বাবার কা’টা হাত খুঁজে জোড়া দিয়ে দিতে চায় মে’য়ে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:৫৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | আপডেট: ৩:৫৪:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

‘বাবা, ওরা তোমা’র হাত কে’টে নিল কেন? এখন আমাকে কিভাবে খাইয়ে দিবা? কা’টা হাতটুকু নিয়ে আসো, আমি সেলাই করে দেই।’ পাঁচ বছরের কন্যা ইশরাত জাহান নওরিনের মুখে এমন কথা শুনে গড়িয়ে পড়ে দুই চোখের পানি। কোনো জবাব দিতে পারেন না ইলিয়াস নোমান। আইসিইউয়ের বেডে সদ্য জ্ঞান ফেরা স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন স্ত্রী’ মাহমুদা খাতুন। মে’য়ের কথা শুনে তার মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন আর সান্ত্বনা দেন, ‘আরেকটি হাত আছে মা, সেই হাতে তোমাকে খাওয়াবে।’ এরপর কন্যাকে নিয়ে বেরিয়ে যান আইসিইউ থেকে।

গত রবিবার সকালে শেরেবাংলানগরে জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউটের চারতলায় আইসিইউয়ের বেডে গিয়ে এই ম’র্মা’ন্তিক দৃশ্য দেখা যায়। একমাত্র কন্যা নওরিনকে প্রতিদিন সকাল-বিকেল মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো ছিল বাবার রুটিন কাজ। মুখে তুলে তাকে খাবার খাইয়ে দিতেন নোমান। এখন আর তাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে ঘুরতেও যেতে পারবেন না। কারণ তাঁর ডান হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে স্থানীয় স’ন্ত্রাসীরা। নওরিনের বাবার অ’প’রাধ, অন্যায়ের বি’রুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন, মা’দক আর সন্ত্রাসের বি’রুদ্ধে কথা বলতেন, বাল্যবিবাহ বন্ধসহ অনেক সামাজিক

কাজে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর হাত কু’পিয়ে বিচ্ছিন্ন করায় অ’তিরিক্ত র’ক্তক্ষরণের কারণে তিনি মৃ’ত্যুর সঙ্গে ল’ড়াই করছেন। কা’টা হাতে ইনফেকশন হয়েছে, বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে। নোমানের স্ত্রী’ মাহমুদা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মানুষের বিপদের কথা শুনে ঘরে থাকতে পারত না, রাত নাই, দিন নাই ছুটে যেত। মা’দকের বি’রুদ্ধে কথা বলত। আমি কত বলেছি ওরা স’ন্ত্রাসী, মানুষের জন্য ছুটতে গিয়ে নিজের জীবনটা শেষ কইরো না।’

আইসিইউ ইউনিটের বাইরে থেকে জানালা দিয়ে ছে’লের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন বৃদ্ধা মা সাহেরা খাতুন আর দুই হাত ওপরে তুলে ছে’লের জন্য দোয়া করছেন। ছে’লের কথা জানতে চাইলে অঝোরে কাঁদেন সাহেরা খাতুন। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘যারা সন্ত্রাস আর মা’দক ব্যবসা করে, এদের কিছু হয় না, আর আমা’র ছে’লে এইসবের বি’রুদ্ধে কথা বলছে বলে জীবনটাই যায় যায়। আমি ওদের বিচার চাই, কঠিন বিচার চাই।’ মায়ের কা’ন্না দেখে পাশে থাকা স্বজনদের অনেকের চোখ ছলছল করে।

পরিবারের সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়, ময়মনসিংহ জে’লা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য ইলিয়াস নোমান। গফরগাঁও উপজে’লার যশোরা গ্রামের মো. সিরাজুল হকের ছে’লে। ছোটবেলা থেকেই অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করতেন, মানুষের কোনো সমস্যা হলেই বন্ধুদের নিয়ে পাশে দাঁড়াতেন, আশপাশের গ্রামেও ছুটতেন মানুষের উপকারের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী প্রয়াত মাহবুবুল হক শাকিলের ভাগ্নে এই নোমান।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবাদী যুবক হিসেবেই নোমান এলাকায় পরিচিত। মা’দক এবং সন্ত্রাসের বি’রুদ্ধে সোচ্চার ছিল, বাল্যবিবাহ হচ্ছে শুনলেই প্রশাসনে খবর দিয়ে নিজে উপস্থিত থেকে তা বন্ধ করত। কোনো অন্যায়কেই ছে’লেটি সহ্য করত না। ওই সব কারণই কাল হয়েছে ছে’লেটির জন্য।’

