অ্যাজমা বা হাঁপানি কি, লক্ষন ও চিকিৎসা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৮ | আপডেট: ১১:৩৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৮
অ্যাজমা বা হাঁপানি কি, লক্ষন ও চিকিৎসা

হাঁপানি একটি শ্বাসকষ্ট সম্বলিত রোগ। কার্যতঃ এটি শ্বাসনালীর অসুখ। এর ইংরেজি নাম অ্যাজমা যা এসেছে গ্রিক শব্দ Asthma থেকে। বাংলায় হাঁপানি। যার অর্থ হাঁপান বা হাঁ-করে শ্বাস নেয়া। হাঁপানি বলতে আমরা বুঝি শ্বাসপথে বায়ু চলাচলে বাধা সৃষ্টির জন্য শ্বাসকষ্ট (Dyspnoea) । সারা বিশ্বের প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ আ্যাজমা বা হাঁপানীতে আক্রান্ত হন। [১] বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫০ হাজার লোক এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং মাত্র পাঁচ শাতংশ রোগী চিকিৎসা লাভ করে।

হাঁপানি কেন হয়? এবং হাঁপানি রোগের লক্ষণসমূহ

হাঁপানি রোগের কারণ এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি এবং এ রোগের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণকেও এককভাবে দায়ী করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে বংশগত বা পরিবেশগত কারণে এ রোগ হতে পারে। কারও নিকটাত্মীয় যদি এ রোগে আক্রান্ত থাকে অথবা কারও যদি বিভিন্ন দ্রব্যের প্রতি অতিমাত্রায় অ্যালার্জি থাকে, তাহলে তার এ রোগ হতে পারে। এ ছাড়াও শ্বাসনালি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হলে এ রোগ হতে পারে।

অ্যাজমা বা হাঁপানি হওয়ার কোন নির্দিষ্ট বয়স নেই। এটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগও নয়। প্রদাহের ফলে শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, ফলস্বরূপ ঘন ঘন কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা হওয়া, শোঁ শোঁ আওয়াজ, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া বা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সঠিকভাবে ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নিলে অনেক সময় এ রোগে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ধুলোবালির মধ্যে থাকা মাইট নামক একধরনের ক্ষুদ্র কীট, ফুলের পরাগরেণু, পাখির পালক, ছত্রাক, ইস্ট এবং সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে থাকেন তাদের এ রোগ হতে পারে। ধূমপান শুধু শ্বাসকষ্টের অন্যতম কারণই নয়, বহুক্ষেত্রে এটা হাঁপানির তীব্রতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়, হাঁপানির ঔষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ধূমপান ফুসফুসের কার্যক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ীভাবে কমিয়ে দেয়।

পেশাগত কারণেও কখনো কখনো এ রোগটি হতে পারে। কিছু উত্তেজক উপাদান (যেমন- শ্বাসনালির সংক্রমণ, অ্যালার্জি জাতীয় কোন বস্তুর সংস্পর্শ, ধুলা, বায়ুদূষণ, সিগারেটের ধোঁয়া ইত্যাদি) অনেক সময় অতি সংবেদনশীল রোগীর শ্বাসকষ্টের কারন হতে পারে।

কিছু ওষুধ, যেমন বিটা ব্লকার (উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য এ ওষুধটি ব্যাবহার করা হয়), এন এস এ আই ডি (ব্যথা নিরাময়ের জন্য ব্যাবহার করা হয়), এসপিরিন ইত্যাদি ওষুধের কারনেও হাঁপানি হতে পারে।

মানসিক চাপও অনেক ক্ষেত্রে হাঁপানির তীব্রতা বাড়াতে পারে।

কারও কারও গরুর মাংস, চিংড়ি মাছ, ইলিশ মাছ, হাঁসের ডিম, পুঁইশাক, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, ইত্যাদি খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা আছে, খেলে চুলকায় অথবা নাক দিয়ে পানি পড়ে। তবে সাধারনভাবে খাবারের মাধ্যমে যে অ্যালার্জি হয় তাতে খুব কম সংখ্যক মানুষেরই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কারও কারও আবার নানান রকম সুগন্ধি, মশার কয়েল বা কীটনাশকের গন্ধের কারনেও শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

