আওয়ামী লীগ-বিএনপির সামনে বাধা মঞ্জু

নি র্বা চ নী হা ল চা ল, পিরোজপুর- ২

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:০৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০১৭ | আপডেট: ৪:০৯:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০১৭
আওয়ামী লীগ-বিএনপির সামনে বাধা মঞ্জু

পিরোজপুর-২ আসন। ভাণ্ডারিয়া, কাউখালী ও ইন্দুরকানী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি। বহুল পরিচিত এ আসনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন ও পরিবেশমন্ত্রী জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নাম। আর তার কারণেই
আসনটি পরিচিত দেশজুড়ে। এ আসনের উন্নয়নের রূপকার তিনি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নির্বাচনে দাঁড়ালেই পাস।
ব্যবহার, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে দাঁড় করিয়েছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ২০১৩ সালে আসন পুনর্নির্ধারণের আগে এ আসনটি ছিল ভাণ্ডারিয়া, কাউখালী ও নেছারাবাদ উপজেলা নিয়ে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ১০ হাজার ৯৯৭। এর মধ্যে ভাণ্ডারিয়ায় এক লাখ তিন হাজার ৬৪৮, ইন্দুরকানীতে ৫৪ হাজার ২৪৬ ও কাউখালীতে ৫৩ হাজার ১০৩ জন ভোটার। দেশের অন্য আসনগুলো থেকে এ আসনের নির্বাচনী হাওয়া একটু ভিন্ন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালের নির্বাচনে পিরোজপুর-২ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালে ১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলে প্রবাসে থাকায় তিনি নির্বাচন করতে পারেননি। এ নির্বাচনে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী নেছারাবাদ উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ মো. শাহ আলম নির্বাচিত হন। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী ইসাহাক আলী খান পান্না তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গত ৩০ বছর ধরে এলাকার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি তার আসনকে উন্নয়নের মাধ্যমে পাল্টে দিয়েছেন। আর তাই এ আসনে তার বিজয় নিয়ে কারও মনে সন্দেহ নেই। তিনি সুখে-দুঃখে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ান বলে ভোটাররা তার প্রতি দুর্বল। সৃষ্টি হয়েছে তার বড় ভোট ব্যাংক। তার দুর্গে ফাটল ধরানোর মতো অন্য দলের শক্ত কোনো প্রার্থী নেই। তবে জেপির দুর্গে হানা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। গ্রুপিং ভুলে ঘর গোছাতে তৎপর তারা।

এদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট এমএ হাকিম হাওলাদার। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ আওয়ামী সমবায় লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ভাণ্ডারিয়া পৌর শহরের বাসিন্দা মো. আমিনুর রশিদ ছগির জোমাদ্দার আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে পরিচিত। তার চাচাতো ভাই ফায়জুর রশিদ খসরু ভাণ্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তার নানা আবদুল মজিদ হাওলাদার মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। প্রার্থী হওয়া নিয়ে তার সমর্থকরা যথেষ্ট আশাবাদী।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কাউখালী উপজেলার বাসিন্দা ইসাহাক আলী খান পান্না এ আসনে সক্রিয়। পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মিরাজুল ইসলামও মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা যায়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি পিরোজপুর জেলার প্রধান সংগঠক ও বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভাণ্ডারিয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খান মো. রুস্তুম আলী ১৯৯৬ সালে বামফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে হাতুড়ি মার্কা নিয়ে পিরোজপুর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মহাজোটের অন্যতম শরিক দল হিসেবে এবারও তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, নির্বাচনী এলাকা পিরোজপুর-২ এর সঙ্গে ইন্দুরকানী উপজেলা যুক্ত হওয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র বর্তমান ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী অথবা তার ভাই শামীম সাঈদীর প্রার্থী হবার কথা শোনা যাচ্ছে। এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ছবি সংবলিত পোস্টারও দেখা গেছে এলাকার বিভিন্ন স্থানে। এ আসনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তাদের অবস্থান অনেকটা শক্ত। কিন্তু কিভাবে তারা এ ভোটযুদ্ধে আসবেন তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে তাদের সমর্থকদের দাবি ২০ দলীয় জোটে হোক বা স্বতন্ত্র হোক তারা ভোটযুদ্ধে নামবেন।
তবে ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির নেতারাও পিছিয়ে নেই প্রচার-প্রচারণায়। এদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটির পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সহ-সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল কবির লাবু। তিনি প্রায় ৩০ বছর চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত থেকে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সহ-সভাপতি এবং ছাত্রদলের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি ভাণ্ডারিয়া উপজেলার দক্ষিণ শিয়ালকাঠি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী তালুকদার বাড়ির মরহুম আশ্রাব আলী তালুকদারের ছেলে। পারিবারিক ভাবে তারা যুগ যুগ ধরে জনপ্রতিনিধিত্ব করে আসছেন এ অঞ্চলে। তার বড় ভাই শফিকুল কবির বাবুল নদমুলা-শিয়ালকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান। ছোট ভাই জেপি নেতা ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার এ.কে.এম রেজাউল করিম দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়াও অন্য দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও তার সম্পর্ক বেশ ভালো। জেলা বিএনপিতেও তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। দলের মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। এদিকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মঞ্জুর পুত্র ভাণ্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন চাইবেন। এর আগে মঞ্জুর সুমনের বাবা নূরুল ইসলাম মঞ্জুর পরপর তিনবার চারদলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মূলত বাবার উত্তরসূরি হিসেবে এ আসনে তিনি মনোনয়ন চাইবেন।

পিরোজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা গাজী নূরুজ্জামান বাবুলও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন। তিনি দলীয় এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রায়ই এলাকায় যান এবং সাধারণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি ১৯৭৩ সালে ভাসানী ন্যাপের মনোনয়ন নিয়ে ভাণ্ডারিয়া-কাঠালিয়া থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। প্রবীণ এ নেতা ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করেছেন এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এ আসনে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এছাড়া জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান জোটের কাছে পিরোজপুর-২ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তার গ্রামের বাড়ি ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ভিটাবাড়িয়া গ্রামে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাকে কারাবাসও করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে এ আসনে নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলই চাইছে এ আসনে জয় পেতে। কিন্তু তাদের সামনে বড় বাধা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।