কোয়েলের ডিম: পুষ্টিগুণ ও কার্যকারিতা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৩৫:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯

আমাদের দেশে ইদানিং খাবার হিসেবে কোয়েল পাখির ডিমের বেশ জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। গড়ে উঠছে অনেক কোয়েল পাখির খামার। তাই এ ডিমের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারের কথা জানতে চান অনেকে।

প্রথমেই মাথায় রাখা দরকার কোয়েলের ডিম খুবই ছোট। একটি কোয়েল পাখির ডিম বড়জোর ৯ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। যেখানে একটি মুরগির ডিম ৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। তাই পরিমাণের দিক দিয়ে ৫টি কোয়েলের ডিম একটি মুরগির ডিমের সমপর্যায়ের হয়ে থাকে। আসুন জেনে নিই একটি কোয়েলের ডিমে কতটা পুষ্টি উপাদান থাকে।

ক্যালরিঃ ১৪

ফ্যাটঃ ১ গ্রাম

ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডঃ ৪ মিলিগ্রাম

ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিডঃ ৮৪ মিলিগ্রাম

প্রোটিনঃ ১.২ গ্রাম

কোলেস্টেরলঃ ৭৬ মিলিগ্রাম

ভিটামিন ও মিনারেল

ভিটামিন এঃ ১%

রিবোফ্লাভিনঃ ৪%

ভিটামিন বি১২ঃ ২%

প্যানথোনিক এসিডঃ ২%

আয়রনঃ ২%

সেলেনিয়ামঃ ৪%
ফসসরাসঃ ২%

একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, কোয়েলের ডিমে তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি আমিষ পাওয়া যায়। একটি কোয়েল পাখির ডিম থেকে প্রাপ্ত ক্যালরির এক-তৃতীয়াংশই আসে আমিষ থেকে! ক্ষুদ্রাকৃতির এ ডিমগুলো ভিটামিন ও খণিজ লবণে পরিপূর্ণও বটে। পরিমাণে কম মনে হলেও সমপরিমাণ মুরগির ডিমের তুলনায় তা অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ৫টি কোয়েলের ডিমে আমাদের দৈনিক চাহিদার ২০ শতাংশ রিবোফ্লাভিন ও ১০ শতাংশ ভিটামিন বি১২ এর চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।

তবে এতসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি আছে দুটি নেতিবাচক দিক, যা আগ্রাহ্য করার উপায় নেই। কোয়েলের ডিমে থাকে বেশ উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল। একটি ছোট কোয়েলের ডিমে থাকে ৭৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কোলেস্টেরল, যা আমাদের দৈনিক চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ! সাধারণ সুস্থ মানুষদের ক্ষেত্রে খুব একটা অসুবিধা সৃষ্টি না করলেও যাদের কোলেস্টেরল লেভেল ইতোমধ্যেই অনেক বেশি, তাদের কোয়েল পাখির ডিম খাওয়ার আগে দু’বার ভাবতে হবে। তবে এ ডিমে প্রয়োজনীয় ওমেগা ফ্যাটি এসিডও বিদ্যমান, যা শরীরের পক্ষে বেশ উপকারী। সর্বোপরি, এই ছোট্ট সুদৃশ্য ডিমে রয়েছে এর আকারের তুলনায় অনেক বেশি পুষ্টি উপাদান, যা একে পুষ্টিবিদ ও পুষ্টির ব্যাপারে আগ্রহী মানুষদের কাছে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে।

কোয়েল পাখির ডিমের স্বাস্থ্য গুনাগুণ:

