খাদের কিনারে বিএনপি, না আওয়ামী লীগ?

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:৪৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৭ | আপডেট: ১২:৪৩:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৭
খাদের কিনারে বিএনপি, না আওয়ামী লীগ?

মোহাম্মদ আবদুল গফুর: বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খাদেলা জিয়া দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, দেশের গণতন্ত্র আবারো গভীর খাদের কিনারে গিয়ে পড়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের বলেছেন, গণতন্ত্র নয়, বিএনপিই এখন খাদের কিনারে পড়েছে। এমনিতে মনে হবে জনাব কাদের বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের বিরোধিতার চেষ্টা করেছেন। কিন্তুু প্রকৃত পক্ষে তিনি যা বলেছেন তাতে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রতি তাঁর পরোক্ষ সমর্থনই ব্যক্ত হয়েছে।

জনাব ওবায়দুল কাদের নিশ্চয়ই জানেন বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষেত্রে যে দুটি রাজনৈতিক দল প্রধান দল হিসাবে সর্বজন স্বীকৃত, তার অন্যতম বিএনপি। তিনি নিশ্চয়ই আরও জানেন যে, গণতান্ত্রিক আদর্শের নিরিখে তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগের ইতিহাস খুব পরিচ্ছন্ন নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূলে সুদীর্ঘ দিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অবদান থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম সরকারের আমলেই গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরে এক দলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল।

ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়, বহু দু:খজনক ঘটনার মধ্যদিয়ে একদলীয় বাকশালী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুন: প্রবর্তিত হলেও এক পর্যায়ে তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক ক্যুর মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে বসেন। সে সময় দুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে সেই সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন দিয়ে বসে আওয়ামী লীগ। এটা সম্ভব হয়েছিল হয়তো এই চিন্তা থেকে যে, সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া ঐ নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগের নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের অন্যতম বিএনপি। এর অর্থ হলো নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তুলনায় আওয়ামী লীগের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেলের শাসন।

সংবাদপত্র পাঠক মাত্রের স্মরণ থাকার কথা, এর পর শুরু হয় জেনারেল এরশাদের সুদীর্ঘ স্বৈর শাসন। এর পাশাপাশি শুরু হয় রাজনীতি ক্ষেত্রে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের স্বৈরাচারী এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন। অন্যরা এই আন্দোলনের শরীক হলেও বহু দিন পর্যন্ত এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে দূরে থাকে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। বহুদিন পর আওয়ামী লীগ এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিলেও ততদিনে রাজনীতিতে নবাগতা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া একটানা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আপোষহীন নেত্রী হিসাবে সুনাম অর্জন করে ফেলেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় এরশাদ শাসনামলের শেষ দিকে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে।

এ নির্বাচন যাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দল একমত হয়। দেশের সর্ব প্রথম নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনের এ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া হন প্রধান মন্ত্রী। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা হন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী। এরপর বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালের মেয়াদ শেষে যখন নতুন নির্বাচনের প্রশ্ন আসে, তখন প্রধানত বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবীর মুখেই দেশের সকল জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে এই মর্মে সংবিধান সংশোধন করা হয়। বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতির নির্বাচনই যে গণতন্ত্রের নিরিখে সব চাইতে উপযোগী তা বাস্তব ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়। কারণ এই পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে দেশের দুই প্রধান দল পালাক্রমে বিজয়ী হয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ লাভ করে।

পরবর্তীতে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই সুন্দর গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বদলিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিলে বিএনপি নির্বাচন-পদ্ধতি প্রশ্নে দুই প্রধান দলের অতীতের সমঝোতা লংঘনের অভিযোগে সে নির্বাচন বয়কট করে। দেশের দুই প্রধান দলের অন্যতম বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় সে নির্বাচন বাস্তবে হয়ে পড়ে নির্বাচনী প্রহসন। ভোটের নির্দিষ্ট সময়ে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র থাকে ফাঁকা। বিরোধী দল তো দূরে থাক, সরকারী দলের অনেক নেতাকর্মীও সে নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার গরজ অনুভব করেননি। কারণ তারা জানতেন তারা না গেলেও দলের পক্ষ থেকে তাদের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা ঠিকই করা হবে। বাস্তবে হয়ও সেটাই। বিরোধী দলের ভোটারদের অনুপস্থিতির সুযোগে সরকারী দলের অল্পসংখ্যক নেতাকর্মীই সরকারী দলীয় প্রার্থীদের ব্যালটপত্রে ইচ্ছামত সীল মেরে তাদের ‘বিপুল ভোটে বিজয়ী’ দেখানোর দুর্লভ সুযোগ গ্রহণ করেন।

