আমরা উচ্চতর ডিগ্রিধারী সুশিক্ষিত নই

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:১০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০১৮ | আপডেট: ১১:১০:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০১৮

বৃদ্ধ হওয়াটাই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ। ঘর-সংসার, ছেলেমেয়ে সব থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় পড়ে আছে। সারাদিন জোটেনি কোনো খাবার। নেই কোনো আশ্রয়। জীবনের এই শেষ সময়ে কেউ ঘরে রাখতে চায় না। কাতর কণ্ঠে ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে এ উক্তি নাটোর জেলার সিংগা পৌরসভার রাস্তায় পড়ে থাকা একজন মন্তাজ আলীর। যার রয়েছে হোটেল ব্যবসাসহ ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে। অপরদিকে তিন ছেলে পুলিশ অফিসার, ১ মেয়ে স্কুল শিক্ষিকাসহ ৬ সন্তানের সবাই প্রতিষ্ঠিত। অথচ এসব সন্তানদের বৃদ্ধা মাকে জীবন বাঁচাতে হাতে নিতে হয়েছে ভিক্ষার থলি। হাঁটতে গিয়ে পা পিছলে কোমর ভেঙে যাওয়ায় এখন তিনি বেঁচে আছেন অন্যের করুণায়। ঘটনা দুটি একজন মন্তাজ আলী কিংবা এক বৃদ্ধা মায়েরই নয়। এ ধরনের করুণ ও নির্মম বাস্তবতার ঘটনা ঘটছে অনেক বয়স্ক বাবা-মায়ের ভাগ্যে। নিজের হাতে গড়া ঘর-সংসার, সম্পদ ফেলে অনেকের ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। জীবনের শেষ বয়সে অচলাবস্থার কারণে কেউ তাদের দায়িত্ব নিতে চায় না। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বয়স্ক বাবা-মাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া কিংবা সন্তানদের অবহেলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি এসব বাবা-মায়ের সন্তানরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সুশিক্ষিত নয়। নৈতিকতার শিক্ষার পাশাপাশি রয়েছে ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। এ থেকে উত্তরণে মানবিকতাকে জাগ্রত করতে হবে। পারিবারিক বন্ধনকে টিকিয়ে রাখতে একান্নবতী পরিবারের দিকে নজর দিতে হবে।

কেস স্ট্যাডি-১
মাদারীপুর পৌর শহরের শকুনী লেকপাড়ের রাস্তা। দুই কলেজ শিক্ষার্থী রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল তাদের গন্তব্যে। হঠাৎ তাদের কানে ভেসে আসে গোঙ্গানির শব্দ। তারা থমকে দাঁড়ায়। উঁকি মারে চারপাশে। হঠাৎ চোখ যায় পাশের ঝোপঝাড়ে। আর তখনই তারা আঁতকে ওঠে। শীর্ণ রক্তাক্ত মানবদেহ। অন্তত ৮০ বছরের এ বৃদ্ধার শরীরের ওপরে অসংখ্য পোকামাকড় আর পিঁপড়ে। কোনো নাশকতার হামলায় আহত ভেবে সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী বিলাস হালদার ও মেহেদী ইসলাম উদ্ধার করেন তাকে। দ্রুত নিয়ে যান মাদারীপুর সদর হাসপাতালে। অস্পষ্ট স্বরে তিনি নিজের নাম জোবেদা খাতুন বলে জানান। গত ৩১ অক্টোবর গভীর রাতে নিজের সন্তান ও বউ মিলে তাকে ঘটনাস্থলে ফেলে যায় বলে উল্লেখ করেন। গত ১২ নভেম্বর রাতে সন্তানদের স্বস্তি দিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

কেস স্ট্যাডি-২
পাঁচ সন্তানের জননী নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুচিয়াবাড়ি গ্রামের ফুজলি বেগম (৮৬)। ত্রিশ বছেরেরও বেশি সময় আগে বিধবা হয়েছেন তিনি। স্বামী ছামাদ শেখের মৃত্যুর পর তিনিই সন্তানদের মানুষ করেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাত। নিজের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ফুজলীকে টেনে তোলা হয় একটি ভ্যানে। এরপর রাতের অন্ধকারেই তাকে ফেলে দেয়া হয় পাশের রাস্তার জঙ্গলে। কোনো শত্রুপক্ষ কিংবা দুর্বৃত্ত চক্র নয়। এ ঘটনা ঘটিয়েছে নিজের সন্তানরা। পরদিন সকালে পথচারীরা উদ্ধার করেন তাকে। পরিচয় জেনে স্থানীয়রা তাকে দিয়ে আসেন বড় ছেলে ডাকু শেখের বাড়িতে।
বার্ধক্যজনিত কারণে কাজ করতে না পারা এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় এ বৃদ্ধার দায়িত্ব নিতে চান না কোনো ছেলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ প্রশাসন ওই বৃদ্ধাকে পরে হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ ঘটনায় বৃদ্ধার বড় ছেলে ও এক মেয়েকে আটক করেছে পুলিশ।

