বাড়ছে নারী ধূমপায়ী ! শীর্ষে বাংলাদেশ

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:২৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৮ | আপডেট: ১০:২৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৮
বাড়ছে নারী ধূমপায়ী ! শীর্ষে বাংলাদেশ

এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ ধূমপানের জন্য অন্যতম একটি দেশ। এখানে ধূমপানে অভ্যস্ত নেই এমন পুরুষ হাতে গোনা খুব কম। তাই বলে নারীর যে ধূমপান করে না, তা কিন্তু নয়। তারাও করে তাই বলে একেবারে নারী ধূমপায়ীর তালিকায় যে বিশ্বে বাংলাদেশ শীর্ষস্থান দখল করবে তা হয়তো কেউ ভাবেও নি। তবে এমনটাই ঘটেছে।

 

ক্রোয়েশিয়া ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া। পোল্যান্ড এবং রোমানিয়া এই তালিকায় ক্রোয়েশিয়ার আগে অবস্থান করছে।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিবছর শুধুমাত্র ধূমপানের কারণে ক্রোয়েশিয়ার তিন হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া ২২টি ধূমপায়ী দেশের তালিকায় ক্রোয়েশিয়া বিশ্বে সপ্তম। এরপরেই আছে পোল্যান্ড ও রোমানিয়া।

 

ক্রোয়েশিয়া ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রোয়েশিয়ার ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে অন্তত ৩১ শতাংশ নাগরিক ধূমপান করে। এ হিসেবে দিনে প্রত্যেকেই ১৬টি সিগারেট ধূমপান করে। এজন্য প্রতিমাসে মাথাপিছু ৭০ ইউরো দরকার হয় তাদের।

 

ধূমপানে অনেক ক্ষতি জেনেও মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মরণব্যাধি এই জিনিসটাকে কেউ ছাড়তে পারে না। আমাদের নিজেদের এই ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত।

প্রথমে ফ্যাশন, পরে আসক্তি

দুপুর আড়াইটা। প্রচণ্ড তাপদাহে অতিষ্ট মানুষ। একটু ছায়া পেতে অনেকেই ঢুকছেন রাজধানীর শাহবাগের ছবির হাটে। চল্লিশোর্ধ্ব এক নারীও গেলেন সেখানে। পুরো বাঙালিয়ানা সাজ। পরনে হলুদ শাড়ি, কপালে সুন্দর লাল টিপ, হাতে চুড়ি।

সঙ্গে রয়েছেন তার আরো দু’জন বন্ধু। হেঁটে খানিকটা সামনে গিয়ে তিনজনে দাঁড়ালেন একটি গাছের নিচে।

খানিকক্ষণ পরে সিগারেট ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনলেন সিগারেট। বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে ধরালেন। বাঙালিয়ানার রূপটা মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেলো সিগারেটের জ্বলন্ত আগুনে।

এটি ছবির হাট বা পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খুব পরিচিত দৃশ্য বলে জানান এখানে নিয়মিত আসা লোকজন।

প্রতিদিন অসংখ্য নারীকে এসব এলাকায় ধূমপান করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে আছেন একদম নিম্ন শ্রেণী থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চ পর্যায়ের নারীরাও। এক সময় এ নারীরা তাদের ছেলে বন্ধুদের দিয়ে সিগারেট কেনালেও এখন নিজেরাই সে কাজটিও করেন সহজেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তরুণী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম বছর হলে সিট না পাওয়ায় আজিমপুর কলোনি এলাকায় একই অনুষদের সিনিয়র দুই মেয়ের সঙ্গে বাসা ভাড়া নেন। তাদেরই একজন ছিলেন ধূমপায়ী। রুমমেটের বেশ স্টাইল করে সিগারেট খাওয়া দেখে শখ হয় তারও। ফ্যাশনেবল মেয়েরাই সিগারেট খান। ফ্যাশনটা ঝালাই করতেই প্রথমে তার সিগারেট খাওয়া। পরে ধীরে ধীরে সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি।

জানা গেছে, রাজধানীর নারী তরুণ ধূমপায়ীদের বেশিরভাগই প্রথমে স্ট্যাটাস রক্ষার্থে ফ্যাশনের অংশ হিসেবে সিগারেট খাওয়া শুরু করেন। যা পরে আসক্তিতে পরিণত হয়। ধূমপান থেকে নানা ধরনের মরণনেশায়ও আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনেক নারী।

অন্যদিকে ধূমপানের সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র অনেক নারী সিগারেট বিক্রিতেও জড়িয়ে পড়ছেন। তাদেরই একজন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফেরি করে সিগারেট বিক্রেতা আছিয়া জানান, সিগারেটে মুনাফা বেশি হয়। তাই তিনি তা বিক্রি করেন।

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ধূমপায়ী নারীর বন্ধ্যা হওয়ার আশঙ্কা ৬০ শতাংশেরও বেশি। তামাকের সঙ্গে গর্ভপাতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং ভ্রূণের স্বাস্থ্য সমস্যারও সৃষ্টি করে ধূমপান। এটি নিউরাল টিউব ডিফেক্টের ঝুঁকি কিছুটা বাড়ায়। ফুসফুসে ক্যান্সারেরও অন্যতম কারণ এই ধূমপান।

