মরণব্যাধী যৌতুক নির্যাতন

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:১৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৩৭:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯

গোলাম মোস্তফা (জি এম বারী):

স্বামী-স্ত্রী। পৃথিবীর সবচেয়ে আপন এবং মধুর একটি সম্পর্কের বন্ধন। পবিত্র কোরানে আল্লাহ মহান স্বামী-স্ত্রীর একজনকে অপরজনের পোশাক বলেছেন। সৃষ্টিগত কৌশলতায় একজনকে করেছেন অপরজনের সহায়ক। স্বামীর ওপর স্ত্রীর এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর কিছু অধিকার বা হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন তিনি। এককভাবে স্বামী কিংবা স্ত্রীর প্রচেষ্টায় একটি সংসারে কখনো সুখ আসতে পারে না। সংসারের সুখের জন্য উভয়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। স্ত্রীর ওপর স্বামীর কিছু হক বা অধিকার রয়েছে। স্বামী স্ত্রী একে অপরে এক সুতায় বাধা। স্বামী স্ত্রী সম্পর্কটা জনম জনম ধরে মায়ার জালে বাধা। যে দিন থেকে সম্পর্কের বাধনে বাধা হয় সেদিন থেকেই একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, প্রেম, মহব্বব বেরে যায়। বাস্তবে এমনিই ঘটনা ঘটেছে স্ত্রীর মৃত্যুর কথা শুনে স্বামীরও মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা বাংলাবাজার এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্ফরন হয়ে যারা মারগেছেন তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী এক সাথে দগ্ধ হয়ে মারাগেছেন। তার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান ছিল বলে স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারেনি তাই দুজনেই মৃত্যুকে একসাথে আলিঙ্গণ করে নিয়েছ। তাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালবাসার সর্ম্পকটা ছিল অটুট। আজ কিছু মানুষরূপী ভদ্রলোক যৌতুককে প্রধান্য দিচ্ছে বেশী। তারা স্ত্রীকে দৈহিক কাজে ব্যবহার করে আর অমানুষিক নির্যাতন করে এই ভদ্র সমাজে।

 

 

বরগুনার জেলার তালতলী উপজেলায় যৌতুকের দাবীতে স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে মারিয়া নামের এক গৃহবধু আত্মহত্যা করেছেন। ১২ ফেব্রুয়ারী তালতলী উপজেলার পঁচাকোড়লিয়া গ্রামে এঘটনাটি ঘটে। ঘটনার বিবরনে জানাগেছে বছরখানেক আগে হাড়িপাড়া এলাকার রহিম মোল্লার ছেলে সবিজ মোল্লার সঙ্গে পচাকোড়ালিয়া গ্রামের মধু মিয়ার মেয়ে মারিয়া বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদন পার হতেনা হতেই মরন নেশা যৌতুকের কারনে মারিয়ার সাংসারিক জিবনে অশান্তি নেমে আসে। গৃহবধু মারিয়ার উপর স্বামি সজিব সহ শ্বশুর শাশুড়ি মানসিকভাবে অত্যাচার চালাতে থাকে। যৌতুরেক দাবিতে মারিয়াকে সজিব পনের দিন আগে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় এবং মোবাইলে বিভিন্ন সময় যৌতুকের জন্য চাপ দেয়। গরিব বাবার পক্ষে যৌতুকের টাকা দেয়া সম্ভব নয়। যার কারনে অ আত্মহত্যা মারিয়া।

 

 

শেরপুরে ১৩ ফেব্রুয়ারি নালিতাবাড়ীতে তাসলিমা বেগম (২০) নামে এক নববধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পারিবারিকভাবে নালিতাবাড়ী উপজেলার গোবিন্দনগর নামাছিটপাড়া গ্রামের ছফর উদ্দিনের ছেলে আনিসুর রহমানের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী খালভাঙ্গা গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে তাসলিমা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের প্রথম দিকে তাদের সংসার ভালই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই যৌতুকের টাকা নিয়ে দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হতো। রাতে দুজনই খাওয়া দাওয়া করে নিজ ঘরে ঘুমাতে গেলে পরদিন সকালে ঘরের মেঝেতে তাসলিমার লাশ পড়ে দেখতে পান পরিবারের লোকজন। তাসলিমার মা খুকী বেগম জানান, আমার মেয়ে খুব আদরের ছিল, প্রায় আমার কাছে ফোন দিয়ে বলতো মা তোমার জামাই আমাকে খুব অত্যাচার করে, বুকটা ফেটে যোত কিছু করতে পারতাম না। বলতাম স্বামীর, শ্বশুর শ্বাশুুড়ির সেবা ভালো ভাবে করো । ৩/৪ দিন আগে জামাই আনিসুর আমার মেয়ে তাসলিমার কাছে কয়েক হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেছিল। ওই টাকা দিতে না পারায় তাসলিমাকে মাঝে-মধ্যেই নির্যাতন করত। এই যৌতুরেক জন্যই আমার মেয়েকে আনিস পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।