কেস স্ট্যাডি-৩
রাজধানীর মিরপুরের ৬০ ফিট সড়কের পাশে ৭ ঘণ্টা পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুন। প্রায় ৯০ বছরের এ বৃদ্ধার ঠাঁই এখন মিরপুরের পাইকপাড়ার ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ নামের একটি বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমে। ৯০ বছরের ওই মহিলাকে বৃদ্ধাশ্রমে এনেছিলেন আগারগাঁও প্রবীণহিতৈষী কেন্দ্রের চিকিৎসক মহসিন কবির। তিনি জানিয়েছেন, ৩০ অক্টোবর সকালে ৬০ ফিট সড়কের আমতলী এলাকায় পড়ে ছিলেন রাবেয়া খাতুন। দুপুরের দিকে সেখান থেকে রাবেয়া খাতুনকে প্রবীণহিতৈষী কেন্দ্রে নিয়ে আসেন দুজন নারী। পরিচয়হীন কাউকে সেখানে রাখা হয় না। তখন রাবেয়া খাতুনকে শেরেবাংলা নগর থানায় নেয়া হয়। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হয় চাইল্ড অ্যান্ড এইজ কেয়ারে।রাবেয়া খাতুনের বিষয়ে ফেসবুকে ভিডিও দেয়ার পর তামান্না নামের এক নারী রাবেয়া খাতুনের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ফোন করেন। বৃদ্ধা ওল্ড হোমে কীভাবে এলেন, তা জানতে চান। উত্তরে বলা হয় যিনি হাঁটতে পারেন না, তিনি রাস্তায় পড়ে থাকলেন কীভাবে? এরপর থেকে কেউ খোঁজ নেননি। রাবেয়া খাতুন জানিয়েছেন, তার স্বামীর নাম তালেব আলী। মিরপুরের লালমাটিয়ার ২২ তলা গার্মেন্ট এলাকায় তার বাসা। সেখান থেকে তার সতিনের ছেলেরা রাস্তায় ফেলে রেখে যান। তিনি সচ্ছল পরিবারের মানুষ। ওই নারীর নামে ব্যাংকে ৪০ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত করা আছে এবং তাদের বেশ সম্পদ ও সম্পত্তিও আছে।