সিগারেট খেকেই এক সময় নারী ধূমপায়ীরা গাঁজা, মদ, হেরোইনের মতো নেশায় আসক্ত হন বলে জানান অন্য এক তরুণী।  ছবির হাটে সিগারেটে টান দিতে দিতে তিনি বলেন, ‘এটি সিগারেট নয়। সিগারেটের শলাকায় গাঁজা ভরা আছে। এই ছবির হাটের বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকানে ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা দিলেই পাওয়া যায়। এক সময় শুধু সিগারেট খেতাম, তাও বন্ধুরা খেতো বলে। কিছুদিন পর তাদের সঙ্গে গাঁজা খাওয়া শুরু করলাম। এখন নিয়মিত গাঁজা খাই, নেশা হয়ে গেছে। চাইলেও আর ছাড়তে পারছি না’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূমপায়ী শিক্ষার্থীর ২৪% নারী!

রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোর বিভিন্ন রেস্তোরাঁর স্মোকিং জোন, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় অহরহ চোখে পড়ছে বিভিন্ন বয়সের নারীদের ধূমপানের দৃশ্য। বিভিন্ন এলাকার ছাত্রীনিবাসের আশপাশেও দেখা যাচ্ছে এমন দৃশ্য। ধানমণ্ডি ও গুলশান লেক কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উঠতি বয়সী অনেক নারীকেই দেখা যায় প্রকাশ্যে ধূমপান করতে। তাদের অনেকের পরনেই থাকে স্কুলের পোশাক। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রধারী।

ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে সাম্পান রেস্তোরাঁর খোলা উদ্যানে প্রায় সারা দিনই বিভিন্ন বয়সের পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ধূমপান করতে দেখা যায়। আর স্কুল-কলেজ খোলা থাকার সময়ে ওই এলাকার লেকেরপাড়ে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি থাকে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স ক্যাফের এক কর্মী বলেন, ‘আমাদের স্মোকিং জোনে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আগতদের বড় একটি অংশই থাকে নারীরা। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী যেমন আছে, তেমনই আছে মধ্যবয়সী অনেক নারীও। দিনে দিনে এখানে নারী ধূমপায়ীর উপস্থিতি বাড়ছে।’ বনানীর কিংস কনফেকশনারি কিংবা ধানমণ্ডির ক্রিমসন কাপ ক্যাফের স্মোকিং জোনেও একই চিত্র বলে জানান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ধূমপান নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই ক্ষতিকর। তবে জিনগত কারণে নারী ধূমপায়ীর বিপদ তুলনামূলক অনেক বেশি এবং প্রতিক্রিয়াও ঘটে দ্রুততর সময়ে। সন্তান ধারণে জটিলতা ও সন্তানের জীবনও হয়ে ওঠে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। ধূমপায়ী নারীর সন্তান গর্ভ থেকেই নানা ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে।

বাংলাদেশ অবস অ্যান্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধূমপানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোকের মতো রোগের বিপদ বেশি। তবে নারী ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিপদ হিসেবে আসে জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি, প্রজননতন্ত্রে সমস্যা, গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতা, সন্তান ধারণে প্রতিবন্ধকতা, সন্তানের জন্মগত ত্রুটির মতো বিষয়গুলো। এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে মেনোপজের পর হাড়ের ক্ষয় অন্যদের চেয়ে ধূমপায়ী নারীদের বেশি হয়। এ অবস্থায় নারীদের ধূমপান থেকে বিরত করতে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে আরো দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের নারীদের রক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।’

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন বলেন, ‘পুরুষের তুলনায় এমনিতেই নারীদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। ফলে ধূমপায়ী নারীদের জন্য এ সমস্যা আরো প্রকট হয়। ধূমপায়ী নারীদের চিকিৎসাও অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রধানত ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি। পাশাপাশি নারীদের জরায়ু, খাদ্যনালি, মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি পুরুষের তুলনায় বেশি থাকে। এককথায় বলা যায়, দেশে নারী ধূমপায়ী বেড়ে যাওয়াটা এক অশনিসংকেত।’

বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রগ্রাম-বিসিসিপি, বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক ও জন হপকিংস বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় দেশে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ধূমপানসহ তামাক ব্যবহারের নানা চিত্র উঠে এসেছে। ওই কার্যক্রমের আওতায় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাক সেবনের প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভিসি অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন আহসান।

গবেষণার ফল জানিয়ে অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪২ শতাংশ পেয়েছি তামাকসেবী। এদের মধ্যে ১ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করে। বাকি ৪১ শতাংশই ধূমপায়ী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই ৪১ শতাংশের ভেতর ২৪ শতাংই নারী। বাকি ৭৬ শতাংশ পুরুষ। এখানে সংখ্যায় নারীদের চেয়ে পুরুষ ধূমপায়ী অনেক বেশি হলেও ঝুঁকি বিবেচনায় ওই ২৪ শতাংশ নারীর তথ্য খুবই বিপজ্জনক।’

ড. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের রক্ষায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা রাখা দরকার। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ধূমপানের ব্যাপারে পরিবারেও বাড়তি নজরদারি রাখা উচিত।’