চমক দেখালো গৌরবের ছাত্রলীগ–আলম রায়হান

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৫৪:অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০১৯

নানান অস্বস্তির পর চরম খড়ায় হঠাৎ বৃষ্টির মতো স্বস্তির চমক দেখালো নানান ঐতিহাসিক ধারক ছাত্রলীগ। ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হককে বরণ করে নিয়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ঢাবির টিএসসির মিলনায়তনে প্রবেশ করে বরণ করে নেন ডাকসুর পরবর্তী ভিপি নুরুল হককে। এ সময় সেখানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। টিএসসি মিলনায়তনে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ‘আমাদের সবার চাওয়া-পাওয়া নুরুল হক পূরণ করবে। এ সময় নুরুল হক ছাত্রলীগ সভাপতির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। এর আগে ঘটেছে অনেক অবাঞ্চিত ঘটনা; রাজনীতির পানি অনেকটাই ঘোলা করেছিলো ছাত্রলীগ। তবে শেষতক বিচক্ষণতারও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে ঐতিহ্যের ধারক ছাত্রলীগ।

দীর্ঘ ২৮ বছর ১০ মাস পর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১১ মার্চ, স্বাধীনতার মাসে। রাত সোয়া তিনটায় ঘোষিত ফলে দেখা যায়, ভোট বর্জন করেও সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হয়েছেন নুরুল হক। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী। সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) হয়েছেন সাদ্দাম হোসেন। ডাকসুর মোট ২৫টি পদের মধ্যে ২৩ টিতেই ছাত্রলীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এদিকে ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ১২ টিতে ভিপি পদে জয়ী হয়েছে ছাত্রলীগ। বাকি ছয়টি হলে ভিপি পদে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ছাত্রদের হলে ছাত্রলীগ প্রায় একচেটিয়া জয় পেলেও ছাত্রীদের পাঁচটি হলের মধ্যে চারটিতেই হেরেছে তারা।

স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনের অন্দোলনের গৌরব ভূমিকা এবং জাতীয় নেতা তৈরী হবার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ডাকসু। এদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৮ বছর পর। যে কারণে এ নির্বাচনকে ঘিরে আনন্দ-উৎসবের মাত্রাটা ছিলো একটু বেশিই। কিন্তু উৎসবের নির্বাচনে নিরানন্দের ছায়া ফেলেছে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ, কয়েকজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের অশ্রদ্ধার ভূমিকা এবং নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হকের উপর হামলার ঘটনায়। যা পুরো বিয়টিকে ম্লান করে দিয়েছে। বিশেষ করে ভিপি পদে ফল প্রত্যাখান করে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের তান্ডব অন্যরকম কলংকের উপাখ্যান সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন অনেকেই। অনেকের মতে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে তা প্রত্যাশার উল্টো মেরুর। এবার ডাকসু নির্বাচন আমাদের শিক্ষক রাজনীতির অন্ধকার একটি দিক তুলে ধরল। একজন শিক্ষকের কাছে সব শিক্ষার্থীই সমান। তাঁর দলীয় পরিচয় যাই হোক না কেন। এই নির্বাচনে শিক্ষকেরা সেটি দেখাতে ব্যর্থ হলেন। এর ফলে তাঁদের ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা কমবে। শিক্ষক হিসেবে আমাদের সামাজিক মর্যাদা একটুখানি হলেও হারাব।

ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক ও তাঁর সহকর্মীদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। নির্বাচনের পরদিন ১২ মার্চ দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। বেলা পৌনে ২টার দিকে নতুন ভিপি নুরুল হক সহকর্মীদের নিয়ে টিএসসিতে আসেন। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন নুরুল হক। এ সময় মিছিল নিয়ে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা কর্মীরা ডাকসু নির্বাচনে কোটা আন্দোলনকারীদের প্যানেলের সদস্যদের ওপর হামলা করেন। ধাওয়া খেয়ে নুরুল হক ও অন্য সহকর্মীরা টিএসসির ভেতর ঢুকে পড়েন।

উল্লেখ্য ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে হারিয়ে নির্বাচিত হন নুরুল হক। ছাত্রলীগ এ ফল মেনে নেয়নি। রাতে ভিপি পদে বিজয়ী হিসেবে নুরুল হকের নাম ঘোষণার পর থেকে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রলীগ। রাতে ফল ঘোষণার সময় সিনেট ভবনের চারপাশে বিক্ষোভ করতে থাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপাচার্য অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে তিনি বাসায় ফিরে যান। পরদিন ডাকসু’র নবনির্বাচিত ভিপি’র উপর কেবল হামলা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। এ সময় তারা নীলক্ষেত মোড়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ছাত্রলীগ কর্মী ও সমর্থকেরা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেয় ‘প্রহসনের নির্বাচন মানি না, মানবো না।’ বিক্ষোভকারীদের দাবি, নুরুল হক জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই তাঁকে তারা ভিপি হিসেবে মানবে না। বিক্ষোভকারীদের দাবি সত্য হলে তা খুবই উদ্বেগের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ অভিযোগ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আসলো কেন? আর ডাকসু’র ভিপির উপর হামলা করার অধিকার ছাত্রলীগকে কে দিয়েছে?

ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ ও আশার সঞ্চার হয়েছিল। যা ছিলো অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। উৎসাহের পাশাপাশি উত্তেজনাও ছিলো। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, তার পুরো উল্টো দৃশ্যপট সৃষ্টি হবে ডাকসু নির্বাচনে। কোন রকম অভিযোগ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হবে ডাকসু নির্বাচন। কিন্তু তা হলো না। বরং অন্যরকম কলংকের উদারণ সৃষ্টি করলো নানান গৌরবের অধিকারী ছাত্রলীগ। এটি খুবই হতাশার ঘটনা।

ডাকসু নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার পর প্রত্যাশা করা হয়েছিলো, এই নির্বাচন ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদদের তৈরি হওয়ার স্বর্ণদ্বার আবার খুলে দেবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বড় রকম হোচট খেলো। কয়েক যুগ ধরে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে কোনো নির্বাচন হয়নি। ৩৫/৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ থাকে এবং নিয়মিত নির্বাচন হলে অনেক মেধাবী রাজনৈতিক জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতেন। কিন্তু তা হয়নি বলে তৃণমূল থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির সুযোগটা বাধাগ্রস্থ হয়েছে। এ শূন্যতা এবং রাজনীতির আরো অনেক দৈন্য দশার কারণে জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের দাপট চরমে পৌছেছে। শুধু তাই নয়, তরুণরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আসতে উৎসাহ বোধ করছেন না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা সেই শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছেন। অনাকাংখিত হলেও এটি একরকমের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডাকসু নির্বাচন ঘটনাপ্রবাহের দায় কেবল ছাত্রলীগের নয়। এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং কর্মপদ্ধতি ঠিক করা হয়, তখন থেকেই শুধু ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সবাই তাতে পরিবর্তন আনার দাবি করেছিলো। একটি দাবি ছিল ভোট প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য ভোটকেন্দ্র হলগুলোর বাইরে একাডেমিক ভবনে স্থাপন করা। কারণ, হলগুলোতে ছাত্রলীগের একাধিপত্য। সকলেই জানেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিসর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এর উপর গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির কথাও অনেকেরই জানা। ফলে উত্থাপিত দাবিগুলোর অনেকগুলো বিবেচনাযোগ্য ছিলো। অথচ আমলেই নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আর এর বিরূপ ফলও পাওয়াগেছে হাতেহাতে। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে ভোট দিতে হলে প্রবেশ করতে পারেনি। আর ব্যালট ভর্তি বস্তা পাওয়ার বিষয়টি বড় রকমের ন্যাক্যারজনক ঘটনার জন্ম দিলো। এ ঘটনায় একজন প্রভোস্টকে অপসারণ করা হলেও শিক্ষকদের উপর থেকে কলংকের ছাপ মুছে যায়নি।

জাতীয়, স্থানীয় থেকে শুরু করে ডাকসু নির্বাচন পর্যন্ত আমরা কোন মডেলের নির্বাচনে আছি? এ ধারার নির্বাচনের ভবিষ্যৎ কি? তা ছাড়া নির্বাচনের আগেই যে ব্যালট বাক্স ভর্তি হলো। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলবে, মাত্র দু’এক জায়গায় এ রকম হয়েছে। কিন্তু বাকী যে হয়নি তার নিশ্চয়তা কে দেবে নিশ্চিতভাবে! তা ছাড়া নির্বাচনটা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের, যাঁরা জাতিকে ভবিষ্যতে পথ দেখাবেন। এটি কি পথ দেখাবার নমুনা?

আশা করা হয়েছিলো, ডাকসু নির্বাচন হবে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অভিযোগবিহীন। বাস্তবে তা হয়নি। এমনকি ব্যালট বাক্সও স্বচ্ছ রাখা হয়নি। অনেকগুলো প্রশ্নবোধক চিহ্ন প্রকট রেখে ডাকসু নির্বাচন করা হলো। এখন দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, যারা হয়তো একটা আদর্শ নির্বাচন করবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ভিত্তিটাও তেমন জোরালো বলে মনে হচ্ছে না। বরং, অনেকের বিবেচনায় সুদূর পরাহত। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, রাজনীতির পানি খুব বেশি ঘোলা হবার আগেই নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছে ছাত্রলীগ। আর এটি ধরে নেয়া যায়, এর পিছনে কাজ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ।

আলম রায়হান: সাংবাদিক ও কলামিস্ট