আজ ৮ডিসেম্বর ঝালকাঠি হানাদার মুক্ত দিবস

প্রকাশিত: ১২:১৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০১৭ | আপডেট: ১২:১৯:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০১৭
আজ ৮ডিসেম্বর ঝালকাঠি হানাদার মুক্ত দিবস

আজ ৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এ দিনে পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা থেকে মুক্তি পায় ঝালকাঠিবাসি। জেলার প্রায় অর্ধশত স্থানে নিরীহ বাঙালিকে ধরে গুলি করে পাকহানাদাররা। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫বছরেও একমাত্র নলছিটি পৌর এলাকার ফেরিঘাট সংলগ্ন বধ্যভূমিটি ছাড়া জেলার অন্য বধ্য ভূমিগুলো সংরক্ষনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকার পরিবর্তন হলেও বধ্যভূমিগুলোর কোন পরিবর্তন নেই। বাঙালীর রক্তের স্মৃতি বধ্য ভূমিগুলো আজও অবহেলিত ও উপেক্ষিত, অরক্ষিত।
মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা ও সংশ্লিষ্টদের দেয়া স্মৃতি নির্ভর তথ্যে জানাগেছে, ১৯৭১ সালের ২৩মার্চ স্থানীয় পুরাতন স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এর পরপরই স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে বরিশাল থেকে সংগৃহিত স্বল্প সংখ্যক রাইফেল ও ক’টি বন্দুক দিয়ে শুরু হয় মুক্তিবাহিনী গঠনের কাজ। এতে স্বতঃস্ফুর্তভাবে সহায়তা করেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা। এরই এক পর্যায়ে পাকিস্তানী হানাদারদের রূখতে মুক্তিপাগল স্বতঃস্ফুর্ত যুবকের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে অবশেষে বন্দুকের সাদৃশ্য কাঠের অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ কাজ চালাতে হয়। এভাবেই ছোট ছোট কটি মুক্তিবাহিনী দল গঠিত হয়। এর মধ্যে পৃথক পৃথকভাবে একেকটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন সর্বহারা পার্টির সিরাজ সিকদার, সেলিম শাহনাজ, কির্ত্তীপাশা ইউনিয়নের মানিক প্রমুখ। শেষ পর্যন্ত এই মানিকের নেতৃত্বাধীন ২৪সদস্যের দলটি স্থানীয়ভাবে মানিকবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১মাস ৪দিনের মাথায় ২৭এপ্রিল সন্ধ্যায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাক হানাদারদের একটি দল গানবোটযোগে এসে শহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রথমে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্বরদের ভারী অস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরাসহ শহরবাসী যে যেভাবে পেরেছে শহর ছেড়ে আত্মরক্ষার্থে অজানা গন্তব্যে চলে গেছে। কিন্তু এরই মধ্যে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেছে অসংখ্য অসহায় লোক। স্থানীয় কতিপয় পদলেহী বাঙালীর পরামর্শে বেছে বেছে ক’টি বাড়ি ঘর রেখে এককালের ঐতিহ্যবাহী “দ্বিতীয় কলকাতা খ্যাত” ঝালকাঠি বন্দর জ্বালিয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনী। টানা ৩ দিন ধওে জ্বলতে থাকা এ আগুনের লেলিহান শিখা ১২/১৫ মাইল দূর থেকেও মানুষ দেখতে পেয়েছে। ফলে পাকিস্তানী বর্বর উম্মত্তদের তান্ডবে শত বছরের গড়া ঝালকাঠি বন্দরবাসীর সোনার সংসার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানা পুড়ে ছাই হয়ে মাটিতে মিশে যায়। ১৬জুন প্রায় ৫শতাধিক পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় বেশাইনখানের মানিক বাহিনীর ২৪জনের পুরো দলটিকে ধরে এনে নিষ্ঠুর নির্যাতনের পর হত্যা করে। এভাবেই তথাকথিত শান্তি (পিস) কমিটির অথবা পাকিস্তানী দালাল রাজাকারদের সহায়তায় ৭ডিসেম্বর পর্যন্ত নৃশংস বর্বরতা চালিয়ে গোটা ঝালকাঠির মানুষকে নিঃস্ব করে ও ধর্ষণ, লুটতরাজ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ডের নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষর রেেেখ যায় হানাদার বাহিনীর দস্যুরা। কালের স্বাক্ষী হয়ে সুগন্ধা প্রবাহমান থাকলেও তারই করাল গ্রাসে বিলীন আর সারিবদ্ধভাবে শত শত মানুষকে গুলি ও কসাইর মত জবাই করে হত্যা করার সেই বধ্যভূমিটি।
