ইতিহাসের বদল না পুনরাবৃত্তি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:০২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১, ২০১৮ | আপডেট: ৭:০২:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১, ২০১৮

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বহুল আলোচিত সংলাপের সূচনা হচ্ছে আজ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে প্রধান বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই সংলাপে দৃষ্টি পুরো জাতির। সাত দফা দাবি নিয়ে সংলাপের টেবিলে বসছে ঐক্যফ্রন্ট। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনেকটা অঘোষিত শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ‘সংবিধান সম্মত’ শব্দ দিয়ে সংলাপের চিঠিতে ঐক্যফ্রন্টকে যে বার্তা দেয়া হয়েছে তার পাল্টা বার্তা নিয়েই ফ্রন্টের নেতারা সংলাপে বসছেন বলে সূত্রের দাবি। তবে সংলাপ আহ্বান ও সম্মতির পর রাজনীতির মাঠে কিছু আলামত বিরোধী জোটের নেতাদের মাঝে সংলাপের ফল নিয়ে সংশয় তৈরি করছে। আলামত যাই হোক বহু প্রত্যাশিত সংলাপের টেবিল থেকে ভালো কিছু নিয়ে ফেরার আশায় আজ সরকার প্রধানের সরকারি বাসভবন গণভবনে যাবেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। সংলাপে আলোচনার সঙ্গে নৈশভোজের আয়োজন থাকবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে নৈশভোজে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা অংশ নেবেন না বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। অনেকটা আচমকা ঐক্যফন্টের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংলাপের ঘোষণা পুরো দেশের রাজনীতিতে একটা স্বস্তির আবহ নিয়ে এসেছে। পরে সংলাপের জন্য সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে সাড়া পেয়েছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সামনে সময় কম। তবে অন্যান্য দলের সঙ্গেও সংলাপে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রী।

ফল নিয়ে সংশয় থাকলেও পুরো জাতি অধীর আগ্রহে তাকিয়ে সংলাপের দিকে। ২০১৪ সালের আলোচিত নির্বাচনের আগে থেকেই সংলাপ দাবি করে আসছিল বিএনপি। এ দাবির মধ্যেই দেশে- বিদেশে আলোচনার জন্ম দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের পর আলোচনার আহ্বান জোরালো থাকলেও সময়ের স্রোতে তা গতি হারায়। ওই নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসাতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগও ভেঙ্তে যায়। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে প্রায় একদশক পার হওয়ায় রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নতুন ধাঁচের রাজনৈতিক কৌশল আর নির্বাচন মানুষের মধ্যে নানা ভয় আর শঙ্কা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষের দৃশ্যত মধ্যস্থতা ছাড়া প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের সংলাপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে কোনো চাপে পড়ে এই সংলাপে যাচ্ছেন না তারা। চাপ থাকলে নিজেরাই সংলাপের উদ্যোগ নিতেন। বিরোধী জোটের সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজকের সংলাপ হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন অন্তত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের চাপ থেকে হলেও আওয়ামী লীগ এই সংলাপকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। দেশে-বিদেশে এমন একটি নির্বাচন আয়োজনের চাপ ছিল দীর্ঘদিন থেকে। আগে বিএনপি’র সংলাপের আহ্বানে সাড়া না দেয়ার পেছনে আওয়ামী লীগ দাবি করে আসছিল অতীতে আহ্বান জানানো হলেও বিএনপি এতে সাড়া দেয়নি। এমনকি খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু সংবাদ শুনে প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানাতে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে। ক্ষমতাসীন দলের এমন অভিযোগ আর যুক্তির ধার হয়তো কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে নবগঠিত ঐক্যফ্রন্ট। এ ফ্রন্টে একক নেতৃত্বে নেই কোনো দল। আওয়ামী লীগ সংলাপে বসছে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে। আর এর অংশ হিসেবে বিএনপি নেতারা গণভবনে যাচ্ছেন। সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গণফোরাম সভাপতি ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। তাই অতীতে সংলাপ নাকচ করে এলেও আচমকা সংলাপে বসাতে তেমন একটি অস্বস্তি নেই ক্ষমতাসীন দলে। বরং আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় এই সংলাপকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ।

