নারীর ফাঁদে ফেলে সোলায়মান গাজীকে হত্যা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৮ | আপডেট: ৭:৩৯:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৮

মার্জিয়া আক্তার রুপা। পুরুষকে আনন্দ দিতে জুড়ি নেই তার। নাচ ও গানে পারদর্শী। এ জন্য বিশেষ পরিচিতি রয়েছে সাতক্ষীরার এক শ্রেণির পুরুষদের কাছে। বিত্তশালী নারীলোভী পুরুষদের কাছে এক প্রিয় নাম রুপা। এই জগতের আড়ালে তার রয়েছে ভিন্ন পরিচিতি। এই নারীর রয়েছে ভয়ঙ্কর রূপ। অর্থের বিনিময়ে রক্তের নেশায়ও মত্ত হয়ে উঠে।
কেড়ে নিতে সহযোগিতা করে মানুষের প্রাণ। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা সোলায়মান গাজী হত্যার মূলে রয়েছে এই নারী। ইতিমধ্যে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)’র তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে হত্যা রহস্য।

আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যায় সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেছে মার্জিয়া আক্তার রুপা। আদালতে জানিয়েছে, সোলায়মান গাজী হত্যা মিশনে ব্যবহার করা হয়েছিলো মদ ও নারী। মদ ও নারীর প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নেয়া হয় তাকে। নারীর প্রলোভন দেখিয়ে শোভানালীর সন্ন্যাসীর চক থেকে আশাশুনির কৈখালিতে নিয়ে যাওয়া হয় সোলায়মানকে। সেখানে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে ইয়াবা ও জুস পান করানো হয়। সোলায়মানের পাশে বসে তাকে আনন্দ দিচ্ছিলো রুপা। একপর্যায়ে সোলায়মানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সময় কাটায় এই তরুণী। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন সোলায়মান। রুপার দেয়া তথ্যানুসারে জুস পানের পর থেকেই শরীর দুর্বল হতে থাকে সোলায়মানের। ধারণা করা হচ্ছে, জুসে কোনো প্রকার ওষুধ মেশানো ছিল। এক পর্যায়ে মুখ থেকে লালা বের হতে থাকে। অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। ওই সময়েই ধারালো চাপাতি দিয়ে সোলায়মানের গলায় আঘাত করে আজহারুল ইসলাম। গলা কেটে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যা মিশনে সহযোগিতা করে রুপা, আবু সাঈদসহ অজ্ঞাত আরো দুজন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি পাশের কাঁটাবনে ফেলে দেয় আজহারুল। সোলায়মানকে হত্যার পর রুপাকে নিয়ে

পার্শ্ববর্তী গোদারায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে রাত কাটায় তারা। পরদিন সকাল থেকে আজহারুলসহ তার সঙ্গীরা নিজেদের ফোন বন্ধ করে রাখে।

রুপার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হত্যা রহস্য উদ্‌ঘাটন করে সিআইডি। ১৩ই সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে নিজ বাড়ি সাতক্ষীরা শহরতলীর দহকুলা থেকে রুপাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন সাতক্ষীরার বিচারিক হাকিম রাজীব রায়ের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় রুপা। রুপার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সাঈদকে দেবহাটা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৯শে নভেম্বর রাত ৮টার দিকে সন্ন্যাসীর চকের সাহেব আলীর চায়ের দোকানে ছিলেন সোলায়মান। হঠাৎ একটি কল আসে তার মোবাইলফোনে। ওই ফোন পেয়েই ছুটে যান তিনি। পরদিন আশাশুনি উপজেলার কৈখালি গ্রামে ভবতোষ মণ্ডলের বাড়ির সামনে থেকে সোলায়মানের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই সামিউল্লাহ গাজী বাদী হয়ে পরদিন ১৫ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে আশাশুনি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এই মামলায় গত ১৮ই মার্চ সন্ন্যাসীর চক গ্রামের গোলাম মোস্তফা ঢালীর পুত্র আজহারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় আজহারুল। চতুর আজহারুল তার জবানবন্দিতে মিথ্যা তথ্য দেয়। হত্যাকাণ্ডে নিজে ও প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করে নিহতের স্বজনদের জড়িয়ে জবানবন্দি দেয় আজহারুল। বাদীপক্ষের অভিযোগ তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই সিআইডি’র তৎকালীন কর্মকর্তা ফারুক হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। এতে মামলার তদন্ত ভিন্নখাতে নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বাদীপক্ষ। ১৮ই এপ্রিল মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান উপ-পরিদর্শক নিউটন কুমার দত্ত, বিপিএম। তারপরই রহস্য উদ্‌ঘাটন হতে থাকে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে ঘটনার দিন আজহারুলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয়েছে রুপা ও আবু সাঈদের। রুপাকে গ্রেপ্তার করার পর জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। কিলার আজহারুল ছাড়াও কিলিং মিশনের সহযোগী আবু সাঈদ সহ আরো দুজনের তথ্য দেয় রুপা। হত্যাকাণ্ডের সময় তাদের ফোনের অবস্থান একই এলাকাতেই ছিল বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি দিলে পরবর্তীতে আজহারুলকে রিমান্ডে দেয় আদালত। জিজ্ঞাসাবাদে আজহারুলও স্বীকার করে হত্যার আসল কাহিনী।
আজহারুলের দেয়া তথ্যানুসারে, গ্রাম্য সালিশে আজহারুলের গায়ে হাত তোলাই কাল হয়ে যায় সোলায়মানের। আজহারুল মূলত একজন সাপ্লায়ার। মাদক ও অনৈতিক ব্যবসায় জড়িত। প্রথম স্ত্রী থাকাবস্থায় তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়িতে গেলে প্রথম স্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এ নিয়ে সালিশ হয়। সালিশে আজহারুলকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন সোলায়মান। তারপরই প্রতিশোধ নিতে ছক তৈরি করে আজহারুল। দীর্ঘদিন পর নারীর প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে হত্যা করে সোলায়মানকে।

মার্জিয়া আক্তার রুপা সম্পর্কে জানা গেছে, জেলা শহরে এক নামেই পরিচিতি তার। এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি এই তরুণী। রুপার রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। সাতক্ষীরা ও ঢাকায় রয়েছে এই চক্রের সদস্যরা। তারা নিজেরা অনৈতিক ব্যবসায় জড়িত। কিশোরী-তরুণীদের এই অন্ধকার পথে নামাতে রুপার জুড়ি নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে রয়েছে তার দহরম-মহরম সম্পর্ক। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই রুপা গ্রেপ্তার হয়েছে একাধিকবার। বিত্তশালী পুরুষকে নারীর প্রলোভন দেখিয়ে ঘরে ডেকে ব্ল্যাকমেইল করে সর্বস্ব লুটে নেয় এই চক্র। তাকে সহযোগিতা করে পুলিশের কিছু সদস্য। অতীতে ব্ল্যাকমেইল করতে গিয়ে ডিবি পুলিশের সদস্যসহ রুপাকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলাও রয়েছে। এই রুপাকে দিয়েই কিলিং মিশন সম্পন্ন করে আজহারুল। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি’র নিউটন কুমার দত্ত বলেন, রুপা একজন মক্ষীরানী। দেহ ব্যবসা ছাড়াও নানাভাবে পুরুষদের ব্ল্যাকমেইল করে সে। আজহারুল ও রুপা সরাসরি সোলায়মান হত্যাকাণ্ডে জড়িত। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে তৎপরতা চলছে বলে জানান তিনি।

নিহত সোলায়মান গাজী কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ঝায়ামারী গ্রামের মৃত মোকছেদ গাজীর ছেলে।