‘চোখ বন্ধ করলেই আর জীবন নেই’’

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৮ | আপডেট: ৯:১৭:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না কণ্ঠশিল্পী, চলচ্চিত্রকর্মী, সঙ্গীত পরিচালক, শিল্প-সাহিত্য জগতের লোকেরা। অগণিত ভক্তরাতো আছেনই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরইমধ্যে তাকে ঘিরে অনেকেই শোকগাঁথা (স্ট্যাটাস) দিয়েছেন। এখনও দিচ্ছেন।

তপন চৌধুরী : আইয়ুব বাচ্চুর অন্যতম সহযাত্রী শিল্পী তপন চৌধুরী। মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমার জীবনের প্রথম গান থেকে আমাদের একসঙ্গে পথচলা। আমার প্রথম ক্যাসেটের সঙ্গীত পরিচালক ছিল সে। অনেক বড় এবং একজন কমপ্লিট মিউজিশিয়ান। শুধু রক গান নয় সব ধরনের কম্পোজিশন করতে পারত সে। ভার্সেটাইল একজন শিল্পী ছিল আইয়ুব বাচ্চু। সব ধরনের গান করতে পারত। বাচ্চু কোনো ব্যবসা করেনি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শুধু গানই করছে। এই শিল্পীজীবনের মধ্য দিয়েই সন্তানদের বড় করছে, দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছে। এর বেশি আর কিইবা চাওয়ার আছে। আমার অডিও এলবাম ‘তপন চৌধুরী’র সুরকার ও সঙ্গীত আয়োজক ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।

কুমার বিশ্বজিৎ : সঙ্গীতে আমাদের সম্পর্ক ৪৫ বছরের। ‘রিদম ৭৭’ নামে একটা গানের দল করেছিলাম। সেই সময় থেকে হিসাব করলেও ৪১ বছর। ছোট ছোট অনেক স্মৃতি আছে আমাদের। একে অন্যের অনেক ক্রিয়েশনের সাক্ষী আমরা। অনেক আবেগ-অনুভূতি আর দুঃখবেদনার সাক্ষী। আইয়ুব বাচ্চু যখন প্রথম ঢাকায় আসে, আমার বাসায় ছিল। অনেক দিন আমরা এক বিছানায় ঘুমিয়েছি। দুই রুমের সেই বাসাটার এক রুমে সে প্র্যাকটিস করত, আরেক রুমে আমি করতাম। খাওয়া-দাওয়া করতাম একসঙ্গে। পরে আমার বাসার পাশেই বাসা ভাড়া নেয়। জানালা দিয়ে কথা হতো। আমার বাসায় থেকে তাঁর প্রেম হয়, এরপর পরিণয়। সেই বিয়ের বাজার পর্যন্ত করেছিলাম। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একসঙ্গে ছিলাম। পরশু দিনও আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। কথা শেষ করার আগে শুধু বলল, ‘দোস্ত, মাসিমাকে দেখতে আসব।’ সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে, মাকে বলতে পারিনি। মা বাচ্চুকে আরেকটা সন্তান বানিয়েছেন। সে আমার শুধু বন্ধু না, ভাইও।

একটা ঘটনার কথা আজ মনে পড়ছে। সঙ্গীতজীবনের একেবারে শুরুর দিকের কথা। বাসাবোর একটা হোটেলে ছিলাম দুজন। দুজনের পেটেই ক্ষুধা, কিন্তু কারও পকেটেই টাকা নেই। দুজনে ভাগ করে কোনো রকম নাশতাটা খেতে পারব, সে কয় টাকা ছিল। হোটেলের বয়কে নাশতা আনতে বললাম। কাগজে মুড়ে পরোটা আর ডিম আনা হলো। কাগজ ভিজে ডিম-পরোটা গেল পড়ে। মেঝে থেকে সেই খাবার তুলে ময়লাটুকু ফেলে দিয়ে দুজনে খেয়েছিলাম।

