কলাপাড়ায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে অষ্টম শ্রেনী পাশ এক প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে

প্রকাশিত: ২:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৭, ২০১৮ | আপডেট: ২:২৭:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৭, ২০১৮
কলাপাড়ায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে অষ্টম শ্রেনী পাশ এক প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে
  • কলাপাড়ায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে অষ্টম শ্রেনী পাশ এক প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে ॥
  • বিদ্যালয়ে ছয় মাস না এলেও হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের !

রাসেল কবির মুরাদ , কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি ঃ কলাপাড়ায় ৬৩নং নতুনপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোসা. আমেনা বেগম গত ছয় মাসে একদিনও বিদ্যালয়ে আসেননি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবুও হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে তার। এভাবেই মাস শেষে সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল বশারের যোগসাজশে সরকারের বেতন নেয় সে। গত এপ্রিল মাসে তার ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হয়েছে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর রয়েছে তার। তার পরিবর্তে অষ্টম শ্রেণি পাশ মোসা. নাজিফা বেগম নিয়মিত প্রক্সি ক্লাসে নিচ্ছেন। আমেনা বেগম গত আড়াই মাস ধরে ঢাকায় বসবাস করলেও কাগজে কলমে তিনি নিয়মিত স্কুলে ক্লাশ নিচ্ছেন। গ্রামের সবাই বিষয়টি জানলেও এক প্রভাবশালীর মেয়ে ও পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী বলে কেউ কিছুই বলছেন না। এমনকি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসও বলছেন বিষয়টি জানা নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, নতুনপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোসা. আমেনা বেগমের পরিবর্তে অষ্টম শ্রেণি পাশ মোসা. নাজিফা বেগম নিচ তলার একটি শ্রেণি কক্ষে ক্লাস নিচ্ছেন। আমেনা বেগম গত ছয় মাসে একদিনও স্কুলে আসেননি, তবুও শিক্ষক হাজিরা খাতায় তার স্বাক্ষর রয়েছে। আমেনা বেগম স্বাক্ষরগুলো কিভাবে করেন তা বলতে রাজি হয়নি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা। প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক শাহআলম বলেন, নাজিফা অষ্টম শ্রেণি পাশ তা আমার জানা ছিলো না। সে (নাজিফা) আমাকে এসএসসি পাশ বলেছে। তাছাড়া স্কুলে ওর (নাজিফা) কোন কাগজ পত্র জমা নাই। অন্য সহকারী শিক্ষক মোঃ ইব্রাহীম বলেন, নাজিফা প্যারা শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছেন। আমেনা বেগম ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছিলেন, তাও দুই-আড়াই মাস আগে শেষ হয়েছে। তিনি ক্লাস করতেও আসছিলেন কিন্তু বাচ্চা অসুস্থ্য হওয়ায় এখন আসছেন না। কিন্তু বাস্তবে হাজিরা খাতায় দেখা যায় গত এপ্রিল মাসে তার ছুটি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলল, আমেনা ম্যাডাম স্কুলেই আসেন না। তিনি ঢাকায় থাকেন।

এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষিকা আমেনা বেগমের ব্যবহৃত মোবাইলে ফোন দিলে তিনি মোবাইলটি রিসিভ করে তার স্বামীর কাছে দেন। স্বামী মাছুম জানান, তার স্ত্রী শারীরিকভাবে অসুস্থ্য থাকায় গত দুই আড়াই মাস যাবৎ রাজধানীতে অবস্থান করছেন। তাহলে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন কিভাবে ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা আপনার জানার বিষয় নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, আমেনা বেগমের স্বামী পুলিশে চাকুরী করেন। তার কর্মস্থল ঢাকায় বিধায় আমেনা বেগম স্বামীর সাথে সেখানে বসবাস করছেন।

এদিকে ৬৩নং নতুনপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ২০০জন ছাত্র-ছাত্রীর পাঠদানে ৭জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন ৫জন। দুইটি পদ দীর্ঘ বছর যাবৎ শূণ্য রয়েছে। ৫জন শিক্ষকের মধ্যে আবার একজন রয়েছেন প্রশিক্ষনে। আমেনা বেগম থাকেন ক্ষমতার দাপটে ঢাকায়। এদিকে সাইক্লোন শেল্টার কাম স্কুল ভবনের নিচ তলা খোলা থাকার কথা থাকলেও টিনের বেড়া দিয়ে তৈরী করা হয়েছে শ্রেণি কক্ষ। উপরের তলায় দুইটি কক্ষ। একটি কক্ষ প্রাক্ প্রাথমিক শিশু শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত। বাকী একটি কক্ষের মাঝখানে টিনের বেড়া দিয়ে শ্রেণি কক্ষ ও শিক্ষক মিলনায়তন কাম অফিস কক্ষ করা হয়েছে। স্কুলটি শ্রেণি কক্ষ সংকটে ভুগছে দীর্ঘ দিন, অন্যদিকে শিক্ষক সংকট তো আছেই। যার ফলে উপকূলীয় এলাকার এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীরা যথাযথ পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবুও যেন দেখার কেউ নেই।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বাদল কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, আমি সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখ স্কুলে যোগদান করেছি। এখনও সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারিনি। আমেনা বেগম’র বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। হাজিরা খাতায় নাজিফা স¦াক্ষর করেন বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আনছার উদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমেনা বেগমের ছুটি অল্প কয়েকদিন আগে শেষ হয়েছে। কত দিন আগে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দিন পনেরো হতে পারে। কিন্তু হাজিরা খাতায় এপ্রিল মাসে ছুটি শেষ হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোন জবাব দেননি তিনি। তবে প্যারা শিক্ষিকা নাজিফা বেগম অষ্টম শ্রেণি পাশ তা তিনি নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল বশারের মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন দিয়েও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।

কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জালাল আহম্মেদ বলেন, ’সহকারী শিক্ষিকা আমেনা বেগম’র বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি ও প্রক্সি শিক্ষিকা নাজিফা বেগমের বিষয়ে আমার জানা নেই। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: শহিদুল ইসলাম জানান, প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেনী কক্ষে পাঠ দানের কোন সুযোগ নেই। আমি এটি সরেজমিন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’