সহানুভূতি কমছে রোহিঙ্গাদের প্রতি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০১৮ | আপডেট: ৯:০৮:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০১৮

গতকাল ছিল রোহিঙ্গা সংকটের বর্ষপূর্তি। বর্তমানে কক্সবাজারে স্থানীয় অধিবাসীদের চেয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের কারণে স্থানীয় অধিবাসীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এ নিয়ে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। খোলা কাগজের পাঠকদের জন্য সেটি এখানে প্রকাশ করা হলো-

 

কক্সবাজার থেকে গাড়িতে টেকনাফের মৌসুনীপাড়া যেতে দুই ঘণ্টার মতো লাগে।  সেখানে নাফ নদীর ধারে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাশেই বিশাল চরের মতো। নাফ নদীর ওপারে দেখা যায় মিয়ানমারের পাহাড়। এই এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ গত বছর ২৫ আগস্ট থেকে নৌকায় করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন।

মৌসুনীপাড়ার নয়াপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান জানান, তাদের এই স্কুলে বহু রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার প্রভাব স্কুলের পড়াশোনায় এখনো রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলে দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষা নিতে পারিনি। স্কুলের শিক্ষকদের বাড়তি খাটিয়ে আমি পরে কভার করেছি।’ তিনি জানান, রোহিঙ্গারা এখন মোটামুটি প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠেছে। কিন্তু তার স্কুলে তাদের উপস্থিতির একটি প্রভাব রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলে দুটি পানির মটর আছে। সেখান থেকে তারা (রোহিঙ্গারা) পানি নিতে আসে। তাদের স্কুলে অবাধে বিচরণ। এতে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।’

স্কুলের ঠিক পাশেই বাঁশ দিয়ে বানানো লম্বা ঘর। সেখানে রোহিঙ্গা পুরুষদের লাইন। ত্রাণের অপেক্ষায় তারা। উল্টো পাশে মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। আশপাশের জমিতে ধান চাষ হয়েছে।

রোহিঙ্গারা বাড়ি তুলেছেন বলে অনেকেই জমিতে কৃষিকাজ করতে পারছেন না। এর মধ্যেই তাদের অসংখ্য খুপড়ি ঘর। এই এলাকায় বংশপরম্পরায় জেলের কাজ করছেন মৌসুনীপাড়ার কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কোস্টগার্ড মাছ ধরতে দেয় না। এখন দিন চলে দিনমজুরি করে। কোনো দিন কাজ পাই কোনো দিন পাই না।’

গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে নাফ নদী দিয়ে অনেক রোহিঙ্গা নৌকায় করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। জেলেদের মাছধরা নৌকায় করে রোহিঙ্গাদের পারাপার বন্ধে এখানে জেলেদের মাছ ধরাই বন্ধ অন্তত ১০ মাস ধরে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকাতেই মূলত, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় মিলেছে। সরকারি হিসেবে এই এলাকায় ৩০টি রেজিস্টার্ড ক্যাম্প রয়েছে। কিন্তু উখিয়া ও টেকনাফের মূল সড়কগুলো ধরে গাড়ি চালিয়ে গেলে দেখা যাবে বন বিভাগের জমি, সরকারি খাসজমি ও সাধারণ মানুষজনের জায়গায় ও পাহাড়ের গায়ে রোহিঙ্গাদের আরও অসংখ্য খুপড়ি ঘর।
মৌসুনীপাড়া থেকে গাড়িতে করে আরও প্রায় ঘণ্টা খানেক গেলে বালুখালীর তেলিপাড়া গ্রাম। কাছেই একটি কাস্টমসের চেকপোস্ট। গত বছর আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংস অভিযানের পর এই এলাকা থেকে স্থলপথে প্রবেশ করেছেন অনেক রোহিঙ্গা। তাদের অনেকেই এর কাছেই বালুখালী ক্যাম্পে আছেন। কিন্তু অনেকেই স্থানীয়দের উঠোনে বা জমিতে ঘর করে এখনো রয়ে গেছেন।

