন্য তেমন কিছুই করেনি।

এলাকায় আসলে কিছু গরিব মানুষকে একটু সাহায্য সহযোগিতা করলেও এলাকার কাউকে কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধা করে দেয়নি। ব্যবসা করে কী’ভাবে এত টাকার মালিক হলো বুঝতে পারছি না। আলাদিনের চেরাগ পাইলো নাকি?

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফজলুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আম’রা যতটুকু জানতাম শামীম ঢাকায় বসবাস করে ঠিকাদারী ব্যবসা করে। তারা বহু আগেই এলাকা ছেড়ে ঢাকায় বসবাস করে। আর যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সে।

কিন্তু টিভিতে যখন দেখি জি কে শামীম কোটি কোটি টাকা নিয়ে আ’ট’ক হয়েছে। তারপর দেখি শামীমের সব তথ্য বের করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে আম’রা যতটুকু উনাকে চিনি উনি ব্যক্তি হিসেবে খা’রাপ না। এলাকার সবাইকে সম্মান দিতো এবং মুরুব্বীদের সম্মান দিয়ে কথা বলতো।

এদিকে শামীমের কললিস্টে ছয় মন্ত্রীর নাম পাওয়া গেছে। জি কে শামীমকে যখন শুক্রবার সকালে গোয়েন্দা পু’লিশ তার কার্যালয় থেকে আ’ট’ক করে তখন তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন।

প্রথমে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী শামীমের ফোন ধরলেও তার বাসায় র্যাব এসেছে শুনে তিনি ফোন কে’টে দেন। এরপর শামীম তাকে আরও কয়েকবার ফোন করলেও ওই মন্ত্রী আর ফোন ধরেননি।

এরপর একে একে আরও কয়েকজনকে প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ফোন করেন শামীম। তবে এদের সবাই তাকে এড়িয়ে যান। প্রভাবশালী ছয় মন্ত্রীর সঙ্গে শামীমের ব্যবসায়িক স’ম্পর্ক ছিল বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন টেন্ডারে কাজ পেতে এই মন্ত্রীরা তাকে সহায়তা করতেন। রি’মান্ডে থাকা জি কে শামীম বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর দু’একজন ছাড়া শীর্ষমহলের সবার সঙ্গেই তার যোগাযোগ ছিল। সবাইকেই তিনি বিভিন্ন সময়ে সহায়তা করেছেন।

জি কে শামীম আরও দাবি করেছেন যে, বিপুল পরিমান টাকা তিনি টেন্ডারে কাজ পাওয়ার জন্য শীর্ষমহলকে ঘুষ দিয়েছেন। টাকা ছাড়া কেউ তাকে কাজ দেয়নি।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে যে, জি কে শামীম যে তথ্যগুলো দিয়েছেন সেগুলো সত্য কিনা তা যাচাই করে দেখতে হবে। কারণ একজন ব্যক্তি গ্রে’প্তার হলে বাঁ’চার জন্য যে অনেককিছুর আশ্রয়ই গ্রহণ করে।

তবে একটি বিষয় গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যেই প্রমাণ পেয়েছে যে যুবলীগ বা আওয়ামী লীগের নেতা হলেও জি কে শামীম নিয়মিত বিএনপিকে টাকা দিতেন। এই টাকার হিসাব লেখা একটা খাতারও সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দারা।