৬০ বছর যাবত টাউন হলের সামনেই বসে দেখেছেন বদলে যাওয়া বরিশাল

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০১৮ | আপডেট: ৪:৩৫:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০১৮
৬০ বছর যাবত টাউন হলের সামনেই বসে দেখেছেন বদলে যাওয়া বরিশাল

অাবদুল ছাত্তার আকন। বয়স হয়েছে ৮৫ বছর। পেশায় মুচি। দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত এই পেশায় আছেন। বরিশাল শহরেই বাস করেন। নগরীর টাউন হলের বাউন্ডারি ঘেষে ফুট পাথে বসেন তার জুতা সেলাইয়ের বাক্স নিয়ে।

এই নগরীর বসবাসকারীরা সবাই তাকে চেনে। কারন এই একই জায়গায় দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে বসছেন তিনি। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে বসে পার করে দিলেন টানা ৫টি যুগ।

চোখের সামনে দেখেছেন এই শহরের বদলে যাওয়া রুপ বৈচিত্র এবং কয়েকটি প্রজন্মকে। সমাজ রাজনীতে এসব কিছুই বদলে যেতে দেখেন ছাত্তার আকন। মাথা নিচু করে জুতা সেলাই করতে করতে জুতোর ডিজাইনের পরির্বতনের সাথে দেখলেন আরো অনেক গল্প। তবে তার নিজের জীবনের পরিবর্তন হলো না। অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি আবদুল ছত্তার আকনের জীবন।

আলাপ কালে সেই সব অভিজ্ঞাতর কথা বললেন মৃদু হেসে। এমনিতে তিনি কথা খুব কম বলেন। স্বল্পভাষী মানুষ। তবে আলাপ জমে গেলে শোনাবেন অনেক কথাই। আবদুল ছাত্তার আকন বলেন, ‘এইযে টাউন হলটা দেখতাছেন ৬০ বছর আগেও এই টাউন হল বাদে আর তেমন কোন বিল্ডিং ছিলো না। আশে পাশে বেশ কিছু ঝুপড়ি ঘর ছিলো।’

প্রধান সড়কটি দেখিয়ে বলেন, ‘এইযে রাস্তাটা দেখেন এইটা কিন্তু আগে এমন পিচ ঢালাই ছিলো না। আরো ছোট ছিলো। যে ড্রেনটা দেখতাছেন এই জায়গা আগে খাল আছিলো। নৌকা চলতো। এখন তো তার উপর দিয়া ড্রেন হইছে।’

তার সময়কার ব্যবসায়ীরা কেউ নেই। তিনি একাই রয়ে গেছেন এই টাউন হল প্রাঙ্গনে। ছাত্তার জানান, বরিশালের প্রাণ কেন্দ্র ছিলো এই টাউন হলো। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সভা সবই এখানে হতো। নাটক, যাত্রা, গান বাজনার অনুুষ্ঠান হতো। বড় বড় রাজনৈতিক সভাও হতো এখানে। টাউন হলের পাশেই ছিলো একটি রুচিতা নামের রেস্টুরেন্ট। ওখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের আড্ডা বসতো।

তিনি বলেন, জি “কত নেতাগো দেখছি। হেরা বিকাল হলেই আড্ডা বসাইতো। পরে পুলিশ এইটা ভাইঙ্গা দেয়।” কিছুক্ষণ স্মৃতি হাতড়ে বলেন ‘সময়টা সম্ভবত এরশাদের আমল ছিলো। ঠিক মনে নাই।’

আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন সামনেই একটা প্রতিবাদ সমাবেশ হচিছলো। মাইকের দিকে তাকিয়ে আবদুল ছত্তার বলেন, ‘কত প্রতিবাদ দেখলাম…।’ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বলেন, ‘আগের দিন আর নাই। আগে যা ইনকাম করতাম তাতে অনেক ভালো মন্দ খাইতাম। এখন স্বাদও নাই, দামও অনেক। আগে একটা ইলিশ রানলে আশে পাশে দশ বাড়িতে সেই ঘ্রাণ চইল্যা যাইতো। এখন কি পান? কোন ঘ্রান নাই মাছের। আহারে আগের দিন…।’

আবার চুপ করে গেলেন তিনি। হয়তো স্মৃতির জগতে ভাষছেন। কত স্মৃতিইতো জমেছে। কত কথাইতো আছে বলার। তার কাছে জানতে চাইলাম, যুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন? উত্তরে বলেন, যুদ্ধের সময় এই খানেই ছিলাম। খান সেনারা টহল দিতো গাড়ি নিয়া। তখন আমি চালাকি করে একটা পতাকা টানাইয়া কাজ করতাম। তাই আমারে মারে নাই।

কথায় কথায় জানলাম, তার পরিবারে আছে ২ ছেলে চার মেয়ে এবং স্ত্রী। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কাঁচা মালের ব্যবসা করেন। থাকেন বরিশাল শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে পলাশপুর বস্তিতে।

জানালেন আগে আয় বেশি হতো। এখন কমে গেছে। নানা ধরনের স্যান্ডেল, জুতা বের হয়েছে অল্প দামের। তাই মানুষ জুতা ছিড়ে গেলে কম আসে। তিনি বলেন, ‘প্ল্যাস্টিক, রাবার, টায়ারসহ নানা রকম সেন্ডেল বের হইছে। মানুষ তাই ওইসব কিনে। কম আসে এখানে। তাই আয়ও কমে গেছে।’

কথায় কথায় সময় গড়ায়। তার কিছু ছবি তোলার কথা বললে মৃদু হেসে সম্মতি দিলেন। তারপর বললেন, “কত মানুষ ছবি তোলে কেউ দেয় নাতো…। তোলেন ছবি..।”

কথা শেষ করে বিদায় নিলাম। তখন প্রখর রোদ । ছাত্তার আকন বসে আছেন টাউন হলের গেটের ছায়ায়। এই গেটে হেলান দিয়েইতো কেটে গেলো ৬০টি বছর। রাত সাড়ে টার দিকে যখন ওই একই স্থান দিয়ে যাচ্ছিলাম তখনও দেখা গেলো একটি কুপি জ্বালিয়ে বসে আছেন আবদুল ছাত্তার। নগরীর এক প্রবীন মুখ। যিনি গত ৬০ বছর ধরে বদলে যাওয়া বরিশালের নানা গল্পের স্বাক্ষী।

  • বাংলা