তেলিপাড়া গ্রামের এক গৃহস্থ পরিবারের আমিনা বেগম বলছেন, দঐখানে ওই যে জমিতে এক বছর হলো চাষ করতে পারছি না।     সেখানে রোহিঙ্গাদের বাস করছে তাই। এই এক বছরে দুইবার ধান লাগাতে পারতাম।’ এই অভিজ্ঞতা এখানে বহু মানুষের। বেশকটি মৌসুম পার হয়ে গেছে। বহু কৃষকের চাষবাস বন্ধ।

টেকনাফ ও উখিয়ায় বাসিন্দারা গবাদিপশু চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। তেলিপাড়ার রোজিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি কিছু পালতে পারছি না। এই যে বাড়িটা, এখান থেকে একটা গরু নিয়ে গেছে। আমার বাড়ি থেকে দুটি ছাগল আর ওই যে বাড়িটা ওখান থেকে তিনটা ছাগল নিয়ে গেছে। মাঠে বাঁধা ছিল। দিনদুপুরে নিয়ে গেছে।’
আমিনা বেগম ও রোজিনা আক্তারের বাড়ির উঠোনেই রোহিঙ্গাদের কয়েকটি ঘর। এই গ্রামটিতে স্থানীয়রা যেন কোণঠাসা হয়ে রয়েছেন। এখানকার দিনমজুর নুরুল আলম আর সেভাবে কাজ পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা চার-পাঁচশ টাকায় কাজ করতাম। এখন বর্মাইয়ারা দুই-তিনশ টাকায় কাজ করে। তাই আমরা মাসে ১০ দিনের বেশি কাজ পাই না।’

রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের তুলনায় কম পয়সায় কাজ করছেন পুরো কক্সবাজারজুড়ে। স্থানীয় শ্রমবাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অনেক এলাকায় রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের জনপ্রিয় বাহন অটোরিকশা চালাচ্ছেন। এখানকার অনেক শিশুরাও এখন স্কুলে যেতে ভয় পায়। কারণ, সড়কে এত গাড়ি তারা আগে কখনো দেখেননি। জরুরি সাহায্য সংস্থার গাড়িই বেশি। এমন সব এলাকায় এখন ট্রাফিক জ্যাম হয়, যেখানে মানুষজনের ট্রাফিক জ্যাম সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। কারণ, সাহায্য সংস্থার কর্মীরা একসঙ্গে সকালে কক্সবাজার থেকে ক্যাম্পের উদ্দেশে যাত্রা করে। আবার বিকালে একই সময় সবাই কক্সবাজার শহরের দিকে ফিরতে শুরু করে।

সবকিছু মিলিয়ে মানবিক কারণে একসময় রোহিঙ্গাদের ঠাঁই দেওয়া মানুষজন রোহিঙ্গাদের প্রতি যেন সহানুভ‚তি হারিয়ে ফেলছেন। টেকনাফের হ্নীলা এলাকার ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য এমনটাই। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও আমার জায়গায় রোহিঙ্গাদের থাকতে দিয়েছিলাম। মানবিক কারণে তাদের সহযোগিতা করছি। কিন্তু বর্তমানে তাদের প্রতি সেই সহানুভ‚তি আর নেই।’
স্থানীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে রীতিমতো ক্ষোভের আভাস পাওয়া গেল। কারণ, তারা মনে করছেন তাদের জীবনের ওপরে জেঁকে বসেছে রোহিঙ্গারা। তাদের স্থানীয় সমাজের কাঠামোটাই বদলে দিচ্ছে তারা। আর স্থানীয়দের জন্য কোনো সহায়তার ব্যবস্থা এখনো হয়নি। অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পালংখালীর প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আবছার চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের তো বিভিন্ন এনজিওরা সহায়তা দিচ্ছে। বাঁচতে হলে আমাদের যে অধিকার, রোহিঙ্গারা আসার কারণে তাতে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেছে। কিন্তু আমাদের তো এরকম কোনো সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না।’

উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য যারা মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন, আজ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের চাপে তাদের নিজেদের জীবন- জীবিকাই হুমকির মুখে। কিন্তু তাদের কথা ভাবছে না কেউ।