অথচ ভোটের নির্দিষ্ট সময়ে অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র ছিল জনশূন্য, ফাঁকা। পরদিন পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে জনগণ প্রকৃত পরিস্থিতি অবহিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন এবং ৫ জানুয়ারীর এই নির্বাচনী প্রহসনের নাম দেন ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’। এটাও তো ছিল ৫ জানুয়ারীর সেই সব আসনের কথা, যেসব আসনে ‘নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের মোট তিনশ আসনের অধিকাংশ ১৫৩ আসনে তো এ ধরনের নির্বাচনী মহড়াও অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। সেসব আসনে বিরোধী দলের বয়কটের বদৌলতে সরকার দলীয় প্রার্থীরা ‘বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত’ হন।
বর্তমানে বাংলাদেশে যে জাতীয় সংসদ রয়েছে এটাই হচ্ছে তার গড়ে ওঠার বাস্তব ইতিহাস। গণতন্ত্রের নিরিখে যে কোন দেশের পার্লামেন্টে সরকারী দল ও বিরোধী দল থাকার কথা। এরশাদ পরবর্তী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের শেষ দিকে প্রধানত তদানীন্তন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবীর মুখেই সকল সাধারণ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি সাধারণ নির্বাচন সেভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী হয়, নিজের উত্থাপিত সে দাবীর ভিত্তিতে নির্বাচন দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন অতিশয় ভয় পান। কেন? কারণ তাতে দেশে গণতন্ত্র সুসংহত হলেও আওয়ামী লীগের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত হবে।

এভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তোলার প্রক্রিয়াকে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া যদি গণতন্ত্রকে খাদের কিনারে ঠৈলে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন, তবে তাঁর সে বক্তব্যের সত্যতা অস্বীকার করা যাবে কি? যাবে না। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যে বলেছেন, গণতন্ত্র নয়, বিএনপিই বর্তমানে খাদের কিনারে রয়েছে তাও এক হিসাবে সত্য। কারণ আওয়ামী লীগ অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতাসীন হলেও যেভাবে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় বিরোধী দলকে ক্ষমতাসীন হওয়ার সকল পথ বন্ধ করে রাখছে তাতে বিএনপির পক্ষে ক্ষমতায় পুনরায় অধিষ্ঠিত হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে এজন্য জনগণ যে বিএনপির প্রতি আস্থা হারিয়েছে এমনটা চিন্তা করা অবাস্তব। প্রকৃত পক্ষে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জনগণ যে বিপুল ভোটে বিএনপিকে নির্বাচিত করবে, এই ভয়েই আওয়ামী লীগ কিছুতেই তার অতীতের দাবী মোতাবেক নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন দিতে সাহস পাচ্ছে না। অথচ গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে, জনগণের স্বাধীন মতামতের আলোকে তাদের পছন্দের দল বা প্রতিনিধিদের হাতে দেশ পরিচালনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এর পরিবর্তে কলে কৌশলে ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার চিন্তার মধ্যে গণতন্ত্রে আস্থাহীনতারই প্রমাণ মেলে।

আওয়ামী লীগ দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে দেশকে গণতন্ত্রহীনতার খাদের কিনারে ঠেলে দিয়ে বিএনপি খাদের কিনারে নেমে গেছে বলে যদি আত্মতৃপ্তি অনুভব করতে চায় তা হলে তাদের প্রতি বিএনপি যদি চ্যালেঞ্জ জানায় যে, এরশাদ পরবর্তী খালেদা সরকারের শাসনামলের শেষ দিকে প্রধানত শেখ হাসিনার দাবীর মুখেই যে দেশের সকল সাধারণ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করা হয়, সে সত্যটি জানিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনার নিজের দাবীর মোতাবেক নির্বাচন দিতে তিনি এখন এত ভয় পান কেন, সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তাঁর নিজের সে দাবী মোতাবেক পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন দিতে যদি তিনি সাহসী না থাকেন, তা হলে বুঝতে হবে, তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে বলে তাঁর নিজের অতীতের সে দাবী মোতাবেক নির্বাচনে তাঁর বিজয়ী হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের অতীত দাবী মোতাবেক নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন দিতে সাহসী না হলে বুঝতে হবে, বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগই খাদের কিনারে পড়ে গেছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে গণতন্ত্র ধ্বংস করে স্বৈরতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হওয়া ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন পথ খোলা নেই।

  • দৈনিক ইনকিলাব