অগ্নিসৈনিক সোহেলের মৃত্যুতে পরিবার দিশেহারা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯ | আপডেট: ১০:১৩:পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯

অগ্নিসৈনিক সোহেল রানার জন্ম হয়েছিল কৃষক পরিবারে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। একটি টিনের দোচালা ঘরে বাবা-মা চাচা-চাচিসহ সবাই থাকতেন গাদাগাদি করে। অটোরিকশা চালিয়ে আর প্রাইভেট পড়িয়ে এইচএসসি পাস করেন। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় ছোট বোন সেলিনা আকতার, তিন ভাই উজ্জ্বল, রুবেল ও দেলোয়ারকে লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর।

সোহেল রানার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাংগায়। বাবা নুরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসড। বাঁ পা চিকন হয়ে কাজ করার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। তাই পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে সোহেল রানাকে।

বাড়ির পাশের চৌগাঙ্গা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন। পরে ২০১৪ সালে করিমগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সে সময় পরিবারের হাল ধরতে ২০১৫ সালে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন সোহেল রানা। তাঁর রোজগারের টাকা দিয়েই চলে আসছিল পুরো পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন স্বজনরা।

আজ সোমবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সোহেল রানার মৃত্যুর খবর শুনতে পায় তাঁর পরিবার। এরপর থেকে মা-বাবাসহ পুরো পরিবারে নেমে আসে শোক।

এলাকাবাসী জানান, সোহেল রানা অত্যন্ত বিনয়ী স্বভাবের ছিলেন। বাড়ি এলে আশপাশের লোকজনের খোঁজখবর নিতেন।

চৌগাঙ্গা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান জানান, ছেলেটি খুবই অমায়িক ছিল। পরিবার দরিদ্র হওয়ায় আমরা তাকে লেখাপড়ায় সহযোগিতা করেছি। চাকরি পাওয়ার পর বাড়ি এলেই স্কুলের খোঁজখবর নিত।

সোহেল রানার বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, সোহেলের স্বপ্ন ছিল ছোট ভাইয়েরে ঢাকায় নিয়া ভালো কলেজে ভর্তি করব। আজ সোহেল নাই। এহন কে নিব আমার পোলারে পড়াইতে।

এদিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিঙ্গাপুরে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সোহেল রানার মরদেহ আজ রাতে দেশে ফেরত আনা হবে। এরপর আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় উপপরিচালকসহ ৫৪ জন সদস্য উপস্থিত থেকে সোহেল রানাকে গার্ড অব অনার দেবেন।

অনেকেই এ নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। সাংবাদিক শরীফুল হাসান লিখেছেন: আমি বলবো এই মৃত্যু মানুষের জন্য মৃত্যু। এই মৃত্যু জীবনের জন্য। ফায়ার সার্ভিস আর রাষ্ট্রকে বলবো সোহেলের এই বীরত্বগাঁথার জন্য তাকে যথাযথ সম্মামনা দেয়া হোক। তার পরিবারের পাশে থাকুক রাষ্ট্র। পরপারে ভালো থাকুন সোহেল।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আটকাপড়া মানুষদের ল্যাডারের মাধ্যমে নামাচ্ছিলেন রানা। কিন্তু বাস্কেট বেশি উঠে যাওয়ায় আহতদের নামানো যাচ্ছিল না।

সোহেল রানা তখন মই বেয়ে নামতে যান। কিন্তু ওই অবস্থায়ই মই চলতে শুরু করলে রানার ডান পা আটকে গিয়ে কয়েক জায়গায় ভেঙে যায়। সেফটি বেল্টের চাপে পেটের একটা অংশও থেঁতলে যায়।

দুর্ঘটনার পরপরই সোহেল রানাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না। পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার। সে কারণে সিএমএইচের চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে।

  • কালের কণ্ঠ