আজ সন্ধ্যা সাতটায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সংলাপে বসবেন। ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নাম আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের ২৩ জন নেতা অংশ নিচ্ছেন সংলাপে।

গত রোববার আওয়ামী লীগের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তার চিঠির জবাবে পরের দিন সংলাপে সাড়া দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরের দিন সাত সকালেই ড. কামাল হোসেনের বেইলী রোডের বাসায় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণপত্র নিয়ে হাজির হন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। সংলাপে করণীয় ঠিক করতে এদিনই বিকালে বৈঠকে বসেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। বৈঠকে ৭ দফার ভিত্তিতে আলোচনার লক্ষ্য ঠিক করার পাশপাশি ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নাম চূড়ান্ত করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংলাপে থাকবেন ১৪ দলের ২৩ নেতা: জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসবেন ১৪ দলীয় জোটের ২৩ নেতা। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফরউল্লাহ, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, মাঈনুদ্দিন খান বাদল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের  ড. আবদুর রাজ্জাক, রমেশ চন্দ্র সেন, আবদুল মতিন খসরু, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোটেক শ ম রেজাউল করিম অংশ নেবেন। বুধবার আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাদের বৈঠক হবে।

ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দলে থাকবেন ১৬ জন: ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দলের হয়ে ১৬ জন গণভবনে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে আছেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, সহ-সভাপতি তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, এসএম আকরাম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাকসু’র সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আ ব ম মোস্তফা আমিন।

সংলাপের অতীত অভিজ্ঞতা: ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষদিকে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসে বিএনপি। সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার ঢাকা সফর করেন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে তারানকোর সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের প্রথম  বৈঠকটি হয় ১০ ও ১১ই ডিসেম্বর। তৃতীয় বৈঠক হয় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের উপস্থিতিতে। নির্বাচনের আগে এই সংলাপ আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফল ছাড়াই তা ভেস্তে যায়।

এর আগে ২০০৬ সালের অক্টোবরে হয়েছিল আলোচিত সংলাপ। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি’র মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সংলাপে বসেন।  সে সময় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সংলাপ হয়েছিল নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপি’র কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯ দফা তুলে ধরা হয়। কিন্তু এত লম্বা সময় ধরে ছয় দফা বৈঠক করেও মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা হয়নি। অবশেষে দু’জনই তাদের দলের শীর্ষনেত্রীর কাঁধে সিদ্ধান্তের ভার দিয়ে সংলাপের হাল ছেড়ে দেন। ওই সংলাপেও দৃশ্যত কোনো ফল আসেনি। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি সংলাপে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন। ওই সংলাপের কোনো দৃশ্যমান ফল দেখা যায়নি রাজনীতির মাঠে। ১৯৯৪ সালে মাগুরার উপ-নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে আন্দোলন শুরু করে। ওই সময় সরকারি দল বিএনপি’র সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিরসনের চেষ্টায় বাংলাদেশে আসেন তৎকালীন কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সামনে এলে কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই তিনি ফিরে যান। ওই সময় খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তৎকালীন বিরোধী দলের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। কিন্তু ওই সময়ও সংলাপ আয়োজন সফল হয়নি। ১৯৮৪ সালে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে আহ্বান জানিয়েছিলেন এইচএম এরশাদ। বঙ্গভবনে হওয়া ওই সংলাপে বেগম খালেদা জিয়ার সাত দলের পক্ষ থেকে ৩৩ দফা দাবিনামা দেয়া হয়েছিল। ওই সংলাপের পরপরই বঙ্গভবনে জামায়াতের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এরশাদ।  আবার সংলাপে বসেন শেখ হাসিনার ১৫ দলের  নেতাদের সঙ্গেও। ওই সংলাপ থেকেও কাঙ্ক্ষিত কোনো ফল বের হয়নি।