ধর্মের দোহাইয়ের অভিযোগে মেয়র প্রার্থী মাহাবুবকে শোকজ

প্রকাশিত: ১০:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৮ | আপডেট: ৫:১৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৮

অবশেষে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোটে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে তিন মেয়র প্রার্থীসহ পাঁচজনকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান।

এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহাবুবসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরাও রয়েছেন।

যাদেরকে শোকজ নোটিশ দেয়া হয়েছে তারা হলেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল­াহ, বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহাবুব এবং বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ভাস্কর সাহা ও বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন।

শনিবার পাঠানো পৃথক ওই কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব পরবর্তী তিন কার্যদিবসের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। সিটি নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করছেন বলে অভিযোগ আছে।

এছাড়া সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় দুটি বির্তকিত ভিডিওতে এ বিষয়টা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ওই ভিডিওতে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হাতপাখা মার্কায় ভোট না দিলে কবিরা গুনাহ্ বলে মন্তব্য করেন ধর্মভিত্তিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই পীর) মনোনীত মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবায়েদুর রহমান মাহবুব। গত শুক্রবার নগরীর কালিজিরা এলাকায় নির্বাচনী গণসংযোগকালে ভিডিওটিতে মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবায়েদুর রহমান মাহবুব বলেন, এ বছর বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে যার মধ্যে সামান্যতম ঈমানের জ্ঞান আছে, তার জন্য হাতপাখার বিকল্পে ভোট দেওয়া কবিরাগুনা! কবিরাগুনা!! কবিরাগুনা!!! এসময় উচ্চস্বরে তিনি আরও বলেন, “নবী আলাহিস্লাতুসালাম জানিয়ে দিয়েছেন তোমরা আমার পায়গাম পৌঁছে দাও। সেই পায়গাম পৌঁছে দেয়ার ঘোষণার লক্ষ্যে আজকে জানিয়ে দিলাম কালিজিরাবাসিকে, এবছর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীতায় যদি হাতপাখার বিপক্ষে কেউ ভোট দেয় তার জন্য কবিরা গুনাহ্ হবে।”

এদিকে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করিমের গনসংযোগের আরেকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ফেইসবুকে। হাত পাখা প্রতীকে ভোট দিলে তা আল­াহর নবী পাবেন বলে উলে­খ করেন চরমোনাই পীরে ফজলুল করীমের এই ভাই। ভিডিওটিতে তিনি বলেন, ‘যদি আপনি নৌকা মার্কায় ভোট দেন ভোটটা পাবে বর্তমান প্রাইমমিনিষ্টার শেখ হাসিনা, আপনি যদি ধানের শীষে ভোট দেন তাহলে ভোটটা পাবে খালেদা জিয়া। আর হাত পাখায় ভোট দিলে ভোট পাবে ইসলাম এবং আল­াহ নবী।’

এছাড়া নগরীর সদর রোডে ব্যস্ত রাস্তায় মাওলানা মাহবুবের সমর্থকদের কোরআন শরীফ পাঠ করে ভোটারদের প্রভাবিত করতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে নবী দাবীকারী চরমোনাই পীরের ফাঁসি চায় নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি। নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবির চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী এক লিখিত বিবৃতিতে উলে­খ করেন, যেহেতু নৌকা শেখ হাসিনা, ধানের শীর্ষ খালেদা জিয়া আর হাতপাখা চরমোনাই পীরের প্রতিক, সেহেতু তাঁর বক্তব্যনুসারে নিজেকে নবী দাবীকরে ধর্মের অবমাননা করেছেন। অনতিবিলম্বে সরকারীভাবে ধর্ম অবমাননা, নিজেকে নবী করার অপরাধে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। যাতে করে আর কোন ব্যক্তি নবীর সাথে, ইসলামের সাথে ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক তুলনা না করতে পারে।

একই সাথে নেতৃবৃন্দ বলেন, এই পীর নামক ভন্ড প্রতারক ধর্মব্যবসার রাজনীতি করায় আজ ইসলামের অবমাননাই শুধু নয় চরমভাবে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মীয় কর্মকান্ড বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নূন্যতম সাজা হিসেবে চরমোনাই পীরের ফাঁসি, শাসনতন্ত্র আন্দোলন সহ সকল ‘ইসলাম’ শব্দ ব্যবহারকারী রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। তা না হলে সারাদেশে সত্যিকারের ধর্মভীরু মানুষদেরকে সাথে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

অন্যদিকে গত ১৮ জুলাই শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়ামে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল­াহ’র সঙ্গে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১৯ জুলাই সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মেয়র প্রার্থীর পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রচারণায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমানের পক্ষে তার আইনজীবী। অভিযোগ পাওয়ার পর শনিবার আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল­াহ, শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ভাস্কর সাহাকে এবং বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মিছিল করায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার এবং নোটিশ প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করে সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তাদেরকে নোটিশের উত্তর দিতে বলা হয়েছে। উত্তর সন্তোষজনক না হলে পরিবর্তি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনে ইসির হাতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা থাকলেও অতীতে তা কখনও ব্যবহারের নজির নেই।

এছাড়া গত শুক্রবার ভোটারদের ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের প্রশিক্ষণে অস্ত্র দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক কর্মকর্তাকে হুমকি দেয়ার ঘটনায় ১২ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগপন্থী কাউন্সিলর প্রার্থী জাকির হোসেন ওরফে ভুলুকে (ঠেলাগাড়ি মার্কা) ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জাকির হোসেন নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হয়ে কারণ-দর্শানোর নোটিশের জবাবে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ ও ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাকে এ লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ইসির পক্ষ থেকে দেওয়া শোকজ নোটিশে ইসি আয়োজিত ইভিএম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মী-সমর্থক নিয়ে উপস্থিত হয়ে বিভিন্নভাবে বাধা, হুমকি, ভয়ভীতি, অস্ত্র প্রদর্শন, অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে গালমন্দ করা, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধাচরণ এবং যন্ত্রপাতি ছিনিয়ে নিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল ভুলুর বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করা হয়।

এসব কর্মকাণ্ডকে নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় কাজ ও প্রচলিত আইনের বিরোধী উলে­খ করে কেন তার প্রার্থিতা বাতিলের সুপারিশ করা হবে না, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে হাজির হয়ে তার লিখিত জবাব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।

এদিকে প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র বরিশাল মহানগর সভাপতি শাহ-সাজেদা।