সিলিন্ডারের পরীক্ষা নেই, বাড়ছে বিস্ফোরণ

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০১৮ | আপডেট: ৮:৫৫:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০১৮

সারা দেশের বিভিন্ন যানবাহনে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে বাসাবাড়িতেও। আর এসব বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা বেড়েই চলছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১৮ সালেই গ্যাস সিলিন্ডার বা গ্যাস লাইনে পাইপের বিস্ফােরণে দগ্ধ হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিয়েছেন অর্ধশতাধিক। আহত হয়ে পঙ্গু জীবনযাপন করছেন বহু মানুষ। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের বাইরেও আরও হতাহতের ঘটনা রয়েছে।

বাসাবাড়ি ও যানবাহনে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া বা কোনো ত্রুটি থাকা। সচেতনতা না থাকার কারণে এসব সিলিন্ডার থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এর প্রতিকার বা প্রতিরোধে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

চলতি মাসের ৬ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুজন বিদেশি নাগরিক দগ্ধ হন। পরে তাদের দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে জানা যায়, ওই বাসায় ছোট গ্যাস সিলিন্ডার সংযুক্ত চুলায় চা গরম করছিলেন তার স্ত্রী। হঠাৎ সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়। এতে তারা দগ্ধ হন।

১৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১৩-এর একটি পোশাক কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চারজন আহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দগ্ধরা জানান, তারা কাজ করছিলেন। সকাল ৮টার দিকে কাজ শুরুর পর কারখানায় থাকা সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার সময় হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়।

২৮ মে রাতে একই ঘটনা ঘটে রাজধানীর রায়েরবাজার মেকআপ খান রোড এলাকায় একটি তিন তলা বাড়ির নিচ তলায়। সেখানেও গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনে একই পরিবারের তিন জনসহ চারজন দগ্ধ হয়েছিলেন।

শুধু বাসাবাড়িই নয়, রাস্তাঘাটে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের সময় বিস্ফােরণের ঘটনা ঘটছে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফােরণের ঘটনা ঘটলেও নেই প্রতিকার বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা।

২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে অন্তত ৩০ জন যাত্রী নিয়ে চলার সময় হঠাৎ করে বিস্ফোরণ ঘটে মিডওয়ে নামের একটি পরিবহনে। বিস্ফােরণে বাসের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকে। যাত্রীরা তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নেমে পড়েন এবং বাসটিতে আগুন ধরে যায়। সেদিন অল্পের জন্য রক্ষা পান যাত্রীরা। এ ঘটনায় চার জন দগ্ধ হয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন চালক আতিক মোল্লা। এই বাসে ব্যবহৃত সিলিন্ডারটি ছিল মেয়াদত্তীর্ণ।

ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর বিকট বিস্ফোরণের পর মনজিল পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে। তার আগে ৪ অক্টোবর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে গুলিস্তান-ডেমরা রুটের আশিয়ান পরিবহনে আগুনের ঘটনা ঘটে। পরে ১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুরের নয়াবাড়ি এলাকায় কুমিল্লাগামী জৈনপুর পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লেগে আহত হন তিন যাত্রী। ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের ঘিওরে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লেগে দগ্ধ হয়েছিলেন ১৬ যাত্রী।

বাস বা যানবাহনে হঠাৎ আগুনের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ যানবাহনের সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের। ফলে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় দুইশরও বেশি গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বাসের সংখ্যাই বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকে গাড়ির ফিটনেস নেওয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট (আবার পরীক্ষা) করানো বাধ্যতামূলক করে আইন করতে হবে। এতে সবাই সচেতন হবেন। প্রাণহানি কম ঘটবে ও যানবাহনও নিরাপদ থাকবে। জনসচেতনতার পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে কঠোর হওয়া দরকার বলে মনে করেন তারা।

