বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় বহু বছর ধরে বয়স্ক ভাতা তুলছেন অর্ধশত মৃত ব্যাক্তি!

প্রতিবাদী ইউপি সদস্যের উপর হামলা, অভিযোগের তীর ইউনিয়ন সমাজকর্মীর দিকে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৭ | আপডেট: ৮:০৬:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৭
বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় বহু বছর ধরে বয়স্ক ভাতা তুলছেন অর্ধশত মৃত ব্যাক্তি!

বয়সের কোন বালাই নেই, নাম নেই জাতীয় ভোটার তালিকায়। কিংবা প্রতিবন্ধী না হয়েও মিলছে সরকারী ভাতা। ৬ বছর পরেও সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে দিব্যি ভাতা উত্তলোন করছেন অর্ধশত মৃত ব্যাক্তি! অবিশ^াস্য হলেও এমন ঘটনা ঘটেছে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ৬নং মাধবপাশা ইউনিয়নে। যেখানে সরকারী ভাতা প্রাপ্তিতে নেই কোন হিসেবের মানদন্ড, অনিয়মই সেখানে নিয়ম। টাকার বিনিময়ে হয় সরকারি ভাতার বইয়ের বেচাকেনা। আর আত্মীয় কিংবা দলীয় লোকদের জন্য মূল্যছাড়তো আছেই। নিয়মানুযায়ী কোনো একজন একটির বেশি নিয়মিত সরকারি ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন না বলে বিধান থাকলেও এখানে এমন অনেকের সন্ধান মিলেছে- যারা একই সঙ্গে ভোগ করছেন সরকারের একাধিক ভাতা সুবিধা। আর এর সবকিছুর পেছনের মূল হোতা হচ্ছেন স্থানীয় ইউনিয়ন সমাজকর্মী লায়লা কাজী। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়ন হচ্ছে তিনি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কাজী ইমদাদুল হক দুলালের বড়বোন। প্রায় অর্ধশত মৃত ব্যাক্তির নামে বরাদ্দকৃত বয়স্ক ও বিধবা ভাতার কয়েক লাখ টাকা কৌশলে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজেশ করে আত্মসাত করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। সরকারী তদন্ত শুরু হলেও প্রশাসন কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ কেউই বছরের পর বছর ধরে চলা এ দুর্নীতির দায়ভার নিজের কাধে নিতে চাইছে না। সেই সঙ্গে চলছে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা।

গনমাধ্যমের অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা মিললেও তবুও তিনি অধরাই রয়ে গেছেন। সরকারের লাখ লাখ টাকা লোপাট হয়ে গেলেও শাস্তির আওতায় আসছে না মূল হোতা। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সমাজ সেবা প্রতিনিধির কর্মকান্ড নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুন্ন হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি। আর জনপ্রতিনিধি ৭, ৮ এবং ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য ফাতেমা আক্তার লিপির জন্য বয়স্ক-বিধবা আর প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়ে বহু বছর ধরে চলমান ভয়ঙ্কর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাই কাল হয়ে দাড়িয়েছে। প্রতিবাদ করে উল্টো শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও ধর্না দিচ্ছেন প্রশাসনের দুয়ারে। স্বামীর মৃত্যুর পর কর্মহীন নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী নিশ্চিত করতে সরকার ‘বিধবা ভাতা’, বৃদ্ধ অসহায় পুরুষদের জন্য ‘বয়স্ক ভাতা’ ও দরিদ্র প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের জন্য ভাতা প্রদান করলেও এই এলাকায় তা ভেস্তে গেছে। বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত অসহায় মানুষেরা।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, মাধবপাশা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের হিজলা গ্রামের মোসলেম খানের মেয়ে বাসিন্দা রাশিদা বেগম। তার বোন সাফিয়া হচ্ছেন ইউনিয়ন সমাজকর্মী লায়লা কাজীর ঘনিষ্ঠ সহচর (দালাল)। এই সুবাদে একই সঙ্গে বিধবা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা নিচ্ছেন তিনি। এক্ষেত্রে স্বামী ও পিতার নাম দিয়ে আলাদা আলাদা দুটি হিসাব নম্বর রয়েছে তার। ভাই আ: ছালাম খান প্রতিবন্ধী না হয়েও বাগিয়ে নিয়েছেন প্রতিবন্ধী ভাতা। গতকাল (২১ নভেম্বর) সমাজসেবা অফিসার ও তদন্ত টিমের সাথে সেই পরিবার পরিদর্শনে গেলে ইউনিয়ন সমাজকর্মী লায়লা কাজীর ইন্ধনে তার দালাল সাফিয়া ও সাফিয়ার ভাই সালাম পূর্বপরিকল্পিতভাবে ইউপি সদস্য ফাতেমা আক্তার লিপির ওপর আক্রমন চালায় এবং শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করে। এ ঘটনায় বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করলে তিনি বরিশাল বিমানবন্দর থানার ওসিকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ প্রদান করেছেন।

