নলছিটির ‘মুড়ি গ্রাম’ এর হাতে ভাজা মুড়ি বিদেশেও যায়

প্রকাশিত: ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৩৩:পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০১৯

বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশ। রমজানের সিয়াম সাধনার শেষে ইফতারীতে যতগুলো উপাদান থাকুক না কেন ছোলা ও মুড়ির বিকল্প নেই। ইফতারীতে সকল শ্রেণির রোজাদারদের জন্য মুড়ি একটি অপরিহার্য খাদ্যোপাদান। তাই রমজান মাস এলেই মহাব্যস্ত হয়ে ওঠে আমাদের মুড়ি গ্রাম। এখানে নাখুচি অথবা মোটা ধানের চাল থেকে দেশি পদ্ধতিতে মুড়ি ভাজা দেশের গন্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে।
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম মুড়ি গ্রাম নামে পরিচিত। স্বাদে অতুলনীয় বলে দপদপিয়ার মোটা মুড়ির খ্যাতি ছড়িয়েছে সর্বত্র। এখানে মুড়ি ভাজা হয় দেশিয় পদ্ধতিতে। ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ মুক্ত এখানকার হাতে ভাজা মুড়ির সুনাম দিনদিন ছড়িয়ে পড়ছে। হাতে ভাজা এ মুড়ির চাহিদা রয়েছে বরিশাল বিভাগ ছাড়িয়ে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। আর বর্তমানে পরিমাণে কম হলেও দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার হাতে ভাজা মুড়ি। এখানে বছর জুড়েই চলে মুড়ি ভাজা ও বিক্রি। তবে রমজান মাসের বাড়তি মুড়ির চাহিদা মেটাতে ব্যস্ততা বেড়ে যায় এখানকার মুড়ি তৈরির কারিগরদের। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মুড়ি ভাজা। ছেলে থেকে বুড়ো সবাই মুড়ি ভাজা কিংবা বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত। রমজান মাসেই এখানে বিক্রি হয় প্রায় ১০ কোটি টাকার মুড়ি। মুড়ি ছাড়া ইফতার যেন পরিপূর্ণতা পায় না। আর তাই মুড়িকে ইফতারের অন্যতম উপাদান বলা হয়।
একদিকে নদী ও অন্যদিকে মহাসড়ক। এর আশ পাশেই নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের রাজাখালি, দপদপিয়া, তিমিরকাঠি, ভরতকাঠি, জুরকাঠি, গোয়ালকাঠি, চরাদি, বাখরকাঠি, রাবনাহাট ও কুমারখালী গ্রাম। এই ১০ গ্রামের অধিকাংশ মানুষের অন্যতম প্রধান পেশা মুড়ি ভাজা ও বিক্রি। দুই শ্রেণির লোক এখানে মুড়ি ভাজে। যারা একটু স্বচ্ছল তারা চাল কিনে সরাসরি মুড়ি ভাজে, আর গরিব শ্রেণির লোকেরা অন্যের কাছ থেকে চাল নিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মুড়ি ভাজে। মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ বেশি হওয়ায় দেশব্যাপী এখানকার মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। ইউরিয়া সার বিহীন হাতে ভাজা এ মুড়ির চাহিদা বাজারে কয়েক গুণ বেশি। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের জন্য দিন রাত ২৪ ঘণ্টা শিশু নারীসহ পরিবারের সবাই মুড়ি ভাজে। কেউ ধান সিদ্ধ করে, কেউবা আবার ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। শত বছর ধরে মুড়ি ভাজা ও বিক্রির ঐতিহ্য এ সব গ্রামে মানুষের। প্রতিদিন একজন মানুষ গড়ে ৫০ কেজি চাল ভাজতে পারে। যেখান থেকে ৪২-৪৩ কেজি মুড়ি পাওয়া যায়। এখানকার মুড়ি ৭৫ টাকা কেজি দরে পাইকারি এবং ৮৫ টাকা খুচরা বিক্রি হয়। জাকির হোসেন বলেন,‘রোজার শুরুর কয়েকদিন আগ থেকেই আমাদের মুড়ি ভাজার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে আমাদের হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। পাইকাররা যে পরিমাণের মুড়ি চায় আমরা তা দিতে পারি না।’ মনোয়ারা বেগম বলেন,‘আমাদের টাকা নেই, এ জন্য অন্যের মুড়ি ভাজি। সেখান থেকে প্রতিবস্তায় ৪০০ টাকা পাই তা দিয়ে কোনো মতে আমাদের সংসার চলে। স্বামী মারা যাবার পরে সন্তানদের নিয়ে মুড়ি ভেজেই সংসার চালাই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করা হত তাহলে ভাল হতো।’ মোসলেম হাওলাদার বলেন,‘আমরা যারা মুড়ি ভাজি আমাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। অথচ এটা একটি কুটির শিল্প। আমাদের যদি বিসিক থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয় তাহলে আমাদের উপকার হতো।’
মুড়ি বিক্রির জন্য এখানে গড়ে উঠেছে আড়ত। একটু স্বচ্ছল লোকেরা নিজেরাই বাজার থেকে ধান কিনে তা বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে চাল তৈরি করেন। তারপর মুড়ি ভেজে নিজেরাই বাজারজাত করেন। এরকম একজন আড়তদার মো. বুরজুক খান। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান,‘সারা বছরই আমাদের এখানকার মুড়ির চাহিদা রয়েছে। তবে রোজা এলে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও ঢাকা, চাঁদপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে আমাদের মুড়ি বিক্রি হয়। এমন কি ভারতেও যাচ্ছে এখানকার মুড়ি। চাহিদা অনুযায়ী মুড়ির যোগান দিতে কষ্ট হয়।’ এই রোজার মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি মুড়ি বিক্রি হবে বলেন তিনি।
এ ব্যাপারে দপদপিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বাবুল মৃধা জানান,‘দপদপিয়া ইউনিয়নে এত বড় শিল্প থাকায় আমি গর্বিত। আমাদের এখানকার মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নসহ হাজারও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’