আমরা ফিলিংস ব্যান্ডটা করেছিলাম ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে। তখন আমরা হোটেল আগ্রাবাদে বাজাতাম। হোটেলটার নাইট ক্লাবে বাজাত সোলস্, আমরা বাজাতাম সুইমিংপুলের কাছে। সেটা ছিল ইনস্ট্রুমেন্টাল। ওখানে বাজিয়েই বাচ্চুর হাত পাকে। পৃথিবীর নামকরা সব গিটারিস্টের বাদন তুলে নিয়ে বাজাতে পারত সে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বৈশ্বিক, পরিবেশনা ছিল বিশ্বমানের। এমনও হয়েছে যে একটা গান তিনবারও শুনতে চাইত লোকে। আমার অনেক গান সে সুর করেছে, অনেক গানে সে গিটার বাজিয়েছে।

একটা সময় আমরা বিয়ের অনুষ্ঠানে গান করতাম। সে রকম অনুষ্ঠানে শো করতে গেলে নানা রকম প্রস্তাব আর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হতো। বলা হতো, বরের হবু শালীকে খুশি করতে না পারলে সম্মানি দেওয়া হবে না। ফরমায়েশ মতো গাইতে না পারলে সম্মানি দিত না। ইনস্ট্রুমেন্ট আটকে রাখত। চট্টগ্রামের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, বিয়ে-জন্মদিনসহ এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিল না, যেখানে সে বাজায়নি।

এন্ড্রু কিশোর : বাচ্চুকে হারানোর ক্ষতি কখনো পূরণ হবে না। সংগীতের সব শাখায় তার পদচারণা ছিলো। আমরা যখন কেউ এখনকার অবস্থানে ছিলাম না। তখন আমি, আইয়ুব বাচ্চু, হানিফ, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। বাচ্চু চট্টগ্রাম থেকে আসতো। আমরা দেখতাম সে শয়নে-স্বপনে গিটার ছাড়া কিছুই ভাবতো না। বহুদিন দেশের বাইরে একসঙ্গে শো করতে গেছি। তখন আমরা টাকা নিয়ে ফিরতাম। কিন্তু সে ওই টাকার সঙ্গে নিজ থেকে কিছু টাকা ভরে গিটার কিনতো। যেখানেই যেতো গিটার কিনতো। আইয়ুব বাচ্চুর মতো গিটারপ্রেমী পৃথিবীতে আরেকটি আছে কিনা, আমার জানা নেই।

জেমস : আইয়ুব বাচ্চুর সমসাময়িক শিল্পী ও ব্যান্ড তারকা জেমস বলেন, আমাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল, সেটা ভালো গান তৈরির প্রতিযোগিতা। কোনো ঈর্ষা ছিল না। ১৯৮০ সালে পরিচয়ের দীর্ঘ ৪০ বছরের সম্পর্ক। এই দীর্ঘ সময় আমরা একে অপরের সুখে-দুঃখে, মানে-অভিমানে কাটিয়েছি। একসঙ্গে প্রচুর শো করেছি, গান করেছি, দেশ-বিদেশে ঘুরেছি। রক সঙ্গীতে তাঁর যে অবদান, সেটা জাতি চিরদিন মনে রাখবে। বরগুনা স্টেডিয়ামে আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গাইতে হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আজকের কনসার্টটি উনাকে (আইয়ুব বাচ্চু) ডেডিকেটেড করে করবো।
হানিফ সংকেত : চোখ মেললেই জীবন, চোখ বন্ধ করলেই আর জীবন নেই, জীবনের রঙটাই এমন’, কথাটি আমার নয়, আইয়ুব বাচ্চুর। জীবন সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি বর্ণনা করতে গিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে এই উক্তিই করেছিলো বন্ধুবর আইয়ুব বাচ্চু। অনেক কষ্ট হলেও যার নামের আগে এখন লিখতে হবে প্রয়াত। সেই আশির দশকের শুরু থেকেই বাচ্চুর সঙ্গে সম্পর্ক। তখন বাচ্চু সঙ্গীতশিল্পী ছিল না। জনপ্রিয় ব্যান্ডদল সোলসের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। দুর্দান্ত গিটার বাজাত। গিটারে ওর হাতের সঞ্চালন দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম বিদেশে এ ধরণের যন্ত্রশিল্পী থাকলে তার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তো। শুধু গিটারের ঝংকারই নয়, সঙ্গীতশিল্পী হিসাবেও বাচ্চু ছিল সফল এবং জনপ্রিয়। দেখা হতো কম, কথা হতো বেশি। ও ব্যস্ত থাকতো আমিও ব্যস্ত। আমরা থাকতাম পাশাপাশি বাড়িতে। আগে ছিল মগবাজার। হঠাৎ একদিন ফোন করে বললো, ‘আমি তোর পাশে এসেছি’। অবাক হলাম শুনে। তখন বললো এখন থেকে সে ধানমন্ডিতে আমার প্রতিবেশী। পরদিনই সপরিবারে বাসায় এলো। অনেক গল্প হলো। ওর প্রাণখোলা হাসিটা কখনোই ভুলতে পারবো না। আমি কখনোই গম্ভীর থাকতে দেখিনি ওকে।

