লেবু চাষে হাজার মানুষের ভাগ্য বদল

প্রকাশিত: ১০:১৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০১৮ | আপডেট: ১০:১৪:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০১৮

নিউজ ডেস্ক : শেরপুর সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা বৃহত্তম চরাঞ্চল যেখানে প্রতিবছর বন্যায় ক্ষতবিক্ষত করে মানুষের ঘরবাড়ী, ফসল। বন্যা ও মাটি অনুর্বর বলে এখানের অর্থনীতি খুব দুর্বল। নানা ঝুঁকি থাকলেও শীতকালীন শাকসবজিই ওদের প্রধান জীবিকা। সেই চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ লেবুর চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে।

এসব এলাকার এত পরিমাণ লেবুর চাষ হয়েছে দিগন্ত জুড়ে শুধু লেবুর বাগান আর বাগান। চারাঞ্চল জুড়ে এখন লেবুর মুহুর্মুহু গন্ধে মোহিত। শেরপুর-জামালপুর হাইওয়ে থেকে নেমে গ্রামের মেঠো পথ ধরে ডানে বামে যেদিকেই তাকানো যায় শুধু লেবুর বাগান। সদর উপজেলার বলায়ের চরের ধোপার চর, চরশ্রীপুর, রামের চরসাহাব্দি, জঙ্গলদি, ঘুঘরাকান্দি চরপক্ষিমারির সাতপাকিয়া, কুলুরচর, চরশেরপুর, রৌহা ও কামারিয়ার অন্তত ২০ গ্রামের কয়েকশ’ একর জমিতে করা হয়েছে লেবুর চাষ।

এই লেবুকে কেউ জাফরি কেউ বিচি ছাড়া (সিড লেছ) সুগন্ধি লেবু বলেই জানে। প্রান্তিক চাষিরা প্রায় প্রতিদিন গাছ থেকে লেবু তুলে বিক্রি করে। তবে বড় চাষিরা ১৫ দিন অন্তর লেবু তুলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করে। এখন প্রতিহাজার লেবুর দাম ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। লেবু চাষিদের মাধ্যমে জানা গেছে, ১০/১২ বছর আগে ২/৩টি বাগানের মাধ্যমে এই চাষের সূচনা হয়। টাঙ্গাইলের জনৈক জাফর (জাফরের নাম অনুসারে জাফরি লেবু ) নামে এক লোকের কাছ থেকে শেরপুরে স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত চরাঞ্চলের বাসিন্দা মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে এর সূচনা হয়। জানা গেছে, এক একর জমিতে লেবু চাষ করতে আড়াই বছর পর্যন্ত সব খরচসহ মোটামুটি (জমি ভাড়াসহ) দেড় থেকে ২ লাখ টাকা লাগে। প্রতিবছর পরিচর্যাসহ আরও খরচ পড়ে ৫০ হাজার। আর পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু হয় আড়াই বছর পরেই।

বছরে ওই এক একর জমি থেকে কমপক্ষে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার লেবু আসে। আড়াই বছর পর থেকে ১২ বছরে ওই একর একর জমিতে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ লাখ আর আয় আসে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা। গ্রামগুলোতে ঢুকলে বাতাসে লেবুর গন্ধ বিমোহিত করে আগন্তুকদের। এ যেন সবুজ গাছের কাঁচাপাকা লেবুর এক অভয়ারণ্য।

লেবু চাষকে কেন্দ্র করে এখানের মানুষজনের অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছে তেমনি এক সময়ের অভাবি চরবাসীর ছেলেমেয়েরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। বলায়ের চর গ্রামের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী সজিব রানা জানান, পড়ার ফাঁকে নিজের লেবুর বাগানে কাজ করি। গ্রামে লেবুর বাগানকে কেন্দ্র করে কেউ আর অতি গরিব বা না খেয়ে থাকে না। যাদের বাগান করার জমি নেই তারা অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে আয় করছে। আর মোটামুটি এক একরের একটি বাগান কোনো রকম ২ বছর ধরে রাখতে পারলেই পরবর্তী ১০ বছর খুব সামান্য খরচ করেই প্রতিদিন কিছু না কিছু আয় আসছে।

লেবু উৎপাদনকে ঘিরে এখানে শ্রমের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে শত শত নারী শ্রমিক বাড়ির কাছে কাজ পেয়ে পরিবারের দুঃখ দুর্দশা দূর করতে পেরেছে। ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য মানুষের আসা-যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে বিশাল লেবুর বাজার। কৃষকরা জানিয়েছে, চরাঞ্চলের বালু মাটি লেবু চাষের জন্য উপযুক্ত এ কৃষিতে মূলধন ও শ্রম দিতে হয় কম। ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অবস্থান বলে বন্যা ওদের চির সাথী। গাছের নিচে ১০/১২ দিন পানি থাকলেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। আর এ লেবু চাষ সাধারণত জৈব সার দিয়েই হয়ে থাকে রাসায়নিক সারের তেমন প্রয়োজন হয় না, পরিশ্রমও কম। তাই এই লেবু চাষে সবার ঝোঁক। এই এলাকার সবচেয়ে বড় লেবু চাষি মনিরুজ্জামান (৪০ একর) জানান, চরাঞ্চলের মানুষের কম ঝুঁকিতে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসলের দরকার ছিল।

এখন এখানে কেউ আর বেকার নেই। ৩০ একর লেবু বাগানের মালিক নূর হোসেন জানান, এখানে লেবুর বিপ্লব হয়েছে- লেবু চরাঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। লেবুই এখন মানুষের ভরসা। চাষিদের দাবি— যতই চাষ বাড়ছে ততই লেবুর দাম কমছে। লেবু সংশ্লিষ্ট শিল্প যেমন সাইট্রিক অ্যাসিড, লেবুর তেল, লেবুর জুস, লেমন গ্রাস (সাবানের কাঁচামাল), স্কোয়াস জেলি উৎপাদন করে বাজারজাতকরণ করতে পারলে আগামী দিনে লেবুর উৎপাদন ও কৃষকের লাভ হবে। এ বিষয়ে সরকার বা এনজিওদের হাত বাড়াতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপরিচালক ড. আশরাফ উদ্দিন জানান, লেবু চাষে এ অঞ্চলের জমি খুবই উপযোগী। চরাঞ্চলে লেবু বিচিবিহীন রসালো, স্বাধ, গন্ধ ও ভিটামিনে ভরপুর।