 

 

মাধবপুর উপজেলার কড়রা গ্রামের গৃহবধূ রিপা আক্তার (২৫) কে যৌতুকের জন্য স্বামী-শাশুরী নির্যাতন করে হত্যার পর লাশ ঘরের তীরের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে। মাধবপুর উপজেলার করড়া গ্রামের মৃত তৈয়ব আলীর ছেলে বেনু মিয়ার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী নাসিরনগর উপজেলার শ্রীঘর গ্রামের ফারুক মিয়ার মেয়ে রিপার প্রায় ৫ বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বেনু ও তার পরিবারের লোকজন রিপা ও তার পরিবারের কাছে যৌতুক দাবি করে আসছিল। তার একটি কন্যা সন্তান ও রয়েছে। মেয়ের সুখ শান্তির কথা চিন্তা করে কয়েক দফায় প্রায় ২ লাখ টাকা যৌতুক দেয় রিপার পরিবার। আবারও ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করে রিপার উপর অমানুসিক নির্যাতন করে তার পরিবার। যৌতুকের টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রিপাকে অমানসিক নির্যাতন করে হত্যা করে লাশ ঘরের তীরের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

 

একই ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া গ্রামের হাফিজ উদ্দিন ওরফে হাবির ছেলে সোহাগ মিয়ার (২৫) সঙ্গে ঝুমার বিয়ে হয়। কথা মতো বিয়ের পর যৌতুকের ৫০ হাজার টাকা পরিশোধও করেছিল ঝুমার বাবা। কিন্তু পরবর্তী ধাপে যৌতুকের ৫০ হাজার টাকা যোগাড় করতে দেরি হচ্ছিল ঝুমার পরিবারের। দেরি সইছিল না তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের। এতে তাকে শুনতে হয়েছে অকথ্য গালিগালাজ। অবশেষে মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ঝুমা আক্তার। ঝুমার বড় ভাই মামুন বলেন, এক লাখ টাকা যৌতুক নির্ধারণ করে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। বিয়ের পর ধার দেনা করে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধও করা হয়। পরবর্তীতে ৫০ হাজার টাকার জন্য চাপ দিলে আমরা কিছুদিন সময় চাই। এতে ঝুমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালায়।

 

বরিশাল থেকে খুলনা যাচ্ছিলাম বছর খানেক আগে। গাড়ী ভোর ছয়টায় তাই পাঁচটার দিকে উঠে ঠিক ঠাক হয়ে পাঁটা ত্রিশ মিনিটের সময় বাসা থেকে বের হলাম। গাড়ী ছাড়াতে দশ মিনিট বাকী। মধ্য বয়সী এক মহিলা পাসের ছিটে এসে বসলো, একটু আর চোখে তাকালাম দেখতে পেলাম চেহারায় কান্না কান্না ভাব, আসলেই তো লক্ষ্য করলাম মাঝে মাঝে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাদছে। কথা হয় তার সাথে। খুলনার শহরতলীর (ছদ্ধনাম) জরিনা বেগম তার স্বামী দুইটা সন্তান থাকা সত্বেও বাসা থেকে বের করে দিয়েছে তার প্রানের স্বামী। জরিনার অভিযোগ, সাত বছর আগে ভোলার চরফ্যাশনে মাহিমের সংগে তার বিয়ে হয়ে। বিয়ের পর থেকেই তার কাছে যৌতুরেক টাকা দাবি করে আসছিলো। এ টাকার জন্য তাকে প্রাই মারদর করতো। স্বামীর নির্যাতন সহ্যকরেও সংসার করে যাচ্ছে জরিনা। আসায় আছে এক সময় বুঝতো পারবে যে আমার বাবার টাকা পয়শা নাই, কোথা থেকে দিবে টাকা, হয়তোবা এক সময় নির্যাতন বন্ধ হবে। দুই বছর যেতেনা যেতেই তার কোলে প্রথম সন্তান এলো।

 

 