এলাকাবাসী, দলীয় নেতাকর্মী ও নোমানের পরিবারের অ’ভিযোগ, স্থানীয় ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক রেজাউল করিম সুমন ও তাঁর ক্যাডার সারোয়ার জাহান, ধনু, রাকিব, ফয়সাল, আকিব, ওয়াহিদ, মু*স্তাকিন ও মাহফুজ এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন প্রকারের মা’দক কারবার এবং স’ন্ত্রাসী কর্মকা’ণ্ড চালিয়ে আসছে। বেশ কয়েকবার এসবের প্রতিবাদ করে স’ন্ত্রাসীদের পু’লিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন নোমান। স’ন্ত্রাসীরা বাল্যবিবাহের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নানাভাবে হু*মকিও দিত নোমানকে।

সম্প্রতি যশোরা গ্রামের ১৮টি পরিবারকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেবে বলে প্রতিটি পরিবার থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় যুবলীগ নেতা সুমনের ভাগ্নে বকুল মিয়া ও তাঁর সহযোগীরা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেনি, টাকাও ফেরত দেয়নি। বিষয়টির সমাধান পেতে নোমানকে জানায় পরিবারগুলো। নোমান পরে বকুলসহ অন্যদের টাকা ফেরত দিতে বলেন, নইলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অ’ভিযোগ দেবেন বলে জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বকুলের মামা সুমনসহ ক্যাডাররা। গত ২ আগস্ট মোটরসাইকেলে ফেরার পথে বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে তাঁর ওপর চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল দিয়ে সুমনের নেতৃত্বে স’ন্ত্রাসীরা হা’মলা করে। স’ন্ত্রাসীদের কোপে তাঁর ডান হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; মুখে, পিঠে, শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আ’ঘাত লাগে।

ওই ঘটনায় নোমানের স্ত্রী’ মাহমুদা আক্তার বাদী হয়ে যুবলীগ নেতা সুমনসহ স’ন্ত্রাসীদের বি’রুদ্ধে গফরগাঁও থা’নায় একটি মা’মলা করেন। ওই মা’মলায় আ’সামি ধনু মিয়া গ্রে’প্তার হয়েছেন। স’ন্ত্রাসীদের কাছে বিদ্যুতের জন্য দেওয়া টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে মা’রধরের শিকার হয়েছিলেন যশোরা ইউনিয়নের খোদাবক্স গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছে’লে মো. কাম’রুজ্জামান। ম’সজিদের মিটারের জন্যও টাকা নিয়েছিলেন সুমনের ভাগ্নে বকুল। এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এলাকার পরিচালক ফরহাদ ঢালী বলেন, ‘বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বলে মিটারপ্রতি টাকা নেওয়ার অ’ভিযোগ আসলে আমি বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে জানাই।

গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। পরে সমিতি থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে গেলে পু’লিশের উপস্থিতিতেই বাধা দেয় বকুলসহ ক্যাডাররা।’ এলাকাবাসীর অ’ভিযোগ, যশোরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ ম’দদেই সুমন ও তাঁর ক্যাডাররা মা’দক কারবার ও সন্ত্রাসে বেপরোয়া। এই ক্যাডারদের হা’মলার শিকার হয়েছে অনেকেই। তাদের হা’মলায় গুরুতর আ’হত হয়ে হাসপাতা*লে চিকিৎসাধীন ছিল শি’বগঞ্জ বিদান্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদরুল হকসহ অনেকেই।

উপজে’লা ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আতাউর রহমান বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এমনটা হবে কল্পনাও করতে পারি না। এ ঘটনার সঙ্গে জ’ড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শা’স্তি না হলে আর কোনো যুবক মা’দক কারবার ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করবে না। আ’সামিরা যত বড় ক্ষমতাধরই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’