মৃত্যুদণ্ড আইন সংশোধন হলো যেভাবে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৫১:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৯

জি এম-আদল :
আমাদের আইন বিষয়ে অনেক মজার তবে গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী বা ঘটনা রয়েছে, যা আমরা অনেকে জানি না। আবার কিছু ঘটনা কালের বিবর্তনে বা সময়ের হাত ধরে হারিয়ে যায়।

তেমনি একটি ঘটনা শেয়ার করবো, যা ঘটেছিল অনেক আগে। বিষয়টি শুনেছি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর সরকার আলী আক্কাস স্যারের কাছ থেকে। তিনি আবার শুনেছিলেন তার শিক্ষকের কাছে।

অভিন্ন ভারতীয় উপমহাদেশে, মফস্বল আদালতে তখন বিচার-আচার হতো। কোনো এক মফস্বল আদালতে অরবিন্দ ঘোষ নামে একজন চতুর ও মেধাবী আইনজীবী ছিলেন। তার কাছে একদিন এক মক্কেল এসে বললো, ‘আমি খুনের দায়ে অভিযুক্ত, আমার নামে মামলা হয়েছে। আসলেই আমি খুন করেছি। আমাকে বাঁচান, আমি ফাঁসিতে ঝুলতে চাই না।’ অরবিন্দ ঘোষ বললেন, কোনো সমস্যা নেই, আমি তোমাকে বাঁচিয়ে দেবো, তা শত ভাগ নিশ্চিত থাকো।’

মামলা আদালতে চললো হাকিম সাহেব রায়ও দিলেন মৃত্যুদণ্ড। এবার আবার অরবিন্দ ঘোষের সাথে অভিযুক্তের কথা হলো। আবারো অরবিন্দ ঘোষ একই আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আমি বাঁচিয়ে দিলেই তো হলো। এক কাজ করো, ফাঁসি দেয়ার আগে তোমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে তোমার কোনো শেষ ইচ্ছা আছে কি না, তখন তুমি বলবে, আমার শেষ ইচ্ছা হলো আমাকে যেনো আমার আইনজীবীর সামনে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

যেই কথা সেই কাজ, ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে অরবিন্দ ঘোষকে সামনে রাখা হলো, আদেশ প্রদানের সাথে সাথে অভিযুক্তকে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো। আর যেই না ফাঁসিতে ঝোলানো হলো, অমনি অরবিন্দ ঘোষ তার পকেট হতে একটি ছুরি বের করে ফাঁসির দড়ি কেটে দিলেন। আর কি অভিযুক্ত ধপাস করে পরে গেলো এবং মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলো। সবাই তো হায় হায় করতে লাগলো…অরবিন্দ ঘোষ একি করলো…অরবিন্দ ঘোষ তো আইন লঙ্ঘন করলো।

এবার অরবিন্দ ঘোষকে আদালতে আনা হলো, জিজ্ঞাসা করা হলো একাজ কেনো করলেন? কেন জেনেশুনে আইন লঙ্ঘন করলেন। এবার অরবিন্দ ঘোষ মুখ খুললেন। তিনি বললেন, আমি তো আইন লঙ্ঘন করিনি বরং আপনারাই আইন লঙ্ঘন করতে ছিলেন, আমি তা হতে দেইনি। সবাই তো অবাক, এবার আদালত অরবিন্দ ঘোষকে নির্দেশ দিলেন, কীভাবে এবং কোন আইনের আলোকে তিনি এত গুরুতর অপরাধ করেও বলছেন অপরাধ করেননি।

অতঃপর অরবিন্দ ঘোষ জবাব দিলেন, আমাদের Code of Criminal Procedure 1898 এর ৩৬৮ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘When any person is sentenced to death, the sentence shall direct that he be hanged’- অর্থাৎ আইনে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর কথা বলা হয়েছে। তাকে যে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখতে হবে একথা কিন্তু আইন বলেনি। তাই আমি অভিযুক্তকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সাথে সাথে রশি কেটে দিয়ে আইন লঙ্ঘনের হাত থেকে বাঁচিয়েছি। কারণ, মৃত্যু ঘটানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অতঃপর আদালত তার যুক্তি মেনে নিয়ে তাকে ও তার মক্কেলকে খালাস দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে এই ধারাটিতে সংযোজন করে পরিবর্তন এনে এইরূপ করা হয় ৩৬৮-(১) এ। ‘When any person is sentenced to death, the sentence shall direct that he be hanged by the neck till he is dead. অর্থাৎ পূর্বের ধারাটির সাথে hanged by the neck till he is dead লাগানো হয়।

লেখক : শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট ও শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। -রাইজিংবিডি