রস! নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯ | আপডেট: ৬:০২:অপরাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০১৯

 

গোলাম মোস্তফা (জিএম বারী) :

মনিটরের দিকে তাকানো অবস্থায় মার ফোন। মা কেমন আছো। এ্যাদু বাড়ী আবি কবে? মা আমি আগামি শুক্রবার বগুড়া থেকে আসার পর পরের শুক্রবার আসবো কোন চিন্তা করোনা। ঠিক আছে বাবা ভালো থাক। ১০ ফেব্রুয়ারী বগুড়া থেকে আসার সময় পাবনা ইশ্বরদীর মাজ বরাবর বামপাশ দিয়ে বাহিরে তাকাবা মাত্রই চোখে পড়লো খেজুর গাছ বাহ দেখতে কি সুন্দর। একটি বাড়ির চারপাশ ঘেরা সব খেজুর গাছ। আর একটা বাড়ির দিকে তাকালাম সেখানেও দেখতে পেলাম একের পর এক সারিবদ্ধভাবে সাজানো খেজুর গাছ। বাস মিটি পাঁচ আগানের পর দেখলাম আর এক কান্ড, বাম পাশ দিয়ে ছোট একটি রাস্তা দুই থেকে আড়াই কিলো, সারা রাস্তা জুরে খেজুর গাছ এর মধ্যে অন্য কোন গাছ-ই- দেখতে পেলাম না, শুধু গাছ আর গাছ খেজুর গাছ।

মা আমি গাড়িতে আসতে সারে চারটা থেকে পাঁচ টা বাজবে। ঠিক আছে গেদু আয়, আমি তো তালতলি আহমদ এর বাসায় (আহমদ হল আমার ছোট ভাই), আমি এখানে আছি তুই আসলে রসের পিঠা খেয়ে এখানে থেকে সন্ধ্যার পর বাড়ী যাবো। রসের পিঠার কথা শুনে জিবে পানি চলে এলো। সেই রসের পিঠা খেয়েছি আজ থেকে ২৭/২৮ বছর আগে। রস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা খেতাম। আমার বয়স যখন ১০/১২ বছর, দাদু আমাকে কন কনে শীতের মধ্যে ঘুম থেকে উঠিয়ে চাদর মুড়িয়ে খালি পায়ে হাটিয়ে আধাকিলো দুরে রস আনতে নিয়ে জেতো। দাদু ৩০ থেকে ৪০ টি খেজুর গাছ কাটতো। ভোর হতে ৭টা তেকে ৮টা পর্যন্ত রস নামাতো। ১০/১২ কলসি খেজুর রস হতো। মাথায় তুলে দিতো আমার। কষ্ট হলেও দাদুর ভয়ে বাড়িত নিয়ে আসতাম।

তবে মজার ব্যাপার হলো কখন যে শীত শরীর থেকে পালিয়ে যেত তা আর টেরই পেতাম না। মা ওই রস গুলো তালের ডোংগায় ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত জাল দিয়ে মিঠা তৈরী করতো, বাটালিগুর বানাতো। আর রস জোলা গুর বানিয়ে হাড়িতে হাড়িতে ভরে রাখতো। দাদু এসে আবার একটি কাঠের চামুচ দিয়ে এক ধরনের তাউত্তা তৈরী করতো। যা প্রত্যেক দোকানে বিক্রি হত। এটা আমার দাদুর হাতে তৈরী হতো। স্থানিয় পর্যায় এগুলো বিক্রি হতো।

কাঁচা রস খাওয়া, রসের পিঠা, রসের পায়েস খাওয়া এ যেন মধুর এক আয়োজন। গ্রাম-গঞ্জে রসের উৎসব সাধারণ হলেও শহরে এটা এখন বিরল।

মা কেমন আছো? আইছো গেদু? হ্যা হাত মুখ ধো তার পর রসের পিঠা খা। মা রস পেলা কোথায়? আরে গেদু তা এক আরক গল্প। কি মা বল? এক হাড়ি রস তোর ভাই ৩৬০ টাকা দিয়া আনছে। হারা দেশে কোন রস নাই। আগে তো বাড়ীতে গাছ ছিল রসও ছিল । এখন কোন রসের চিহ্নও নাই কোন বাড়ীতে। বরিশাল থেকে দক্ষিণে যত যাব কালের বিবর্তনে খেজুর গাছ আজ হাড়িয়ে গেছে।

আমরা জন্মের পর দেখেছি আমাদের বাপ-দাদাদের রোপণ করা ঐতিহ্যবাহী কিছু গাছের মধ্যে খেজুর গাছ ছিল অন্যতম। আমরা অপেক্ষার থাকতাম শীতকালের জন্য। কারণ শীত এলেই খেজুরের রস ও খেজুরের মিঠার গন্ধে গ্রামীণ প্রত্যেক ঘর মৌ মৌ করত। শীত এলেই গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত খেজুর গাছ পরিষ্কার কারা জন্য।

 

আজ কালের বিবর্তনে অর্থনীতির চাকাকে চাঙ্গা করতে গিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক গাছের মতো খেজুর গাছকেও কেটে ফেলে লাগানো হয়েছে কাঠের গাছ। ছোটকালে রাস্তার পাশে, পুকুরপাড়ে প্রচুর পরিমাণে খেজুর গাছ দেখতাম যা আজকাল আর দেখছিনা দক্ষিনাঞ্চলে। এর প্রধান কারন ইটের ভাটায় ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ ব্যবহার করায় এই গাছ কমে যাচ্ছে। খেজুর গাছ সস্থা হওয়ায় ইটের ভাটায় এই গাছই বেশি পোড়ানো হয়। ফলে এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী শীতের নবান্ন উংসবের খেজুর রসের খির পুলিপিঠা রসের মন্ডামিঠাইসহ নানা মুখরোচক খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।