নেছারাবাদের বার্ষিক মাহ্ফিলের সমাপনী বয়ানে ৬ দফা প্রস্তাবনা

প্রকাশিত: ৩:৫০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯ | আপডেট: ৩:৫০:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯

রোববার বাদ ফজর নেছারাবাদী হুজুরের সমাপনী বয়ান ও আখেরী মুনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হল ঐতিহ্যবাহী ঝালকাঠি-নেছারাবাদ দরবার শরীফের ২ দিনব্যাপী বার্ষিক ঈছালে ছওয়াব ওয়াজ-মাহ্ফিল। শুক্রবার বাদ আছর হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ.-এর একমাত্র ছাহেবজাদা আমীরুল মুছলিহীন হযরত মাওলানা মুহম্মদ খলীলুর রহমান নেছারাবাদী হুজুর শতধা-বিচ্ছিন্ন মুসলিম উম্মাহ ও দেশ-জাতির রাহনোমায়ীর উদ্দেশ্যে এক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও নসীহত পেশ করে মাহফিলের উদ্বোধন করেন। নেছারাবাদী হুজুরের সমাপনী ভাষণে দেশ, জাতি ও উম্মাহর কল্যাণার্থে উপস্থিত কয়েক লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের মধ্য দিয়ে ০৬টি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যেঃ- উগ্র ও চরমপন্থা প্রতিরোধ, নিজ-নিজ স্বকীয়তা বজায় রেখে ‘মতানৈক্যসহ ঐক্য’ নীতির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, ইসলামী আদর্শের পরিপন্থি কাজ থেকে সরকারের বিরত থাকা, মহিলা মাদরাসার জন্য মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগ এবং আসাম ও কাশ্মীরে সংঘটিত হামলা-নির্যাতনের নিন্দা উল্লেখযোগ্য। পরে দেশ-জাতি-উম্মাহর কল্যাণ ও অব্যাহত সাফল্য কমনা করে আখেরী মুনাজাত পরিচালনা করেন হযরত নেছারাবাদী হুজুর।
সমাপনী বয়ানে নেছারাবাদী হুজুর বলেন ‘মুসলমান একটি আদর্শগত পরিচয়ের নাম। অর্থাৎ, যে আদর্শ ও গুণের অধিকারী হলে মানুষ মুসলমান পরিচয়ধারী হতে পারে, সে আদর্শের নাম হল ইসলাম। সুতরাং পৃথিবীর যে কোনো দেশ, বর্ণ গোত্র ভাষার মানুষ যেমন ইসলামের আদর্শ কবুল করলে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করতে পারেন, তেমনি খাঁটি মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েও ইসলামের বিরুদ্ধাচরণকারী মৌখিক দাবী সত্তে¡ও প্রকৃত মুসলমান পরিচয়ের অধিকারী হতে পারেন না।’
নেছারাবাদী হুজুর আরো বলেন ‘মুসলমান পরিচয়ধারীর প্রধান কর্তব্য হচ্ছে কল্যাণকামী হওয়া। অর্থাৎ, মানুষের জন্য কল্যাণকামীতাই হচ্ছে মুসলমানের প্রধান আদর্শ। কল্যাণকামীতার পথ কি? পথ হচ্ছে সিরাতে মুস্তাকীম। সিরাতে মুস্তাকীম কি? সিরাতে মুস্তাকীম হচ্ছে নবী-রসূল, সাহাবা আযমায়ীন, আওলিয়ায়ে কেরাম তথা সলফেসালেহীনের পথ। যারা এ পথ হারায়, তারা সিরাতুল মুস্তাকীম হারিয়ে অনিবার্যরূপে ইফরাতী-চরমপন্থী কিংবা তাফরীতী-শিথিলপন্থী হয়ে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। তাদের কারণেই মুসলিম সমাজে নানান বিবাদ-বিশৃঙ্খলা এবং বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। কল্যাণের নামে তারা অকল্যাণ ও অশান্তির বীজ বুনে দেয়।’
তিনি বলেন ‘কল্যাণকামী মানুষের কাজ কি? আল্লাহ তায়ালা এরশাদ ফরমান ‘হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদেরকে বিশ্বমানবের উপকারের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। বিশ্বমানবের উপকারের পথ হচ্ছে তোমরা মানবদেরকে ন্যায় ও ধর্মের কাজ করতে আদেশ দেবে এবং অন্যায় ও অধর্মের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে।’ (সূরা আলে ইমরান:১০০) বিশ্বনবী মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের আদর্শে সাহাবা আযমায়ীন, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন, আয়েম্মায়ে মুজতাহেদীন, সলফেসালেহীন-আওলিয়ে কেরাম বিশ্বমানেবের জন্য কল্যাণকামী হয়েছিলেন বলেই অর্ধপৃথিবীর অধিকর্তা হতে পেরেছিলো মুসলমান; যখনই তারা এই সম্মিলিত এবং ঐক্যবদ্ধ কল্যাণকামীকার পথ ছেড়ে ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তখনই শুরু হয়েছে তাদের অধঃপতন; আজকের বিশ্বে মুসলমান তাই পৃথিবীর সবচেয়ে অনুগৃহীত, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বিশৃঙ্খল জাতি হিসেবে বিবেচিত। সাবধান! কল্যাণকামীতার এই পথ ছেড়ে ঘুণাক্ষরেও মাযহাব বিরোধী, আওলিয়ায়ে কেরাম বিরোধী কোনো গোষ্ঠীর হাতে নিজেকে সমর্পণ করবেন না, তাতে দুনিয়া-আখেরাত তো যাবেই, এ দেশও ধ্বংস হয়ে যাবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই!’
নেছারাবাদী হুজুর বলেন‘হযরত মুজাদ্দেদে আলফেসানী রহ. হযরত শাহ্ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী রহ. হযরত শাহজালাল ইয়ামনী রহ. গরীব-নেওয়ায খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী রহ. মুজাদ্দেদে যামান হযরত আবুবকর সিদ্দীকী আল-কুরায়শী ফুরফুরাভী রহ. গওসে যমান শাহ্ সূফী হযরত নেছারুদ্দীন আহমদ রহ. এবং তাঁদের উত্তরসূরী মুজাদ্দেদে মিল্লাত হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. প্রমুখ কণ্যানকামীতার মৃর্ত প্রতীক ছিলেন বলেই তারা একদিকে যেমন ছিলেন বাতিলের আতঙ্ক, অন্যদিকে ছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গণমানুষের পরম বন্ধু। এইসব কল্যাণকামী মানুষের জন্যই উপমহাদেশ জুড়ে এখনো টিকে আছে অনুসৃত মধ্যপথ সিরাতে মুস্তাকীম; আর কুফরীর সমুদ্রে জেগে ওঠা একটুকরো ব-দ্বীপের এই তৌহীদী বাংলাদেশে আমরা স্থপন করতে পেরেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নযীর। আমরা যদি সলফেসালেহীন-আওলিয়ায়ে কেরামের পথ হারিয়ে ঐসব ইফরাতী আইএস কিংবা কোনো চরম মতাদর্শের পথে পা বাড়াতাম, তাহলে আজকের বাংলাদেশও ইরাক-আফগানিস্তানের মতো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে যেতো। আমরা যেন এ পথ না হারাই, হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. উদ্ভাবিত ‘ইত্তেহাদ মায়াল ইখতেলাফ’ ‘মতানৈক্যসহ ঐক্য’ নীতির ভিত্তিতে কলেমার দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হই; আল্লাহ আমাদের তৌফীক দিন। আমীন!’