এবার স্কুলশিক্ষার্থী তিন বোনসহ ৪ জনকে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯ | আপডেট: ১০:০৮:পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯

নরসিংদীর রায়পুরার উত্তর বাখননগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামে সামছুল মিয়ার বাড়িতে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ধরিয়ে দেওয়া আগুনে ঘুমন্ত অবস্থায় দগ্ধ হয়েছেন তিন বোন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী প্রীতি আক্তার (১১), অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুইটি আক্তার (১৩), এসএসসি পরীক্ষার্থী মুক্তামণি (১৬) এবং তাদের ফুফু খাতুন নেসা (৬৫)।

তাদের প্রত্যেকেরই দুহাত, মুখ ও শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় চারজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এ ইউনিটেই শয্যাশায়ী ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে মারাত্মক দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি; বাঁচার জন্য চলছে তার প্রাণপণ লড়াই। শিক্ষকের লালসার শিকার নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।

পৈশাচিক এ ঘটনায় দেশের মানুষ যখন বিস্ময়ে হতবাক, যখন মুমূর্ষু নুসরাতকে বাঁচিয়ে রাখতে চলছে চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা, অসংখ্য মানুষ করছেন প্রার্থনা, তখন নরসিংদীর রায়পুরায় ঘটল ন্যক্কারজনক এ ঘটনা।

লোচনপুরের স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাদককারবারি রবিন, শিপন, কাজল, লোকমান ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা জমি-জমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ অপকর্ম করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দগ্ধ চারজনের স্বজনরা। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত সন্দেহে পুলিশ ইতোমধ্যে ২ জনকে আটকও
করেছে।

ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের মেডিক্যাল অফিসার ডা. এনায়েত কবির জানান, দগ্ধদের প্রত্যেকেরই দুহাত, মুখ ও শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। এর মধ্যে খাতুন নেসার ১২, প্রীতির ১৫, মুক্তামণির ১০ ও সুইটির শরীরের ১৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাউকেই আশঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে দুবছর আগে মিস্টার নামে একই গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন। এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি সামছুল মিয়ার ছেলে দগ্ধ তিন বোনের ভাই বিপ্লব ও সোহাগ।

ওই হত্যাকা-ের জের ধরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি গ্রামে ফের গণ্ডগোল হয় খুন হওয়া মিস্টারের ভাতিজা দুলাল মিয়া আর বিপ্লব গ্রুপের মধ্যে। পাল্টাপাল্টি এ হামলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন দুলাল মিয়া। এ হত্যা মামলায়ও বিপ্লব ও সোহাগ অন্যতম আসামি।

একই পরিবারের দুজনকে হত্যার জের ধরে দুলালের পক্ষের লোকজন ওই ঘটনার পরপর বিপ্লবের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায় এবং যাওয়ার সময় বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে সেদিন সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে পালান বিপ্লব। আদালত থেকে কিছুদিন আগে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

এর পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে মনে করে গত সোমবার তিন বোন ও ফুফুকে নিয়ে গোপনে বাড়িতে ফিরে আসেন বিপ্লব। পোড়া ঘরেই রাতে ঘুমিয়ে পড়েন সবাই এবং ভোরে আগুনে দগ্ধ হন। খবর পেয়ে স্থানীয়রা তাদের রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি ঘটায় ৪ জনকে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।

স্থানীয়দের ধারণা, পেট্রলবোমা ছুড়ে বিপ্লবদের ঘরে আগুন লাগানো হয়েছে। হত্যাকা- নিয়ে বিরোধের জেরে এ অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, এ বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত হলেও কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছেÑ সে সম্পর্কে তারা কিছু জানাতে পারেননি।

লোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের কথায় অবশ্য ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনা কখন ঘটেছে জানি না। ধারণা করছি, হত্যা মামলার আসামি বিপ্লব পাল্টা মামলা করার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

রায়পুরা ফায়ার সার্ভিসের ফায়ারম্যান শেখ হানিফ বলেন, লোচনপুর গ্রামে বিপ্লবদের বাড়িতে আগুন লেগেছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু সেখানে আগুনে দগ্ধ বা আগুনের কোনো আলামত মেলেনি।

রায়পুরা থানার ওসি মহসিনুল কবির জানান, লোচনপুর গ্রামে পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই হত্যাকা-ের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামি সোহাগ ও বিপ্লব। সেই ঘটনার জেরে অন্য কেউ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দগ্ধদের সঙ্গে কথা বলে কীভাবে আগুন লেগেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। অগ্নিকা-ের এ ঘটনায় দুজনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করেননি ওসি।