২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়া ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিধবা হাজেরা খাতুনের নামে ভাতার টাকা নেয়া হচ্ছে বছরের পর বছর। একই ঘটনা ঘটেছে ২০১১ সালের ৮ নভেম্বর মারা যাওয়া চান বরু বিবির ক্ষেত্রে। বাবুগঞ্জের মাধবপাশা ইউনিয়নের ৭, ৮ এবং ৯নং ওয়ার্ডে এরকম মৃত ব্যক্তির নামে বছরের পর বছর ভাতা তোলা যেন এক স্বাভাবিক ঘটনা। ২০১১ থেকে সর্বশেষ চলতি বছর মারা গেছেন এরকম বহু ব্যক্তির নামে নিয়মিত তোলা হচ্ছে ভাতা। তথ্যানুযায়ী, অনুযায়ী এরকম ৪৭ জন মৃত ব্যক্তির নামে গড়ে যদি ৩ বছরও ভাতার টাকা তোলা হয় তাহলেও সরকারের গচ্চা গেছে ১০ লাখ টাকারও বেশি। সরকারী নিয়মানুযায়ী যে কোনো ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রথমে তালিকা জমা দেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বররা। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে উপজেলা সমাজসেবা বিভাগ। তারপর চূড়ান্ত হয় কে ভাতা পাবে, কে পাবে না সেটি। ভাতাপ্রাপ্ত কেউ মারা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাতে হয় সমাজসেবা বিভাগ কিংবা উপজেলা প্রশাসনকে। কোনো উপকারভোগী (ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি) মারা গেলে সংশ্লিষ্ট ইউপি থেকে তাঁদের কার্যালয়ে মৃত্যুর সনদ পাঠানো হয়। সেই সনদ কার্যালয়ে আসার পর ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির হিসাবটি বন্ধ করে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়। সে মোতাবেক তার ভাতা বন্ধ এবং নতুন নামে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মৃত্যুর আগে ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা হয়ে গেলে, ওই ব্যক্তির নমিনি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে একবার অর্থ উত্তোলন করতে পারেন। কিন্তু অর্ধশত মৃত ভাতাপ্রাপ্ত ব্যাক্তির ক্ষেত্রে এসবের কোনোটাই ঘটেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক ব্যক্তি জানান, সরকারি ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়কে অবহিত না করে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ইউনিয়ন সমাজকর্মী লায়লা কাজী মৃত ভাতাভোগীর পরিবারের কাছ থেকে ব্যাংকের পাস বই নিয়ে যান এবং পরে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাযেশ করে ভুয়া লোক দিয়ে নিজে টাকা তুলে নেন বলে বিশ^স্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইউনিয়নের ভাতাভোগীদের মাঝেও অফিস খরচের কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগও আছে এই সমাজকর্মীর বিরুদ্ধে। তবে লায়লা কাজী এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জন্ম সাল যথাক্রমে ১৯৫২ এবং ১৯৫৭ হলেও ভাতার আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বয়স বাড়িয়ে ভাতা নিচ্ছেন হিজলা গ্রামের আ. মান্নান হাওলাদার, আ. রব মীরা, মো. আ. জব্বার এবং সাহেব আলীসহ আরও অনেকে। অথচ ১৯২০ সালে জন্ম নেয়া ৯৭ বছর বয়স্ক আমজেদ আলী হাওলাদার, ১৯৩২ সালে জন্ম নেয়া আবছার আলী হাওলাদার এবং ১৯৩২ সালে জন্ম নেয়া মো. ইউসুফ সিকদারসহ আরও অনেক অসহায় বয়োঃবৃদ্ধ আছেন- যারা আজ পর্যন্ত পাননি বয়স্ক ভাতা। বর্তমানে যারা ভাতা পাচ্ছেন তাদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা স্বচ্ছল পরিবারের। এরকম ঘটনা ঘটেছে প্রতিবন্ধী ভাতার ক্ষেত্রেও।