তারা বলছেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নির্ধারিত সময়ের বাইরে এক দিনও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা যাবে না। পাঁচ বছর অন্তর প্রতিটি সিলিন্ডার পরীক্ষা করাতে হবে। পুরনো গাড়ি কেনার সময় সিএনজি রূপান্তর যন্ত্রপাতি এবং সিএনজি সিলিন্ডারসংক্রান্ত তথ্যাদি ও কাগজপত্র সঠিক কি না, তা বুঝে নিতে হবে। সিএনজি রূপান্তর করার সময় সিলিন্ডারটি প্রকৃত সিলিন্ডার কি না, তা-ও যাচাই করে নেওয়া অত্যাবশ্যক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিলিন্ডার দুর্বল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বড় বাস-ট্রাকে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেশি। কারণ বাস-ট্রাকগুলোয় ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে। গ্যাস ধরে রাখতে অনেক গাড়ির মালিক আবার নিয়মের বাইরে গিয়ে বাড়তি সিলিন্ডার ধোলাইখাল কিংবা নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করে গাড়িতে সংযোজন করেন। বাড়তি সিলিন্ডারটিই ভালো সিলিন্ডারগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। এ কারণেও অনেক ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

বিআরটিএ সূত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২৫ লাখ পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ। এসব সিএনজির প্রত্যেকটিই গ্যাসের সিলিন্ডারে চালিত হয়। প্রতিটি সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু সেই সময় কেউ মানছে না। দেশে মাত্র ২০ শতাংশ যানবাহনের আবার পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। বাকিগুলো এভাবেই চলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে যানবাহনে সিলিন্ডারসহ সব ধরনের গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ বিস্ফোরক অধিদফতর। সংস্থাটি অনুমোদন না দিলে তা অবৈধ বলে গণ্য হয়। তাদের অনুমোদনের পর সরকারের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সিএনজি কনভারশন ও পুনঃপরীক্ষা করে থাকে। এ ছাড়া নাভানাসহ চার-পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার কাজ করে থাকে।

বিস্ফোরক অধিদফতর বলছে, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাড়িতে লাগানো গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার নিয়ম। যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেয় মাত্র ১৪ থেকে ১৫ হাজার যানবাহন। তবে যেসব যানবাহন পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা না দিয়েই চলছে, সেসবের মধ্যেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। আর যেসব যানবাহন পরীক্ষা ছাড়া চলছে, তাদের সিলিন্ডারের মেয়াদ আছে কি না তা নিয়ে সন্দিহান সংস্থাটি।

সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেডের (সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন সেন্টার) ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) আমির হামজা জানান, গাড়ি নিয়মিত পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে ৩০ শতাংশেরও কম। এ কাতারে এগিয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাড়িতে লাগানো গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বিস্ফোরক অধিদফতরে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু বিষয়টি ঝুঁকিপুর্ণ জেনেও ৬০ শতাংশ বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিক পক্ষই কোনো পরীক্ষার ধার ধারছেন না। তাদের মাঝে একটি উদাসীন ভাব রয়েছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে।

এসব বিষয় নিয়ে বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বিআরটিএ যখন যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করে, তখন তারা যদি নিজস্ব বা যৌথ উদ্যোগে সিলিন্ডারও রিটেস্ট করতে পারে, তাহলে কমে আসবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। এ জন্য প্রয়োজনে আইনও করা যেতে পারে।’

সামসুল আলম জানান, প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই গ্যাস সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করে। তবে সারা দেশে ৫৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্টিং সেন্টার আছে মাত্র ১৪টি। প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে দুই বছর আগে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সিএনজি কনভারশন ও টেস্টিং বিভাগের ম্যানেজার (ওয়ার্কশপ) প্রকৌশলী শুভ বড়ুয়া জানান, তাদের দুটি নিজস্ব পুনঃপরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। এর মধে একটি রাজধানীর অদূরে ধোলাইরপাড়ে এবং আরেকটি খিলক্ষেতের জোয়ার সাহারায়। এ দুটি কেন্দ্রে বছরব্যাপী পুনঃপরীক্ষার কাজ চলে থাকে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পেট্রোবাংলার পরিচালক মোস্তফা কামাল প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি মাত্র কয়েক দিন হলো দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এ ব্যাপারে পরিসংখ্যান দেখে কথা বলতে পারব।’