‘নির্বাচনে সবাইকেই দরকার হয়, কাউয়াদের রাজত্ব আর নয়’

প্রকাশিত: ৭:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০১৮ | আপডেট: ৭:২৫:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০১৮
‘নির্বাচনে সবাইকেই দরকার হয়, কাউয়াদের রাজত্ব আর নয়’

কাউয়াদের রাজত্ব এখন আর থাকবে না। দলের দুর্দিনের নেতা-কর্মী যারা আছেন, যাদের জন্য আওয়ামী লীগ আজ এই উচ্চতায় এসেছে, সবার আগে তারা প্রাধান্য পাবেন’ বলে মন্তব্য করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনে নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, নতুনদেরও দলে প্রয়োজন আছে। যোগ্যতা এবং দলের প্রতি অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে যার যেখানে স্থান পাওয়ার কথা সেভাবেই তাদের মূল্যায়ন করা হবে। নিজের নিরঙ্কুশ বিজয় ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি উৎসর্গ করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ। এই জয়ের সব কৃতিত্ব আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়েছেন তিনি। বরিশালসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে বরিশাল সিটির জনগণ নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন বলে মনে করেন নবনির্বাচিত এই মেয়র। এ কারণে নির্বাচিত হওয়ার পর আবারও জনগণের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন তিনি। উদ্দেশ্য বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। এভাবে জনগণের কাছে গিয়ে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করে জনগণের আস্থা অর্জন করতে চান সাদিক। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নগরীর সুবিধাবঞ্চিত, বস্তিবাসী এবং বর্ধিত এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করে শহরের পুরনো অংশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করবেন।

এ ছাড়া নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ২২টি খাল অবৈধ দখলমুক্ত করে প্রবাহ ফিরিয়ে এনে জলাবদ্ধতা নিরসন তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এনে সবগুলো খাল অবৈধ দখলমুক্ত করে প্রবাহ ফিরিয়ে এনে বরিশাল নগরীকে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ খ্যাতি ফিরিয়ে আনা নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নগরীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট মেটাতে প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ টেকসই উন্নয়ন করার কথা বলেছেন সদ্য নির্বাচিত এই মেয়র।

তিনি বলেন, উন্নয়ন হবে টেকসই। বিগত দিনে দেখা যায়, রাস্তা নির্মাণের কয়েক মাস পর খানাখন্দে ভরে গেছে। এ কারণে আবারও ওই রাস্তা সংস্কার-মেরামত করতে অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ সাশ্রয় করতে টেকসই উন্নয়নে গুরুত্ব দেবেন তিনি। ২০০২ সালে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এ কারণে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচ থেকে ছয় মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া আছে। এ ছাড়া বিগত দিনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ মোট ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া আছে। বিপুল পরিমাণ দেনা মাথায় নিয়েও নিয়মিত বেতন-ভাতা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিল পরিশোধে সচেষ্ট থাকবেন তিনি।

তার মতে, নগর ভবনের রাজস্ব আয় দিয়েই দায় শোধ করা সম্ভব। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ তার আমলে রাজস্ব আয়ের টাকা দিয়েই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। কিন্তু বিদায়ী মেয়র আহসান হাবিব কামাল সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি। আন্তরিকতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই ‘আয় দিয়ে দায় শোধ’ করা সম্ভব এবং সেটিই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবেন বলে জানান মেয়র সাদিক। দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি করপোরেশনে কোনো দুর্নীতি সহ্য করবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাদিক আবদুল্লাহ। পয়লা আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে গিয়ে তার সঙ্গে থাকা আওয়ামী লীগ দলীয় কাউন্সিলরদের এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন বলে জানান সাদিক।

বিগত দিনের ধারাবাহিকতায় নগর ভবনের প্রতিটি বিভাগ আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ঘুষ-বখশিশ ছাড়া নগর ভবনে কোনো ফাইল নড়ে না, সেবা পায় না জনসাধারণ। এ বিষয়ে সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, নগর ভবনে ঘুষ-দুর্নীতিসহ যে কোনো অনিয়মের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করবেন তিনি। তার মূল নীতি হবে ‘স্বচ্ছ থাকব, স্বচ্ছ রাখব’। এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে আপস করবেন না বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানালেন নবনির্বাচিত এই মেয়র।

সাদিক বলেন, একজন ব্যক্তি যখন মেয়র নির্বাচিত হন, তখন তিনি আর কোনো দলের থাকেন না, তিনি সবার মেয়র হন। যারা ভোট দিয়েছেন, কিংবা দেননি, সবার হয়ে নগর উন্নয়নসহ বরিশালে সব রাজনৈতিক দল-মতের সহাবস্থান নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। বিরোধী দল-মতের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনাও যাতে আগামী দিনগুলোতে না ঘটে সে জন্যও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করবেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সাদিক বলেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর এবং বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরও বরিশালে কোনো আনন্দ কিংবা বিজয় মিছিল করেননি তার কর্মী-সমর্থক-অনুসারীরা। তবে নির্বাচনের আগের দিন একটা বড় শোডাউন কর্মীদের মনোবল বাড়িয়েছে।

এবারের বরিশাল সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিখুঁত পরিকল্পনা এবং হোমওয়ার্ক সম্পর্কে নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক বলেন, অন্য যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে এবার তারা আলাদা পরিকল্পনা করে নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ড ছিল সুচিন্তিত এবং পরিকল্পিত। এ কারণে বাড়তি সুবিধাও পেয়েছেন তারা। এর অন্তরালের মূল কারিগর ছিলেন সাদিক আবদুল্লাহর বাবা মন্ত্রী মর্যাদার পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবয়ন নিরীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি। বরিশাল আওয়ামী লীগে ‘কাউয়া’ (নব্য আওয়ামী লীগার) ঢুকে পড়ায় এবং তাদের হাতে দলের কর্তৃত্ব চলে যাওয়ায় দলের দুঃসময়ে নিবেদিতপ্রাণ ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা। তারা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ক্ষোভ-হতাশা আছে কাউয়াদের রাজত্বে।

এ বিষয়ে সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সবাইকেই দরকার হয়। কাউয়াদের রাজত্ব এখন আর থাকবে না। দলের দুর্দিনের নেতা-কর্মী যারা আছেন, যাদের জন্য আওয়ামী লীগ আজ এই উচ্চতায় এসেছে, সবার আগে তারা প্রাধান্য পাবেন।’

তিনি বলেন, নতুনদেরও দলে প্রয়োজন আছে। যোগ্যতা এবং দলের প্রতি অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে যার যেখানে স্থান পাওয়ার কথা সেভাবেই তাদের মূল্যায়ন করা হবে। ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারকে ৯৪ হাজার ২১৮ ভোটে হারিয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৫৩ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাদিক আবদুল্লাহ। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহানআরা আবদুল্লাহ দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সাদিক মেজো।