গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযোগে যা বলা হয়েছে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৮ | আপডেট: ১:৪২:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৮
গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযোগে যা বলা হয়েছে

আজ বুধবার ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ তৎকালীন সরকারের প্রশাসানিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলা এবং মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের কোনো চেষ্টা না করার অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তদন্তে প্রকাশ পায়- ২০০০ সালের জুলাই মাসে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বোমা পুঁতে হত্যাচেষ্টা মামলাটি তদন্ত করে সিআইডি। সিআইডির এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান (এই মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা) মামলাটির তদন্ত শেষে মুফতি হান্নানসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই সময় তিনি কোটালীপাড়া থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ ও সরকার উৎখাতের চেষ্টা মামলাটির বাদী হন। ওই মামলায় মুফতি হান্নানসহ অন্য অপরাধীদের আসামি করেন।

এতে আরও বলা হয়, ২০০১ সালে মুফতি হান্নান তার জঙ্গি গোষ্ঠী নিয়ে সিলেটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বোমা মেরে হত্যার চেষ্টা চালায়। ব্যর্থ হয়ে বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় দুই জঙ্গি নিহত হয়। এই মামলাটিও সিআইডি তদন্ত করে। তখন থেকেই সিআইডি’র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, এসএসপি আব্দুর রশিদ ও বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমীন ভালোভাবে অবহিত ছিলেন যে মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার জঙ্গি গোষ্ঠী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের ক্রমাগতভাবে হত্যার চেষ্টা চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরাও এ বিষয়টি জানতেন।

অভিযোগে বলা হয়, গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় মুফতি হান্নানের এসব তৎপরতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার তদন্তের প্রথম পর্যায় থেকে মুফতি হান্নানসহ অন্যান্য অপরাধীদের বাঁচানোর উদ্দেশে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে হান্নানসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো জজ মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তার কাছ থেকে মিথ্যা ও বানোয়াট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়।

এতে বলা হয়, ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হয় র‌্যাবের হাতে। জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হান্নান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ সব গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে তার সহযোগীদের নাম প্রকাশ করে। তবে তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি এবং তার সহযোগীদেরও চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হওয়ার পর জজ মিয়ার মিথ্যা বানোয়াট স্বীকারোক্তির সঙ্গে মিল রেখে এ মামলায় আসামি আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৫ সালের ১৬ নভেম্বর তাদের কাছ থেকেও একইভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট স্বীকারোক্তি রেকর্ড করানো হয়।

অভিযোগে বলা হয়, মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার থাকার সময় আসামি শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল গ্রেপ্তার হয়। সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার বিষয়টি সে স্বীকার করে। ওই সময় বিপুল জানায়, মুফতি হান্নানের কাছ থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করেই সে ওই হামলা চালায়। এ বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও ওই সময়ের সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি (পরবর্তী আইজিপি) খোদা বক্স চৌধুরী, বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমীন, সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান (সবাই গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি) জেনেশুনেই প্রকৃত আসামিদের বাঁচাতে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখাননি। তারা অন্যান্য বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনায় স্বীকারোক্তি নেওয়া সত্ত্বেও এই মামলার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেননি।

এতে আরও বলা হয়, পুলিশ কর্মকর্তারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগে থেকেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, বিশেষ করে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যায় মুফতি হান্নান ও জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতা সম্পর্কে জানলেও এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা না করে তাদের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর বারবার হামলার সুযোগ করে দিয়েছেন।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুফতি হান্নান তার জবানবন্দিতে নির্বিঘ্নে গ্রেনেড হামলা চালাতে প্রশাসনের সহায়তা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে-এ কথা উল্লেখ করে মামলার অভিযোগে বলা হয়, এই মামলার তদন্তে গ্রেনেড সরবরাহকারী হিসেবে মওলানা তাজউদ্দিনের নাম উঠে আসে। তবে তাকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়নি। ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে যে তারা আগে থেকেই জানত, মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা প্রশাসনিক সহায়তায় ২১ আগস্ট হামালা করেছে। একইসঙ্গে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীসহ এই হামলার মূল হোতাদের বাঁচাতে জজ মিয়া, আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলামদের দ্বারা মিথ্যা ও বানোয়াট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করানো হয়।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, পরে মূল পরিকল্পনাকারী ওই সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে এবং ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রীর জ্ঞাতসারেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও গ্রেনেড সরবরাহকারী মওলানা তাজউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পিএস-২ লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, তার ভায়রা ভাই ডিজিএফআইয়ের সিটি আইবির জিএসও-১ লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার ও সিটি আইবির পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, বর্তমানে মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন পরস্পর যোগসাজশে মূল অপরাধীদের রক্ষা করতে ভুয়া নামের পাসপোর্ট দিয়ে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর পাকিস্তানে পাঠাইয়া দেন। তারা আসামি মওলানা তাজউদ্দিনের বড় ভাই অভিযুক্ত আসামি আব্দুস সালাম পিন্টুকে গ্রেপ্তার করার কারণে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি ফজলুল কবিরকে গ্রেপ্তারের ভয়ও দেখায়।

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রপতি (প্রয়াত) জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন ও তিন শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। এ ঘটনার দীর্ঘ ১৪ বছর ও মামলার প্রথম অভিযোগপত্র দাখিলের ১০ বছর পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর মামলাগুলোর যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে আজ বুধবার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেন ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক।