পাঠক, প্লিজ একটু অবাক হোন! 

প্রকাশিত: ৯:৩৫ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০১৯ | আপডেট: ৯:৩৫:অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০১৯

 শফিক মুন্সি 

একজন সাধারণ মানুষের হাটার গতিবেগ থাকে ঘন্টায় সর্বোচ্চ পাঁচ কি.মি. এমনটাই জানতাম। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি দফতরের মাননীয় জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষিত এবং আরো অজস্র বিশেষণে বিশেষিত ও বিশেষায়িত হওয়া মন্ত্রীর শৈশবের পায়ে হেঁটে বিদ্যা অর্জন করতে যাবার পরিসীমা ও গতিসীমা দেখে বেজায় তাজ্জব বনে গেলাম। তো সেই বন থেকে বাস্তবের কাঠখোট্টা প্রেমহীন এবং মানবিকতা দেখানোয় নিতান্ত সাধারণ কবি-লেখকদেরও চৌদ্দ শিকের ভাত খাওয়ানো সমাজে ফিরে এই সরকার বাহাদুরের দান করা ইন্টারনেটে পুনরায় খুঁজে দেখলাম আসলে মানুষ্য প্রজাতির হাঁটার গতিবেগ কত এবং নিজের মস্তিষ্কের মনে রাখার ক্ষমতার ওপর আস্বস্ত হয়ে মনে মনে মনকলা খেয়ে আনন্দে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে দেখলাম সর্বোচ্চ পদব্রজের গতিবেগ ঘন্টায় পাঁচ কিলোমিটারই আছে!

এখন প্রশ্ন হলো মাননীয় অদমনীয় মহামান্য ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত একজন মন্ত্রী মশাইয়ের কি এমন বক্তব্য ছিল যে আমার মতো ছাপোষা এক লেখক হঠাৎ মানুষ নামক প্রাণীর হাঁটার গতিবেগ নিয়ে পড়লাম? মহামান্য অদমনীয় মাননীয় মহোদয় সাহেব কি মানুষের হাঁটার ওপর এমন কোনো যন্ত্র বা তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেললেন যাতে মানুষ্য প্রজাতির জীবনযাত্রায় বাঙালী নামক জাতি কোনো নতুন দিকের উন্মোচন করতে পারে? কি এমন কারণে হঠাৎ হাঁটাহাঁটি নিয়ে এত আগ্রহ সবার? কারণটা হচ্ছে ঐ মন্ত্রী মশাই একটি গণমাধ্যমে এই অর্ধমৃত জাতি কে জাগ্রত করার খানিক প্রয়াসে এবং চলমান অনুপ্রেরণা যোগানোর বক্তা হবার দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে রাখতে বলে বসলেন তিনি নাকি প্রতিদিন চল্লিশ কিলোমিটার হেঁটে (পাঠকবৃন্দ আপনাদের সুবিধার্তে আমি আবারও বলছি ভালো করে শুনুন দেখুন বুঝুন, চল্লিশ কিলোমিটার নিজ পায়ে হেঁটে) স্কুলে যেতেন! ব্যাপারটা দেখে একটু খটকা লাগায় আমি একটা অতি সাধারণ সরল অংক করতে বসলাম, একজন মানুষ ঘন্টায় সর্বোচ্চ পাঁচ কি.মি. হাঁটতে পারলে চল্লিশ কি.মি. হাঁটতে তার সময় লাগবে (৪০÷৫) আট ঘন্টা! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম আমার চেয়েও বড় বড় গণিত বিদেরা আরো একটু এগিয়ে গিয়ে হিসেব কষতে বসলেন একজন মানুষ যদি আট ঘন্টা হেঁটে স্কুলে যায় আবার আট ঘন্টা হেঁটে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে এবং দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা ও শিক্ষাদান পদ্ধতি ভালোবেসে প্রতিদিন ছয় ঘন্টা করে স্কুল করে তবে তিনি প্রতিদিন বিদ্যাশিক্ষার পিছনে ব্যায় করতেন (৮+৬+৮) বাইশ ঘন্টা! প্রিয় পাঠকগণ আমার আর কিচ্ছু বলার নেই, শুধু একটি কথা বলতে চাই একটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ভিসি যেদিন তাঁর শিক্ষা কার্যক্রম দিয়ে গিনেজ বুক অব রেকর্ডে জায়গা না নিয়ে তাঁর ক্যাম্পাসের দশ টাকার চপ, শিঙাড়া, চা দিয়ে জায়গা নেবার কথা বলেছিলেন সেদিন থেকে আমার অবাক হবার শক্তি হারিয়ে গেছে আপনাদের সে শক্তি যদি কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকে তবে চল্লিশ কিলোমিটার হাঁটার এই অনুপ্রেরণা মূলক বক্তব্যে সেটা কাজে লাগাতে পারেন। পাঠক, প্লিজ একটু অবাক হোন।

