রাসুল (সা.) সর্বোত্তম জীবনাদর্শ

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৭ | আপডেট: ৮:৩৬:পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৭
রাসুল (সা.) সর্বোত্তম জীবনাদর্শ

আবু রুফাইদাহ রফিক

পৃথিবীর তাবৎ মনীষীর মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম হচ্ছেন মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুসরণ করা যায়। শুধু মুসলিমরা নয়; অমুসলিমরাও তার জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। মহান আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন তার দ্বীনের জন্য। আর তাই তার মধ্যে মানবীয় সব গুণের সমাহার ঘটিয়েছেন। শৈশবেই তিনি তার ‘সিনাচাক’ তথা বক্ষ বিদারণ করে তার কলবকে পবিত্র করে দিয়েছিলেন। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি কোনো ধরনের অন্যায়ের প্রতি ধাবিত হননি। তিনি একটি অত্যন্ত পঙ্কিল সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ সাধারণ কোনো অপরাধেও তিনি কখনও জড়িত হননি। তার সততা, নিষ্ঠা, চারিত্রিক মাধুর্য, আমানতদারি, বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি উন্নত গুণের কথা তখনকার সমাজেই খ্যাতি লাভ করেছিল। এ জন্য সমাজে তিনি ‘আল আমিন’ বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার দূরদর্শিতার কারণেই কোরাইশ গোত্রগুলো একটি ভয়াবহ যুদ্ধ থেকে রক্ষা পায়। সমাজের মানুষের সেবা করার জন্য তিনি তরুণ বয়সেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক সংগঠন। নবুয়ত লাভের আগেই মহান আল্লাহ তার এ প্রিয় বান্দাকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে এমনভাবে রক্ষা করেছেন যে, নবুয়ত লাভের পর শত্রুরা তার বিরুদ্ধে ক্ষুদ্রতম কোনো অন্যায়ের অভিযোগও আনতে পারেনি। তাকে তারা পাগল, কবি, জাদুকর ইত্যাদি বলে গালি দিলেও কখনও তাকে মিথ্যাবাদী কিংবা বিশ্বাসঘাতক জাতীয় কোনো বিশেষণ দিতে সক্ষম হয়নি। স্বয়ং আল্লাহ হেফাজত না করলে এটি সম্ভব হতো না। হেরা গুহায় নবুয়ত লাভ করার পর প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে নিজের জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করলে স্ত্রী বলেছিলেন, আল্লাহর শপথ, তিনি আপনাকে কখনও লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সদা সত্য কথা বলেন, অন্যের জন্য নিজে কষ্ট ভোগ করেন, অন্ন-বস্ত্রহীনকে অন্ন-বস্ত্র দান করেন, সৎ কাজে সাহায্য করেন। এসব গুণ তার নবুয়ত লাভের আগেকার। এগুলোর সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সবচেয়ে কাছের মানুষটি, যিনি তার সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি জানতেন। সর্বপ্রথম তিনিই তার প্রতি ইমান এনেছিলেন। প্রথমদিকে যারা তার প্রতি ইমান এনেছেন, তারা সবাই ছিলেন কাছের মানুষ, তখনকার সমাজের সবচেয়ে ভালো লোক। তারা আগে থেকেই তার নির্মল চরিত্র সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। তাই তার পক্ষ থেকে দাওয়াত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সানন্দে তাকে বিশ্বাস করেছেন।

মদিনায় হিজরতের আগে সেখানকার গোত্রে গোত্রে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। হিজরতের পর মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাদের বিবাদ দূর করে শান্তি স্থাপন করেন। মদিনায় বসবাসরত বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি রচনা করেন বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’, যা যুগে যুগে শাসকদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। তাকে শুধু একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। তাকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য আদর্শ নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি যেমন নামাজের ইমাম ছিলেন, তেমন ছিলেন একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ছিলেন আদর্শ বন্ধু, আদর্শ স্বামী, আদর্শ পিতা, আদর্শ সমরনায়ক। তিনি পরিবারে ছিলেন, সমাজে ছিলেন, রাষ্ট্রে ছিলেন। ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে, সন্ধিতে ও চুক্তিতে।

মুহাম্মদ (সা.) অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। যে কোনো মানুষ খুব সহজেই তার সঙ্গে মিশতে পারত। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘হাসিমুখে কথা বলাও এক ধরনের সাদকাহ।’ ছোট-বড় সবাইকে তিনি সালাম দিতেন। মানব চরিত্রের এমন কোনো ভালো দিক নেই, যা মুহাম্মদের মধ্যে ছিল না। ক্ষমা, ধৈর্য, দয়া, দানশীলতা, উদারতা, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা- সব গুণই তার মধ্যে ছিল। হাদিস শাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডারে তার ব্যাপারে তার সঙ্গীরা এবং স্ত্রীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। শুধু হাদিস নয়, ইতিহাসের গ্রন্থগুলোও তার চরিত্রের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে। অমুসলিম ঐতিহাসিকরাও তার ব্যাপারে ইতিবাচক বর্ণনা করেছেন। তবে তার ব্যাপারে মহান আল্লাহর এ কথাই যথেষ্ট- নিশ্চয়ই তুমি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। মুহাম্মদের (সা.) এমন চরিত্রের কারণও তিনি উল্লেখ করেছেন। তার শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। তিনি বলেন- আমাকে আমার রব শিক্ষা দিয়েছেন এবং উত্তমভাবেই শিক্ষা দিয়েছেন।

এমন একজন মহামানবের সিরাত বা জীবনী অধ্যয়ন করা খুবই জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থায় তার জীবনী অন্তর্ভুক্ত করলে জাতির উপকারই হবে। ধর্মীয় নেতা হিসেবে নয়, সার্বজনীন আদর্শ নেতা হিসেবেই তাকে অধ্যয়ন করা উচিত। এতে লাভবান হবে মানবতা, লাভবান হবে বিশ্ব। আল্লাহর ঘোষণা- আমি তোমাকে বিশ্বজগতের রহমত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পাঠাইনি (সুরা আম্বিয়া)। আর যারা আখিরাতের কল্যাণ আশা করে, তাদের জন্য মুহাম্মদের (সা.) পূর্ণ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের আশা রাখে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের (সা.) মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব, আয়াত ২১)।

আরবি প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী