কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙ্গন দৃশ্য দেখে হতাশায় হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে পর্যটকদের

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৫:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০১৮ | আপডেট: ৫:১৭:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০১৮

উত্তাল সমুদ্রের অব্যহত ভাঙ্গনে শ্রহীন কুয়াকাটা সৈকতের দৃশ্য দেখে হতাশায় হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে পর্যটকদের। এখন পর্যন্ত সরকারি ও বে-সরকারি উদ্যোগে পর্যটক বান্দব কোন উদ্যোগ গ্রহন না করলেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা কুয়াকাটার প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম নৈস্বর্গীক দৃশ্য দেখার জন্য যুগ যুগ ধরে এখানে ছুটে আসছেন। ভাঙ্গন থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে একটি উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রনালয় পাঠালেও সেটি মন্ত্রনালয় থেকে বিস্তারিত সমীক্ষার জন্য ফেরত পাঠানোয় চলতি মৌসুমে সৈকত রক্ষার উদ্যোগে অনিশ্চয়তার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে কিনা তাও নিশ্চিত করে বলতে পারেনি স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বরত কর্মকর্তাগণ। অব্যহত ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে শতাধিক ব্যবসায়িরা।

 

সরেজমিন দেখাগেছে, কুয়াকাটা জিরোপয়েন্ট থেকে পিচ ঢালই সড়ক ধরে সমুদ্র সৈকতের দিকে চলতেই চোখে পড়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ প্রচন্ড শব্দে আচড়ে পরছে। জলরাশীর এমন দৃশ্য দেখে হৃদয় উচ্ছ্বাসিত হলেও সড়কের শেষ প্রান্তে গিয়ে আতকে উঠার অবস্থা ! সমুদ্রের ভাঙ্গরে প্রায় ১০ ফুট পিচ ঢালাইয়ের রাস্তা বিলীন হয়েগেছে। সৈকত ধরে পূর্বদিকে চলতেই চোখে পড়ে শতবর্ষী নারিকেল, মেহেগনি, তাল গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির অর্ধশত গাছ উপড়ে পরে আছে। কিছু গাছের গোড়া থেকে বালু সড়ে গিয়ে গাছের মূলসহ শিকড়-বাকর কঙ্কালের মতো বেড় হয়ে আছে। যে কোন সময়ে গাছ গুলো উপড়ে পড়তে পারে।

 

গাছ গাছালির দৃশ্য দেখে হতাশ হয়ে চোখ বিস্তির্ণ সৈকতের আরো পূর্ব দিকে তাক করতেই দেখা গেলে শতবর্ষী ফয়েজ মিয়ারা নারিকেল বাগানে স্থাপন করা ঐতিহ্যবহন কারী সুন্দরী ও শাল কাঠসহ বিভিন্ন কাঠের তৈরী দো-তলা টিনের ঘরটি সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডবে দুমড়ে-মুচড়ে সৈকতে পরে ছিলো কিছুদিন আগেও। এখন আর সে সকল স্থাপনার কোন চিহ্নমাত্র নেই ! আরো একটু পথ চলতে ঝাউ বাগানের ঝাউ গাছ সাড়ি সাড়ি পড়ে আছে সৈকতে। প্রাকৃতিক নয়নাভীরাম দৃশ্যের ধারক ‘কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানের’এসকল সবুজ বনানীর বিপর্যস্ততার দৃশ্য দেখে পর্যটকরাও হতাশা ব্যক্ত করনে।

 

কুয়াকাটায় ভ্রমনে আসা পর্যটক মো. লুৎফর রহমান মঞ্জু বলেন, অনেক দিন ধরে জানতাম কুয়াকাটা হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে ধারক। প্রায় ২০ কিলোমিটারের এই সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে রামনাবাদ নদের মোহনা ও পশ্চিম দিকে রয়েছে আন্ধারমানিক নদের মোহনা। রামনাবাদ নদের মোহনা হচ্ছে সূর্য্যদয়ে সময়ে রূপসী আর আন্ধারমানিক নদের মোহনা হচ্ছে সূর্যাস্তের সময়ে অপরূপ রূপসী। এই দুই মোহনার সৌন্দর্য্যরে বর্ণনা দেওয়া ভাষা আমি এখনো খুজে পাচ্ছিনা। এছাড়াও রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে ভান্ডার কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউ বাগান, নারিকেল বাগান, এবং পশ্চিম দিকের লেম্পুচরের ম্যানগ্রোভ বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি; কিন্তু সেই সকল স্পটের বিধ্বস্ততার অবস্থা দেখে আমার হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয়েগেছে। চড়ম ভাবে হতাশ হয়ে পরেছি। কিছুই ভালো লাগছে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কুয়াকাটার জন্য সরকার কী করলো বা করছে ?
পর্যটকের কথার সূত্র ধরে সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে চলতেই চোখে পরে পর্যটকদের জন্য নির্মান করা পাবলিক টয়লেটটি ঢেউয়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সেটি রক্ষায় বালুর বস্তা এবং ইটসুরকী দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করছে কুয়াকাটা পৌরকর্তৃপক্ষ।

 

একটু দুরে চলতেই চোখে পরে সৈকত সংলগ্ন বিপর্যস্ত আবাসিক হোটেল কিংস ভবনটি সমুদ্রের ভাঙ্গনে বিধ্বস্ত অবস্থায় পরে আছে। হোটেল মালিক মো. মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, আমি সর্বশান্ত হয়ে গেছি। জমি এবং হোটেলসহ প্রায় এক কোটি টাকার সম্পত্তি সমুদ্রের হিং¯্রতায় ক্ষতবিক্ষত হয়েগেছে। এখানে আমাদের জমি ছিলো ৩০ শতাংশ, সমুদ্রের ভাঙ্গনে গত বছর টিকেছিলো ১৪ শতাংশ। এ বছর সমুদ্রের ভাঙ্গনে হোটেল ভবনসহ জমি সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডবে বিলিন হয়েগেছে। টেকে আছে মাত্র পাঁচ শতাংশ জমি। সৈকতের মাঝি বাড়ি পয়েন্টে গিয়ে দেখাগেছে, সেখানকার বেড়িবাঁধের পাঁচ ফুট সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডবে বিলীন হয়েগেছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবুল খায়ের জানান, ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্থায়ীভাবে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার জন্য একটি ‘সৈকত রক্ষা প্রকল্প’ প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো হয়েছিল সংশ্লিস্ট মন্ত্রনালয়ে। যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে ফের বিস্তারিত সমীক্ষার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে। যার জন্য এবছর বর্ষা মোৗসুমে সাগরের ভাঙন রোধে সৈকত রক্ষা প্রকল্পের কাজ অনিশ্চিত হয়ে গেল। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব উদ্যোগে ও অর্থায়নে স্বল্প পরিসরে জরুরি ভিত্তিতে ঝুকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এবং সৈকত প্রটেকশনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

 

 

জানাগেছে, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করে ২০১৭ সালের শেষের দিকে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশল কার্যালয় থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। সেখান থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। যা অনুমোদন শেষে এবছর এ প্রকল্পের কাজ শুরুর সম্ভাবনা ছিল। সম্পুর্ণ সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয়-বরাদ্দ নির্ধারন করা হয়েছিল ২১২ কোটি টাকা। কুয়াকাটা সৈকতের শুন্য পয়েন্ট থেকে দুই দিকে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত এলাকা নিয়ে এ প্রকল্পের সম্ভাব্য এলাকা ছিল। পশ্চিম দিকে দেড় কিমি এবং সাড়ে তিন কিমি পুবে সৈকত রক্ষায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবনা ছিল। গ্রীণ সী ওয়াল নির্মাণের মধ্য দিয়ে শোরলাইন বরাবর স্থীর থাকা। সৈকতের দেশভাগে গ্রীণ সী ওয়ালের ওপর দিয়ে পর্যটকরা হাঁটাচলা করা। সী ওয়ালের ওপর ঘাস লাগানো। পরিবেশ বান্ধব। দৃষ্টিনন্দন। পর্যটক-দর্শনার্থীরা পেত সী ওয়ালে বসে সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ। সী ওয়ালটি অবস্থান ভেদে ২১ মিটার প্রস্থ এবং দুই-আড়াই মিটার উচু করার পরিকল্পনা ছিল। গ্রীণ সী ওয়ালের সামনের দিকে উত্তাল ঢেউয়ের তান্ডব ঠেকাতে নির্দিষ্ট এলাইনমেন্ট বরাবর সাগরের অন্তত তিন মিটার গভীর তলদেশে জিও টিউব বসানো। যার ফলে পলি জমে বীচের পরিধি আরও বাড়ত। প্রশস্ত হতো। জিওটিউবটি এমনভাবে বসানোর পরিকল্পনা ছিল যে জোয়ারের সময় এটি পানির নিচে থাকতো। পর্যটকের দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতো না। জিও টিউবের ওপর দিয়ে সহজেই নৌকাসহ জলযান সাগর অভ্যন্তর থেকে বেলাভূমে ভিড়তে পারতো। সৈকতের ভাঙ্গন রোধে এবং পূর্বের প্রশস্ততা ফিরে আনার জন্য এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল বলে পাউবোসুত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দুই থেকে আড়াই মিটার উচ্চতার টপে প্রস্থ তিন মিটার। নিচে প্রস্থ প্রায় ১৪ মিটার থাকার প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু এ প্রকল্পটি অনুমোদন এখনও মেলেনি। কিংবা সৈকত রক্ষায় বিকল্প কোন উদ্যোগ এ বছর এখন পর্যন্ত নেয়া হয়নি।

 

কুয়াকাটা পৌর মেয়র ও সী বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য আ. বারেক মোল্লা বলেন, পর্যটকদের স্বার্থে পাবলিক টয়লেটটি রক্ষার জন্য বালুর বস্তা এবং ইট সুরকি দিয়ে রক্ষার চেষ্টা চলছে। পৌর সভার উদ্যোগে কোরবানীর পর জিও পাইপে বালু ঢুকিয়ে স্বল্প পরিসরে সৈকত রক্ষা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুরো সৈকত রক্ষার উদ্যোগ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় গ্রহন করলে কুয়াকাটার জন্য এবং পর্যটকদের জন্য সুবিধা হবে।
হোটেল-মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ জানান, ২০০৪ সাল থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। এ প্রকল্পটি কুয়াকাটার উন্নয়নে বহুল কাঙ্খিত ছিল। এখন অনিশ্চিয়তার কারণে আমরা শঙ্কিত রয়েছি। তার ওপর এখন উত্তাল সমুদ্রের ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত হয়েপরেছে সৈকত ও সেখানকার শত শত ব্যবসায়িরা।

 

এব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ড. মোঃ মাছুমুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, কুয়াকাটা সৈকতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ট্যুরিজম পার্ক এলাকাসহ পর্যায়ক্রমে সৈকতের বেলাভূমি ঢেউয়ের তোড়ে বিলীন রোধে অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকা জরুরি প্রটেকশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই এর কাজ শুরু হবে।

 

 

সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কুয়াকাটার উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সকল পদক্ষেপ নিয়েছেন। যার বাস্তবায়ন চলছে। এনিয়ে কারও শঙ্কার কিছুই নেই।’ তবে এখানকার মানুষ কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।