ফাহমিদা নবী : বাচ্চু ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। তিনি সবসময় স্টেজ শো শেষে সবাইকে নিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতেন। এটা একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় গুণ। সবাইকে বলবো তার আত্মার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতে।
পার্থ বড়–য়া : আইয়ুব বাচ্চু আমার শিক্ষক ছিলেন। আমাকে তৈরি করেছেন। গিটার শিখিয়েছেন। গান করতে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। ওনার মতো গিটারিস্ট বাংলাদেশে আর আছে কি-না আমার জানা নেই। সঙ্গীতাঙ্গন অনেক বড় এক সম্পদ হারালো। বাচ্চু ভাইয়ের মতো শিল্পী আর বাংলাদেশে আসবে কি-না সন্দেহ আছে।

জ্যাকব ডায়েস : আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গীত গুরু জ্যাকব ডায়েস বলেন, ছোটবেলা থেকেই গান পাগল ছিল সে। স্কুলজীবন থেকে শুরু করেছিলেন কনসার্ট। পরিবার এতটা পছন্দ না করলেও নিজের স্বপ্ন আকঁড়ে ধরে ছিলেন গভীর তাপসে। মেধাও ছিল চমৎকার। সঙ্গীত চেতনা তৈরি হতে তাই বেশি সময় লাগেনি তার। এ কারণেই জীবনে এতটা সফল হয়েছিলো। একেবারে স্কুল জীবন থেকেই সঙ্গীতে প্রবেশ আইয়ুব বাচ্চুর। পরিবারের আর্থিক অবস্থা অতটা স্বচ্ছলও ছিল না। শিখবার জন্য অনেকের থেকে গিটার ধার করতো। ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ ছিল তার। ৮০ এর দশকের সে সময়টাই গিটার থেকে শুরু করে আধুনিক অনেক ইন্সট্রুমেন্টই সহজালভ্য ছিল না। সে সময়ই নগরীর লালখান বাজারে জ্যাকব ডায়েসের ‘স্পাইডার মিউজিক সেন্টার’ এর প্র্যাকটিস রুমে শিখেছিল গিটার বাজানো। হাইস্কুলের পুরো সময়টাতেই সে এর সাথে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠান, গায়ে হলুদ, অপেন কনসার্ট, এমনকি বারেও প্রোগাম করেছিল সে স্পাইডারের সাথে।

স্পাইডারের হয়ে গিটার বাজাতো বাচ্চু। স্পাইডারের পর সে ‘ফিলিংস’ নামে চট্টগ্রামের আরো একটি ব্যান্ডের সাথে যুক্ত ছিল। এর পর ‘সোলস’ নামে একটি ব্যান্ডের সাথে ছিল ১০ বছর। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে ‘এল আর বি’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করে। এর পরেই প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক জনপ্রিয় অ্যালবাম।
এছাড়াও পপ তারকা ফেরদৌস ওয়াহিদের ভাষ্যে, গানের জগতের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। তিনি ছিলেন ক্ষণজন্মা। তার চলে যাওয়ার ক্ষতি আর কখনোই পূরণ হবে না।

গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, আইয়ুব বাচ্চু বড়দের সম্মান করতেন ছোটদের স্নেহ করতেন। তাকে হারিয়ে ব্যান্ডের গানে হাহাকার সৃষ্টি হলো। তরুণ প্রজন্ম তার থেকে শিক্ষা নেবে সেটাই আশা করছি।