ঝালকাঠির হাসপাতাল গুলোতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

প্রকাশিত: ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ, মে ১৬, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৫৯:পূর্বাহ্ণ, মে ১৬, ২০১৯

ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি’ আঘাত হানার পরদিন থেকেই কাঠফাটা রোদ্দুর, তীব্র তাপদাহ আর ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ট জনজীবন ও প্রাণিকূল। এতে রোগ ব্যাধী বেড়েই চলছে। পাশাপাশি সাধারন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্য বিষ ক্রিয়ায়। ফলে ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে ছুটছে জেলা উপজেলার হাসপাতাল গুলোতে। ১০০শয্যার ঝালকাঠি আধুনিক সদর হাসপাতাল, ৫০ শয্যার নলছিটি, রাজাপুর ও কাঠালিয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর প্রচন্ড ভীড়। হাসপাতালের নির্ধারিত বেড পরিপূর্ণ হয়ে মেঝেতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা করতে হচ্ছে রোগীদের। এর মধ্যে বেশিরভাগই শিশু ও মহিলার। বুধবার জেলার এ চিত্র দেখা গেছে।
ঝালকাঠি একশ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছে দেড়’শ থেকে দুই’শ রোগী। ফলে বাড়তি চাপে বেডে সংকুলান না হওয়ায় অনেক রোগীর স্থান হচ্ছে হাসপাতালের ওয়ার্ডের মেঝেতে এবং বারান্দায়। এ ছাড়া বহিঃ বিভাগ থেকে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত’শ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।
নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত কয়েকদিনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক রোগী ভর্তি হয়েছে। এখানেও একই অবস্থা। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে শতাধিক রোগি ভর্তি হওয়ায় বেডে দিতে না পারায় মেঝেতে এবং বারান্দায় বিছানা পেতে থাকতে হচ্ছে রোগীদের। এছাড়াও প্রতিদিন হাসপাতালের বহিঃ বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে নারী শিশুসহ গড়ে প্রায় ৩’শ রোগী। তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
নলছিটি উপজেলার তালতলা এলাকা থেকে এসেছে চিকিৎসা নিতে এসেছে সর্দি কাশিতে আক্রান্ত চার বছরের শিশু মিতু আক্তার। তার মা জানালেন স্থানীয় হোমিও চিকিৎসায় কাজ না হওয়ায় এখানে এসে তিন দিন আগে ভর্তি হলেও অবস্থার কোন উন্নতি নেই। চিকিৎসক জানিয়েছে তার নিউমুনিয়া ধরা পড়েছে। পৌর এলাকার শীতলপাড়া থেকে প্রচন্ড গরমে অসুস্থ হয়ে এসেছেন লিটন হাওলাদার। এখানে এসে স্যালাইন দেয়ার পর কিছুটা সুস্থতা বোধ করছেন। গত কয়েকদিনের প্রচন্ড গরমে ডাইরিয়া, সর্দি, কাশি, নিউমুনিয়া সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছে শতশত নারী-পুরুষ। কিন্তু ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালে রয়েছে চিকিৎসক সংকট। রয়েছে পরীক্ষা নিরিক্ষা করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অভাব। ওয়ার্ড গুলোতে নেই প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক পাখা, হাসপাতালের টয়লেটও রোগীদের জন্য অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মনেবুর রহমান জুয়েল জানান,‘গত কয়েকদিনে হাসপাতালের বহিঃবিভাগে গড়ে ৩ শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে আবাসিক চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন।’ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা.আওছাফুল ইসলাম রাসেল জানান,‘প্রতিদিনই রোগীদের চাপ বাড়ছে। অল্প জনবল নিয়ে যা সামাল দেয়া কষ্টকর। তারপরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সাধ্যমত সেবা প্রদান করে যাচ্ছি।’ চিকিৎসকরা বলছেন শুধু শিশু নয়, প্রতিদিন শত শত প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষকে চিকিৎসা দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চলমান তাপদাহকেই উলে­খ করছেন তারা।
নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মানষ কৃষ্ণ কুন্ড জানান,‘তাপমাত্রা বাড়লে ডাইরিয়া সহ বিভিন্ন জীবানু সংক্রমণের ক্ষমতা বেড়ে যায়। তাই এ সময় সর্তকতাই বড় প্রতিরোধ। এসময় প্রচুর পরিমাণ তরল জাতীয় খাবার ও প্রখর রোদ এড়িয়ে চলতে হবে।’ এছাড়া ইফতারে ভাজা পোড়া খাবারের পরিবর্তে তরল জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এ চিকিৎসক।
রাজাপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত এক সপ্তাহে শতাধিক লোক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ শিশু ও বৃদ্ধ। গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ জন। তবে এর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন চিকিৎসকরা। জানাগেছে, ৫০ শয্যার এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মঙ্গলবার ১১টা পর্যন্ত ভর্তি রোগী রয়েছে ৯৪ জন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী আইভি (শরীরে পুষ করার) স্যালাইন সরবরাহ করতে পারছেনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগীদের সাথে থাকা স্বজন করিমন্নেছা, আব্বাস আলী, বেলায়েত হোসেন, বাদশা মিয়া ও সাব্বির জানায়,‘আমরা বাহিরের দোকান থেকে বেশি মূল্যে স্যালাইন ক্রয় করে রোগীর চিকিৎসা করাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার আবুল খায়ের মোহাম্মদ রাসেল জানান,‘সিভিল সার্জন অফিস থেকে স্যালাইন সরবরাহ কম পাচ্ছি বলে রোগীদের বাহির থেকে কিনে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।’ তিনি আরো জানান, প্রচন্ড তাপদাহে ও দোকানের খোলা খাবার খাওয়ার ফলে আকস্মিক ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। তাপমাত্রা কমলে ডায়রিয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। অপরদিকে রোগীদের ভিড়ে চিকিৎসক ও সেবীকারা হিমশিম খাচ্ছেন। বিশ্রাম নেয়ার সময়ও পাচ্ছেন না বলে তারা জানান। অধিকহারে রোগী র্ভতি হওয়ায় রোগীদের বারান্ধায় জায়গা দিতে হচ্ছে।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার গোলাম ফরহাদ বলেন,‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সেবা প্রদানের ব্যাপারে আমরা সচেষ্ট আছি। গরমে সুস্থ থাকার জন্য ফুটপাতের পঁচা বাসি খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। সেই সাথে স্বাস্থ্য সম্মত খাবার ও বেশি করে পানি পান করতে হবে।’ আর তীব্র রোদে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের না হওয়ারও পরামর্শ এই চিকিৎসকের।
এদিকে তীব্র রোদ আর তাপদাহে প্রাচীন বন্দর ঝালকাঠির শ্রমজীবিদের নাভিশ্বাস অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জেলা শহরের আড়দ্দার পট্টিতে লবন ও হ্যান্ডেলিংসহ তিন শতাধিক শ্রমজীবি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন তীব্র রোদের সাথে গা পোড়ানো গরমে।’