‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অর্ধেক শিশু এতিম’

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০১৮ | আপডেট: ১২:৩৫:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০১৮

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের প্রতি দু’জনের একজন মা অথবা বাবাকে হারিয়েছে। অর্থাৎ যত শিশু এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আছে, তার ৫০ শতাংশেরই বাবা অথবা মা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায় এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

শনিবার ঢাকায় এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি প্রকাশ করে সেভ দ্য চিলড্রেনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্ক পিয়ারস বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই শিশুরা এ মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। তাদের এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মা-বাবা কিংবা কোনো পরিবারের সদস্য ছাড়া এক নতুন অস্তিত্ব তৈরি করতে হয়েছে। ক্যাম্পের পরিবেশে এই শিশুরা পাচার, বাল্যবিয়ে ও অন্যান্য ধরনের নির্যাতনের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেন মিয়ানমারে সংঘটিত নিষ্ঠুর ও ইচ্ছাকৃত নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শাস্তির আহ্বান জানিয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, বর্তমানে কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ছয় হাজারের বেশি পিতৃ-মাতৃহীন রোহিঙ্গা শিশু বসবাস করছে। গবেষণায় ১৩৯টি অভিভাবকহীন শিশুর অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া ৬১ শিশুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ৭০ শতাংশ শিশু পুরোপুরি অভিভাবহীন এবং তারা তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ শিশুই তাদের অভিভাবকসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী। বাকিদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ শিশু তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে রাখাইনের গ্রামগুলোতে আক্রমণের সময়। ৯ শতাংশ তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে বাংলাদেশে আসার পথে।

গবেষণায় যে ১৩৯ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়, তার মধ্যে ৯৯ জন জানায়, তারা গ্রামে হামলার সময় মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ৭০ জন জানায়, হামলা সময় তাদের মা-বাবাকে হত্যা করা হয়। ৫৯ জন জানায়, তাদের গ্রামে হামলার সময় বড়দের নির্বিচারে হত্যা করা হয়, যার মধ্যে তাদের মা-বাবাসহ বড় ভাই ও অন্য স্বজনরা ছিল। ১১ জন জানায়, তারা বাংলাদেশের পথে রওনা দেওয়ার পর কোনো একসময় মা-বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন, তার মধ্যে কমপক্ষে তিন লাখ ৭০ হাজার শিশু।

মার্ক পিয়ারস বলেন, এ গবেষণায় নির্দিষ্ট সংখ্যক শিশুর ওপর তথ্য সংগ্রহের কাজ করা হয়েছে। তবে এ তথ্য মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত লক্ষাধিক শিশুর ভয়ানক পরিণতির চিত্রকে উপস্থাপন করে।

তিনি বলেন, যে শিশুদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, তাদের মধ্যে একজন হুমায়রা, তার বয়স ১৭ বছর। সে জানায়, ২০১৭ সালের আগস্টে চোখের সামনেই তার মা-বাবাকে হত্যা করা হয়।

হুমায়রার সাক্ষাৎকার নেওয়া গবেষণাকর্মী রাস্না শারমিন জানান, হুমায়রা মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিল এবং তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতার কথা শুনতে একসময় কাউন্সেলিং করতে হয়। তবে একটি ভালো খবর হচ্ছে, গবেষণাকর্মীরা কয়েক মাস ধরে খোঁজ নিয়ে হুমায়রার দুই ভাইয়ের খোঁজ পান এবং ক্যাম্পে হুমায়রা এখন তাদের সঙ্গেই আছে।

মার্ক পিয়ারস আরও বলেন, সেভ দ্য চিলড্রেন এসব বিচ্ছিন্ন ও অভিভাবকহীন শিশুর জন্য পৃথক জায়গা তৈরি করেছে, যেখানে তারা ২৪ ঘণ্টা সুরক্ষিত থাকতে পারে। এই সংস্থা গত ১২ মাসে ১০০ শিশু ও নারীবান্ধব কেন্দ্র স্থাপন করেছে কপবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এই কেন্দ্রগুলোতে ৪০ হাজার শিশু নিরাপদে খেলা করতে পারে এবং নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সময় কাটাতে পারে। এ ছাড়া শিশুরা শিক্ষার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্য, পানি এবং স্যানিটেশন সুবিধা পাচ্ছে। তবে তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। তিনি বলেন, এই শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে প্রয়োজন ছিল ৯৫ কোটি মার্কিন ডলার। এখন পর্যন্ত এই অর্থের তিন ভাগের এক ভাগ নিশ্চিত হয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেন মিয়ানমারের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিসেল ম্যাকগ্রাথ বলেন, এই বিপুলসংখ্যক শিশুর শৈশব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু সারাবিশ্ব এই ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অত্যাচারী মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিরাপদ, সম্মানজনক এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের সুযোগ পায়।

  • সমকাল