মন্ত্রী মহোদয়কে আমি মন্ত্রীত্বের মসনদে আসীন হবার আগে একজন জ্ঞানী মানুষ হিসেবে জানতাম। দেশের কম্পিউটার ব্যবহার জগতে তাঁর নাম ডাক অবদান অতি মূল্যায়িত হলেও খাটো করবার মতো নয়। জ্ঞানী হিসেবে জানতাম দশ টাকায় চপ,শিঙারা, চা থিওরির জনক শিক্ষক মহোদয় কেও। তবে কি বিশ্বাস করতে হবে জ্ঞানী গুণী মানুষেরা ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়েই উলটো পালটা বকতে শুরু করে? যদি এমনটা হয় তবে সেটা সত্যি দুঃখজনক, হৃদয়বিদারক ও ভয়ানক। ক্ষমতা একজন সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষকে কোনোদিন বদলাতে পারবে না বিষয়টি এমন হওয়া উচিত। মন্ত্রী মহোদয় চল্লিশ টাকে কমিয়ে চার বানিয়ে দিলে তার অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য এমন হাস্যকর না হয়ে সত্যি অনুপ্রেরণাদায়কই হতো। কিন্তু কথা হলো সত্যিকারের জ্ঞানের পথে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের হাঁটতে সাহায্য করছে?

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন বিশ্ব র্যাংকিং এ উপরের সারিতে অবস্থান করে বাংলাদেশের দশ টাকায় চপ,শিঙারা, চা এর জনক জনৈক ভিসি বলে তারা ঘুষ না দেওয়ার ফলে র্যাংকিং এ অবস্থান পায় নি। পাঠক, প্লিজ আরেকটু অবাক হোন। হাত জোর করে অনুরোধ করছি অবাক হোন, এ মরার দেশে ফ্রি তে অবাক হবার এমন সুযোগগুলো হাতছাড়া করবেন না।আধুনিক বিশ্বের উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ গবেষণা নির্ভর। কিন্তু সেদিন একটি টিভি চ্যানেলের খবরে দেখলাম যারা গবেষণা করবেন তারা দোষ দিচ্ছে সরকার তাদের উপযুক্ত সুযোগ – সুবিধা দিচ্ছে না আর সরকারি মতে বলা হচ্ছে গবেষণা যাদের করা উচিত তাদের গবেষণার প্রতি আগ্রহ নেই এমন দুই তরফা অভিযোগ। তবে শিক্ষক রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে শিক্ষকতার নৈতিক দায়িত্বে অবহেলার মতো পরিস্থিতি যে এদেশে শুরু হয় নি সেটা বলা যাবে না। রাজনীতিই যখন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পদ-পদবী পাবার একমাত্র মাপকাঠি সেখানে একাডেমিক কার্যক্রম অন্তত পরিচালিত হচ্ছে কোনোরকমে সেটাই ঢের ভাগ্যের ব্যাপার।

কলেজগুলোতে সরকার দলীয় ছাত্র রাজনীতির ছত্রছায়ায় শিক্ষার পরিবেশ নষ্টের গণজাগরণ চলে। নকল না করতে দেওয়ায় শিক্ষককে লাথি-ঘুষি দিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়! কতটা অশিক্ষিত, অমানবিক, ভয়াবহ ছাত্রসমাজ সৃষ্টি হচ্ছে ভাবা যায়? স্কুলের ব্যাপারে তো আর নাই বললাম, সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি গাইড আর কোচিং নির্ভর। আমার মনে হয় দেশে আসলে শিক্ষাব্যবস্থা বলে আর কিছু বাকি নেই যেটা আছে সেটা হচ্ছে পরীক্ষাব্যবস্থা। ভারী ভারী বই খাতা নিয়ে সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে শুধুই পরীক্ষায় বসার জন্য, জ্ঞানার্জনের জন্য নয়। এমতাবস্থায় মানুষজন মহামান্য মাননীয় আদরনীয় মানুষদের নিয়ে সামাজিক কিংবা গণমাধ্যমে হালকা মেজাজের মজা করতে পারছে এবং তাঁরা কিছুটা জ্ঞানের প্রকাশ ঘটিয়ে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছে সেটাই অনেক। তাদের এতটুকু শিক্ষার পরিচয় দেখে হলেও পাঠকরা প্লিজ অন্তত একবার অবাক হোন।

লেখক: শফিক মুন্সি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।