১। শক্তি বর্ধক

কোয়েলের ডিম আমাদের শরীরের জন্য বেশ ভালো একটি শক্তির উৎস হতে পারে। কোয়েলের ডিম প্রোটিন ও আয়রনে সমৃদ্ধ, যা শরীরের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সব ধরণের প্রোটিনই বহু অ্যামিনো এসিড অণুর দ্বারা তৈরি চেইন দিয়ে গঠিত হয়। কোয়েলের ডিমের অ্যামিনো এসিড প্রোফাইল তৈরি করে দেখা যায়, এতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অ্যামিনো এসিড বিদ্যমান। শরীরের ব্লাড শুগার নিয়ন্ত্রণে এদের মধ্যে কয়েকটি অ্যামিনো এসিড বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অন্য কয়েকটি অ্যামিনো এসিড রয়েছে যারা টিস্যুর ক্ষয়রোধ ও নতুন টিস্যু গঠন করে। এছাড়াও কোয়েল পাখির ডিমে পাওয়া যায় লাইসিন নামক অ্যামিনো এসিড, যা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরিতে এবং হরমোন, কোলাজেন ও এনজাইম উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। নতুন রক্ত তৈরিতে আয়রনের ভূমিকা বেশ তাৎপর্যবহ। শরীরে আয়রনের অভাব হলে অ্যানেমিয়া বা রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়, যার ফলে ঘন ঘন ক্লান্তি ও শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা দেখা যায়।

২। ক্যান্সার প্রতিরোধে

কোয়েলের ডিমে প্রাপ্ত খণিজ উপাদানগুলোর একটি হলো সেলেনিয়াম। এই খণিজ দ্রব্যটি প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। সেলেনিয়ামে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহকোষকে ক্ষয় হয়ে যাওয়া ও জারণ থেকে রক্ষা করে। এইচ আই ভি ও ক্রন’স ডিজিজ আক্রান্ত মানুষের দেহে সেলেনিয়ামের অভাব লক্ষ্য করা যায়। স্বাভাবিক মানুষের শরীরে সেলেনিয়ামের তেমন ঘাটতি পরিলক্ষিত না হলেও প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সেলেনিয়ামযুক্ত খাদ্য রাখাটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। সেক্ষেত্রে কোয়েলের ডিম অনেক সহায়তা করতে পারে।

৩। যকৃত, ত্বক, চুল ও চোখের সুরক্ষায়

রিবোফ্লাভিন, যা মূলত ভিটামিন বি ২ নামে পরিচিত, দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তিক প্রক্রিয়ার জন্য খুবই দরকারী। সাধারণত ভিটামিন বি ২ সহ অন্যান্য বি শ্রেণীর ভিটামিন আমাদের লিভার, ত্বক, চুল ও চোখের সুস্থতা নিশ্চিত করে। শরীরে লোহিত রক্ত কণিলা উৎপাদনেও রিবোফ্লাভিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোয়েলের ডিমে আকারের অনুপাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে রিবোফ্লাভিন, একের অধিক কোয়েলের ডিম নিয়মিত খেলে তা আমাদের লিভার, ত্বক, চুল, চোখের সুস্থতার জন্য যথেষ্ট!

৪। মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিতে

আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন বি১২, থাইমিন (ভিটামিন বি১) ও ভিটামিন বি২ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় পরিমাণে ভিটামিন বি১২ আমাদের স্মৃতিশক্তির ক্ষয় রোধ করতে সহায়ক। কোয়েলের ডিম ভিটামিন বি১২ এবং রিবোফ্লাভিন (ভিটামিন বি১২) এর একটি ভালো উৎস। কিছু পরিমাণ থাইমিনও (ভিটামিন বি১) এতে বিদ্যমান।

যেকোনো ডিমই নিঃসন্দেহে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় রাখার মতো একটি খাবার। কোয়েলের ডিমও তাই। একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হতে পারে ডিম। তবে মাথায় রাখতে হবে ডিমে আছে বেশ ভালো পরিমাণে ফ্যাট ও কোলেস্টেরল, যা অন্যান্য ফ্যাক্টরের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন হৃদরোগের সৃষ্টি করতে পারে। তাই আপনার যদি ডায়বেটিস থেকে থাকে কিংবা কোলেস্টেরল লেভেল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেয়ে থাকেন, ডিম খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হওয়া তখন একান্ত কর্তব্য।