বুঝলাম আমার আর নির্যাতন সহ্য করতে হবেনা। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো যৌতুকের টাকা ভুলে যাবে। কিন্তু না, তার সন্তানের জন্য নানা কি দিলো সে নিয়ে নির্যাতনের সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। জরিনার বাবা কিভাবে তার নাতীকে টাকা দিবে। কিভাবে তার মেয়ের নির্যাতন সহ্য করবে। খুলনা নিউমার্কের সামনে তার বাাব ভিক্ষা করে যা পায় তা দিয়েই আরো তিনবোন বাবা মাকে নিয়ে পনেরশ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। বাবার পক্ষে এক সাথে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে নির্যাতন সহ্য করার মত খমতা নেই। বলতে বালতে হাউ মাউ করে কেদে ফেললো। তার পরেও বিয়ের সময় আমার মার কানের জিনিসটুকু বিক্রি করে দশ হাজার টাকা দিয়েছিল। স্বামীর মন পাওয়ার জন্য নির্যাতন সহ্য করে একটানা সাত বছর সংসার করতেছি। কিন্তু না, দুটি সন্তান থাকার পরেও কোন নির্যাতন থামছে না। আজ বাবার বাড়ি যাচ্ছি, বাবাকে তো আর টাকার কথা বলা জাবে না। আর বলবোনা যে এই টাকার জন্য আমি চলে আসছি। দু দিন আগে এই টাকার জন্য রাতে অনেক মেরেছে এবং বলছে যদি টাকা না নিয়ে আসো তা হলে তোকে তালাক দিবো, বলতে বলতে কান্না আরো বেড়ে গেলো। বললো একা বাড়ি যাবি কোন পোলা পান নিবি না আর টাকা নিয়া আবি। এখন আমি কোথায় যাবো। কি করবো। আত্মহত্যা করা মহা পাপ তাই বাবার বাড়িই যাচ্ছি, ওখানে কাজ করে বাবা মাকে নিয়ে ভালো থাকতে পারবো । আর ও ওর পোলা পান নিয়ে থাক দেখি কয় দিন থাকতে পারে। এক সময় ও ছেলেপানের জন্য আমাকেই দরকার হবে।

 

 

যৌতুকের উৎপত্তি সম্বন্ধে কোন ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে গবেষনা করে ধারনা করা হয়েছে যে প্রাচিন হিন্দু সমাজ থেকে যৌতুকের উৎপত্তি হয়েছে। গবেষনায় বেড়িয়ে আসছে হিন্দু সমাজে যেহেতু মেয়েরা পিতার সম্পদ থেকে তারা বঞ্চিত হত তাই বাবা-মা মেয়েদের বিয়ার সময় অনেক উপহার সামগ্রী দিয়ে দিতো এটাই পরবর্তীতে সামাজিক রীতিহয়ে দাড়ায়। কালের বিবর্তনে এটাবরপন রূপ ধারণ করে এবং মুসলিম সমাজেও প্রবেশ করে। দেশে যৌতুক নিরোধ আইন রয়েছে। এ আইনগুলো হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার জন্য সমান। যৌতুক দেয়া-নেয়ার দুটোই অপরাধ। ২০০০ খ্রিষ্টব্দে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন করা হয়ে যা ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে সংশোধন করা হয়। এ আইনের ১১ ধারায় রয়েছে যে কোন নারীর স্বামী অথবা শ্বশুর-শ্বাসুড়ী, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর প্েক্ষ অন্য কোন ব্যাক্তি যৌতুকের জন্য নারীর মৃত্যু ঘটায় বা ঘটানোর চেষ্ট করে, অথবা ওই নারীকে আহত করার চেষ্টা করে তা হলে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ী, আত্মীয়, অভিভাবক ব্যাক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। আইনের ১১ (গ) ধারায় যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে মারধরের অপরাধে তিন বছর বা সর্বনি¤œ এক বছরের কারাদন্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।

 

 

যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি এ জন্য পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে। এর থেকে আমাদের সবাইকে বেড়িয়ে আসতে হবে। একটু সচেতন হলেই নারীদের কে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এই যৌতুক বন্ধ করতে হলে সামাজিক আন্দোলন করতে হবে। মানুষকে সচেতনামুলক প্রোগ্রাম করতে হবে। বিভিন্ন এনজিও যৌতুক বিরোধী অভিযান চালাতে পারে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যৌতুক বিরোধী প্রোগ্রাম করতে হবে। তাহলেই মারিয়, তাসলিমা, রিপা ও জরিনাম মত হাজারো গৃহবধু মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।