প্রতিবন্ধী নন অথচ ভাতা পাচ্ছেন এমন যেমন আছেন, তেমনই আবার একই পরিবারে ৩ জন প্রতিবন্ধী- তবু ভাতা পায় না এমন অনেক ব্যক্তি আছেন এ মাধবপাশায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, হিজলা গ্রামের বাসিন্দা রুপাই সিকদার একাধারে নিচ্ছেন বয়স্ক এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। এভাবে আরও অনেকে আছেন যারা একাধিক সরকারি ভাতা নিচ্ছেন। এ ছাড়া নির্ধারিত বয়স না হওয়ার আগেই বয়স্ক ভাতা পাওয়া, ভাতা পাওয়ার যোগ্য অনেকের নাম তালিকায় না উঠা এবং ভোটার তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে ভাতাভোগীর তালিকায় নাম থাকা- কেবল একটি ওয়ার্ডেই এমন ১৩ জনকে পাওয়া গেছে যাদের নাম ভোটার তালিকায় নেই অথচ তারা নিয়মিত পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতা।

ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফাতেমা আক্তার লিপি বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার পর গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করতে গিয়ে পদে পদে পড়তে হয় বাধার মুখে। তবু চেষ্টা চালাচ্ছিলাম এলাকার জন্য কিছু করার। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ি বয়স্ক, বিধবা আর প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারের দেয়া ভাতার বণ্টন নিয়ে। প্রতিদিন বহু মানুষ আসত আমার কাছে ভাতার তালিকায় নাম উঠানোর অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু কোটা খালি না থাকায় কিছুই করার ছিল না আমার।

বিষয়টি সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, তালিকায় ইচ্ছেমতো নাম ঢোকানোর কোনো সুযোগ নেই। যদি নতুন তালিকা হয় কিংবা কেউ মারা গেলে সেখানে ঢোকানো যাবে নতুন কারও নাম। এ কথা শোনার পর ভাতাপ্রাপ্তদের তালিকা নিয়ে বসি আমি। খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখি ভাতা পাওয়ার অযোগ্যরাই কেবল নয়, তালিকায় এমন অনেকের নাম আছে যাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি মারা যাওয়ার ৬ বছর পরও ভাতা পাচ্ছেন এমন লোকের সংখ্যাও অনেক- কেবল আমার ৩ ওয়ার্ডেই প্রায় ৫০ জন। এছাড়া একই ব্যক্তি একাধিক খাতে ভাতা পাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সব প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে অভিযোগ দিয়েছি।’ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মাধবপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন হাওলাদার বলেন, ‘ইউপি সদস্যরা আমার কাছে যেসব মৃত ব্যক্তির তালিকা দিয়েছেন সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সমাজসেবা বিভাগে দাখিল করা হয়েছে। এর বাইরে যদি কোনো মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় না আসে তাহলে তো আমার কিছু করার নেই।’ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুল হাসিব বলেন, ‘ বয়স্ক ভাতার বিষয়ে আমাদের ইউনিয়ন সমাজসেবা কর্মীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তিদের কার্ডগুলো বাতিল করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ আমার হাতে এসেছে। বর্তমানে সেটির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে বলা যাবে যে সত্যি সত্যি কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা।’ বাবুগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান খান বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচী কার্যক্রমের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি মেনে নেয়া হবে না। খোঁজ নিয়ে দেখছি যে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা। হলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’