কেস স্ট্যাডি-৪
গত ১২ এপ্রিল। নারায়ণগঞ্জ বন্দরে ৬০ বছরের বৃদ্ধা নূরী বেগমকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায় নিজের মেয়ের জামাতা। অচেতন অবস্থায় কুড়িয়ে পাওয়া নূরী বেগমকে মানবিক বিবেচনায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয় জোসনা বেগম নামে এক নারী। তিনি জানিয়েছেন, বৃদ্ধা নূরী বেগম ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানাধীন মুরাইশাহ গ্রামের বাসিন্দা। একই গ্রামের হান্নান মাতবরের স্ত্রী। তার মেয়ের নাম নীলা বেগম। তাকে তার মেয়ের জামাতা বন্দরে এনেছিল। তার জামাতা একজন অর্থপিপাসু ব্যক্তি। প্রাণে মেরে ফেলার জন্য একাধিকবার মারধর করেছিল ওই বৃদ্ধাকে। অবশেষে তাকে অচেতন করে বন্দরে ফেলে রেখে চলে যায়। এর আগেও নারায়ণগঞ্জ জেলায় বৃদ্ধা মাকে নিজের সন্তান বস্তাবন্দি করে ময়লার স্তূপে ফেলে গিয়েছিল। গত বছরও চাষাড়া শহীদ মিনারে বৃদ্ধ বাবাকে ফেলে যায় তার সন্তান। বৃদ্ধ মা-বাবার ওপর সন্তানের এ ধরনের অবহেলা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী বলেন, দেশে অনেক ধরনের আইন হয়, কিভাবে বাবা-মায়ের সম্পদ ভোগ করবে তার সুন্দর আইন আছে। কিন্তু বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার শক্ত আইন নেই। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের কাছে পিতামাতা বড় বোঝা হয়ে যায়। অবহেলা-অবজ্ঞা করে বৃদ্ধ বাবাকে অনাথ আশ্রমে নিয়ে সেখানে রেখে আসে সন্তানরা। এটা অমানবিক। এখন পারিবারিক বন্ধন কমে গেছে। একক পরিবার এ জন্য অনেকটাই দায়ী। সন্তান ডিগ্রিধারী হচ্ছে কিন্তু সুশিক্ষিত নয়। তিনি বলেন, রক্ত সম্পর্ক কিংবা বন্ধন যদিও আইনের মাধ্যমে অটুট রাখা যায় না। প্রতিবেশী দেশেও সন্তানের বেতনের একটি অংশ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য দেয়ার আইন পাস করা হয়েছে। এ ধরনের আইনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও কাজে আসবে। বৃদ্ধদের বাসায় রাখা অসন্তোষের ব্যাপার হয়ে গেছে। এ জন্য দিন দিন বেড়েই চলেছে বৃদ্ধাশ্রম।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রবীণহিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব ড. এএসএম আতিকুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, প্রবীণদের সমস্যা অতীতেও ছিলো, এখনো চলমান। মানুষ সভ্য না হলে ভবিষ্যতেও থাকবে। আগে বিষয়টি মিডিয়ায় না আসায় জানা যায়নি। এখনো প্রত্যেক বাড়িতে এ সমস্যা দৃশ্যমান। আমরা বার্ধক্য নিয়ে একেবারেই উদাসীন। প্রবীণসংক্রান্ত সমস্যা দরিদ্র শ্রেণির চেয়ে ধনীদের বেলায় বেশি। কারণ গরিব বেশি দিন বাঁচে না। ধনী শ্রেণি শত বছর অর্থাৎ বেশিদিন বাঁচেন। বাংলাদেশে বর্তমানে দেড় কোটি প্রবীণ আছে। বিপরীতে মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার প্রবীণের জন্য আশ্রম রয়েছে। সন্তান ও পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রবীণদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। যদিও বর্তমান সরকার প্রবীণ সম্পর্কে বেশ আন্তরিক। প্রবীণদের জন্য ২৪শ কোটি টাকা খরচ করেছে বয়স্ক ভাতার মাধ্যমে। কিন্তু বাবা-মাকে দেখভালের জন্য আগে তো সন্তানকেই আসতে হবে। পরিবার থেকে আমরা এ ধরনের শিক্ষা পাই না কিভাবে প্রবীণদের সেবা-যত্ন করতে হবে। বার্ধক্য নিয়ে আমাদের এখন ভাবনার সময় এসেছে। অন্যান্য বীমার আদলে জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘প্রবীণ বীমা’ স্কিম চালু করা উচিত। স্বদেশ মানবকল্যাণ সোসাইটির আব্দুস সালাম তালুকদার বলেন, দিনে দিনে আমাদের মানবিকতায় অবক্ষয় নেমেছে। সব কিছুতেই যেন বাণিজ্যিক চিন্তা-ভাবনা। ঘর সামলানো ও শিশু সন্তানদের দেখভালের জন্য মাকে বিদেশেও নিয়ে যায় সন্তান। কিন্তু তার শান্তির জন্য নয়। বাজার করা ও সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেয়ার জন্য বাবাকে ঘরে আশ্রয় দেন সন্তান। ধরনটা এমন যেন বুড়ো বয়সে বাবা-মা হয়ে ওঠেন বাসার কাজের লোক। আসলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী কেএম রেজাউল ফিরোজ রিন্টু আমার সংবাদকে বলেন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-তে উল্লেখ রয়েছে পিতামাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানের ওপর বর্তায়। ২০১৩ সালে পিতামাতার ভরণপোষণ নামে একটি আইন পাস হয়। এখানেও একই কথা উল্লেখ রয়েছে। বঞ্চিত পিতা-মাতা আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে প্রতিকারের জন্য আইনে সুযোগ আছে। কিন্তু কোনো বাবা-মা সাধারণত সন্তানের বিরুদ্ধে এ ধরনের মোকদ্দমার আশ্রয় নেন না। রিন্টু আরও বলেন, এ ধরনের মামলা দৃশ্যমান না হলেও বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তান কর্তৃক নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা রোধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।
-আমার সংবাদ