দেশকে শত্র“ মুক্ত করার প্রাণপণ এই লাড়াইর এক পর্যায়ে ৭ডিসেম্বর পাক বাহিনী ঝালকাঠির উত্তরাঞ্চলে অভিযান শেষে সুগন্ধা নদী দিয়ে নৌ-পথে বরিশাল যাবার সময় স্থানীয় কাঠপট্টির চরে ৩০জন রাজাকারকে নামিয়ে দেয়। ওই দিন কতিপয় নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা লাঠি হাতে পিছন থেকে রাজাকার দলটিকে “হ্যান্ডসআপ” বলা মাত্রই রাজাকাররা হাতের অস্ত্র ফেলে দু’হাত উপরে তোলে আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিপাগল মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললে “টিক্কাখান” নামে পরিচিত আঃবারেক নামের এক রাজাকার প্রতিবাদ করলে বিক্ষুদ্ধ জনতা গণ ধোলাই দিয়ে তার চোখ উপড়ে ফেলে। সন্ধ্যায় টিক্কাখান নামের সেই রাজাকার মারা যায়। ধৃত বাকি রাজাকারদের গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। আর এরই মধ্য দিয়ে রক্তপাতহীন শান্ত পরিবেশে ৮ ডিসেম্বর ঝালকাঠি ও নলছিটি হানাদার মুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বীরমুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ।
ঝালকাঠি জেলা বনিক সমিতির সাবেক সভাপতি সালাহ উদ্দিন আহমেদ সালেক জানান, “মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বয়স তেমন একটা বেশি হয়নি। ভালো-মন্দ বুঝার ক্ষমতা হয়েছে। ঝালকাঠি শহরে পাক সেনাদের অগ্নিকান্ডে সর্বস্ব হারিয়ে শহর তলীর ইছানীলে পুরান বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানে আগুনের এতটা তাপ ছিলো, যে শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বাসন্ডা নদীর পশ্চিম পাড়ে এসেও সহ্য করতে না পেরে সদর উপজেলার তারুলী গ্রামের একটি বাড়িতে গিয়ে থাকি। খবর পেলাম ঝালকাঠির উত্তরাঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তোপের মূখে পাকবাহিনী সুগন্ধা নদীর দিকে আসছে। সেই খবর পেয়ে থাকতে পারলামনা। মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাইদের সাথে বাঁশের লাঠি নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীকে আক্রমনের জন্য ছুটে গেলাম। যখন দেখি গুলি করতে করতে গানবোট আসছে তখন আমরা তার সামনে অসহায় মনে করে কচু ক্ষেতের মধ্যে মাটিতে শুয়ে পড়লাম। পাকবাহিনী আমাদের দেখতে না পেয়ে গানবোট চালিয়ে গেল। পরে শুনলাম তারা কতিপয় রাজাকারকে সুগন্ধা নদীর তীরে নামিয়ে দিয়ে নলছিটিতে থাকা বাকি পাকবাহিনীদের নিয়ে চলে গেছে।
ঝালকাঠির কৃতি সন্তান সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপটেন শাহজাহান ওমর (বীরউত্তম) বলেন‘ “৭১’র মার্চে আমি ছিলাম পাকিস্তানের খারিয়া ক্যান্টনমেন্টে। ৭মার্চে বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষণে বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এরপর ২৭মার্চ বিবিসি রেডিও থেকে জানতে পারলাম, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ১৪আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। সরকারি ছুটির দিন হিসেবে আমাদের কিছু সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। আমরা এক পোশাকেই পাকিস্তান ত্যাগ করেছিলাম। এরপর আমাদের বিমানে কলকাতায় পাঠানো হলো। সেখানে ৮নম্বর থিয়েটার রোডে ছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের হেড কোয়ার্টার। জেনারেল ওসমানীর হেড কোয়ার্টারও ছিল এখানে। ওসমানীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি ৯নম্বর সেক্টরে পোস্টিং দিলেন। এ সেক্টর ছিল সাতক্ষীরার হাসনাবাদ, টাকিনগর বলে এক জায়গায়। সেক্টর কমান্ডার হলেন মেজর জলিল। ২১আগস্ট আমি সেক্টরে এলাম। মেজর জলিল আমাকে পেয়ে খুশি হলেন। আমাকে তিনি বরিশালের অভ্যন্তরে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন। ২৬আগস্ট ৬০জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আমি পশ্চিম বাংলার বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। যশোরের পাশ দিয়ে কালিগঞ্জ, তাহেরপুর, টুঙ্গিপাড়া ও পয়সাঘাট হয়ে উজিরপুর এসে ক্যাম্প গঠন করি। আমাদের পেয়ে সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারা সাহস পেলেন। ২সেপ্টেম্বর উজিরপুরের হার্তা এলাকায় পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর বিমান ও গানবোট হামলা করে। মুক্তিযুদ্ধে এখানে আমি প্রথম যুদ্ধ শুরু করি। পাকিস্তানের গানবোটগুলো লক্ষ্য করে রকেট লাঞ্চারের গোলা ছুঁড়তে থাকি। একটা গানবোট ওখানেই ধ্বংস হয়ে যায়। সেখানে আমরা ছয়টি লঞ্চ ধ্বংস করতে সক্ষম হই। এ ছাড়া সেখানে অনেক পাঞ্জাবি ও রাজাকার মারা যায় এবং শত্র“ পক্ষের অনেকেই আহত হয়। এতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস বেড়ে যায়। শত্র“মুক্ত করার জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকে আমার একটার পর একটা অপারেশন। ১৯৭১সালের ৮ডিসেম্বর আমরা ৯নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বরিশাল শহর দখল করে নিই।”