বিএনপিকে মাঠ গরম করার সুযোগ দেবে না ক্ষমতাসীন ১৪ দল

মাঠ দখলে ক্ষমতাসীন জোট

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০১৮ | আপডেট: ৮:২৭:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০১৮

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নিয়ে বিএনপিকে মাঠ গরম করার সুযোগ দেবে না ক্ষমতাসীন ১৪ দল। উল্টো তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফাঁসির দাবি নিয়ে মাঠে থেকে বিএনপিকে চাপে রাখবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল জোটগতভাবে মাঠে থাকবে নানা কর্মসূচি নিয়ে। পাশাপাশি জোটের শরিক দলগুলো আলাদাভাবেও কর্মসূচি পালন করবে। এ ছাড়া মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলে তারেকের সাজা বাড়াতে আপিল করা হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন জোটের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ওই নেতারা জানান, নির্বাচনী প্রচারের লক্ষ্যে কেন্দ্র, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সভা-সমাবেশ করে সেখান থেকে একুশে আগস্টের হামলাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিএনপির জড়িত থাকার অভিযোগ বারবার তুলে ধরা হবে জনগণের সামনে। এসবের মধ্য দিয়ে বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে জনমত গড়ার চেষ্টা করবে ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একাধিক সদস্য কালের কণ্ঠকে জানান, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত। তারেক রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি না হলেও তিনি যে ওই নৃশংস হামলায় যুক্ত ছিলেন তা প্রমাণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শরিকদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রচারে এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হবে জনগণের সামনে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতেও সোচ্চার থাকবে ক্ষমতাসীন জোট। রায়ের পর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত যে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তা থেকে যেন তারা কোনো ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে সে বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর দৃষ্টি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সারা দেশে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ১৪ দলের এক বৈঠকে তারেকের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার থাকার পক্ষে মত দেন শরিক দলগুলোর নেতারা। তাঁরা তারেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আপিল করার পরামর্শ দেন। জানা গেছে, খুলনা মহানগরে আজ ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণে এক সমাবেশ হবে। তাতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয় তুলে ধরে তারেক রহমানের ফাঁসির দাবি জানাবেন নেতারা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেকের ফাঁসির বিষয়টিতে আমরা আইনিভাবে এগিয়ে যাব। তবে তারা যে ইতিহাসের জঘন্যতম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং এই কাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরব।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অপর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পেলে আমরা আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, বিএনপি জঙ্গিবাদী-সন্ত্রাসীদের একটি দল। এটি আমরা মানুষের সামনে আবারও তুলে ধরব। তবে আশার কথা হলো—এ দেশের মানুষ এরই মধ্যে বিষয়টি বুঝে গেছে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীরাও রায়ের প্রতিবাদের কর্মসূচিতে সাড়া দিচ্ছে না। কারণ তারাও দেখেছে কিভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর গ্রেনেড হামলার পর বিএনপির শীর্ষ নেতারা জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেকের ফাঁসি হবে কি না তা পুরোপুরি আদালতের বিচারিক বিষয়। এটি রাজনৈতিকভাবে নয়, আদালতেই ফয়সালা হবে। তবে আমরা মনে করি, তারেকের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ারও বিচার এবং শাস্তি হওয়া উচিত। আমরা এ বিষয়গুলোতে সোচ্চার থাকব। নির্বাচনী প্রচারে এ বিষয়গুলো তুলে ধরব। আর কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের নানা কর্মসূচি চলতে থাকবে।’

তারেকের ফাঁসির দাবিতে এরই মধ্যে একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো। মহিলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হয়। একাধিক সমাবেশ করা হয়েছে যুবলীগের পক্ষ থেকেও। তারেকের ফাঁসির দাবিতে এবং বিরোধীদের কর্মসূচির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে এরই মধ্যে সংগঠনের শাখাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। যুবলীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ করার কথাও ভাবা হচ্ছে।

জানা যায়, গতকাল ১৪ দলের বৈঠকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বিএনপি একটি সন্ত্রাসনির্ভর, জঙ্গিসংশ্লিষ্ট দল তা প্রমাণ হয়েছে। এই ঘটনা (২১ আগস্টের হামলা) সংঘটিত করতে গিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে, এটি একটি অশনি সংকেত। রাজনীতিতে এই ধারাকে পরাজিত করতে না পারলে রাজনীতি নিষ্কণ্টক হবে না। এই বিএনপির সঙ্গে কারো ঐক্য হলে সেটা হবে জঙ্গি ও দুর্নীতিবাজদের ঐক্য।’

জাসদের সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বৈঠকে বলেন, ‘এই রায় প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে, তারা দল হিসেবে বদলায়নি। এই রায়ের মধ্য দিয়ে সত্য বেরিয়ে এসেছে, বিএনপির স্বরূপ উন্মোচন হয়েছে। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের দল আর বিএনপি খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়কারী দল। সব রাজনৈতিক দলকে এই বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। যারা জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপির সঙ্গে জোট করছে তারা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করছে।’

বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘একুশে আগস্টের ঘটনার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়া দুঃখজনক। তারেকের ফাঁসির লক্ষ্যে উচ্চ আদালতে আমাদের আপিল করতে হবে। আর মাঠেও ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার থাকতে হবে।’

বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘বিএনপি হচ্ছে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু। তারা গণতন্ত্রের হত্যাকারী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার থাকতে হবে।’

রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেওয়ায় বিএনপির সমালোচনা করে নাসিম বলেন, ‘২১ আগস্টের হামলার পর আপনারা তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। কেন বিচার করেন নাই? তদন্ত করেন নাই কেন? কেন বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন? কেন জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিলেন? এর জবাব কে দেবে? এই কারণে আপনাদের পাপের ফল ভোগ করতে হচ্ছে।’

১৪ দলের একটি সূত্রে জানা যায়, আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ধারাবাহিক নানা কর্মসূচির কথা ভাবছে ১৪ দল। সে ক্ষেত্রে বড় জেলা ও মহানগরে সমাবেশ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা ভাবা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির কর্মসূচি দেখে তাত্ক্ষণিক কর্মসূচির প্রস্তুতি রাখবে ক্ষমতাসীন জোট।