হাঁপানি বা অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে করনীয়

গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট অ্যাজমা (জি আই এন এ) একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন, যারা অ্যাজমা নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। জি আই এন এ’র  উদ্যোগ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার সহযোগিতায় ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার সাধারণ মানুষ ও অ্যাজমা রোগীদের মধ্যে এ রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি বিশেষ মর্যাদায় শোভাযাত্রা, পোস্টার, সেমিনার, অ্যাজমা রোগীদের সাথে মতবিনিময়, অ্যাজমা রোগের সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারন মানুষকে সচেতন করা এবং অ্যাজমা রোগ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হয়ে থাকে। হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রোগীর ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগী একটু সতর্ক হলে খুব সহজেই নিজের হাঁপানি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। একজন রোগীর তার রোগ, ওষুধপত্র, উত্তেজক দ্রব্য ও খাবার, ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ইনহেলারের কাজ ও ব্যাবহার ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিকভাবে ধারণা থাকলে খুব সহজেই হাঁপানির উপসর্গগুলো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

চিকিৎসা

হাঁপানির চিকিৎসায় নানান ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়, যেমন—রোগ উপশমকারী ওষুধ, রোগ প্রতিরোধ বা বাধাপ্রদানকারী ওষুধ। এ ওষুধগুলো সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকার পাশাপাশি কীভাবে কাজ করে, সঠিক মাত্রা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও ভাল ধারনা থাকতে হবে।

হাঁপানি সম্পূর্ণভাবে ভালো করার এখনো কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবে সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে এ রোগ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারেন।

হাঁপানি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন না করতে পারলে তা মারাত্মক হতে পারে এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে কোন কোন উপসর্গে রোগীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সব রোগীর রোগের উপসর্গ কমা বা বাড়ার ব্যাপারে একই উত্তেজক দায়ী নয়। সঠিক চিকিৎসা ও হাঁপানির ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সম্পূর্ণ সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব।

অ্যাজমা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর

শ্বাসকষ্ট মানেই কি অ্যাজমা?

শ্বাসকষ্ট মানেই কিন্তু অ্যাজমা নয়। অ্যাজমা ছাড়াও আরও নানান কারণে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যেমন- হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট হতে পারে, যাদের রক্তশূন্যতা আছে, তাদের হতে পারে এছাড়াও কিডনি রোগের ক্ষেত্রেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

সব খাবারে কি সবারই অ্যালার্জি হতে পারে?

ব্যক্তিভেদে বিশেষ খাবারে অ্যাজমা হতে পারে। যেমন- গরুর মাংস কারও কারও ক্ষেত্রে অ্যাজমার তীব্রতা বৃদ্ধি করলেও সবার ক্ষেত্রে একই রকমের সমস্যা হয় না। একইভাবে চিংড়ি মাছ কারও কারও ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করলেও আরেকজনের ক্ষেত্রে হয়তো কিছুই হয় না, আবার এমনও হতে পারে, গরুর মাংস অথবা চিংড়ি মাছ খেলে কিছুই হয় না কিন্তু বেগুন খেলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন খাবারের প্রতি অ্যালার্জি থাকতে পারে।

অ্যাজমা ছোঁয়াচে রোগ কিনা?

অ্যাজমা ছোঁয়াচে রোগ নয়। বংশগতভাবে অর্থাৎ বংশে কারও অ্যাজমা থাকলে বংশধরদের ভেতর এই রোগ হতে পারে।

বুকের দুধ খেলে শিশুর অ্যাজমা হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা?

আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ খেলে শিশুর অ্যাজমা হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই এবং মায়ের সংস্পর্শেও অ্যাজমা হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই।

অ্যাজমা বা হাঁপানি কি সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য?

অ্যাজমা সম্পূর্ণভাবে ভালো হয় না। তবে এখন অ্যাজমার অনেক আধুনিক চিকিৎসা আছে, অর্থাৎ সঠিকভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করলে একজন অ্যাজমা রোগী প্রায় সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারবে।

ইনহেলার ব্যবহার কখন করবেন?

ইনহেলার দিয়েই প্রথমে চিকিৎসা শুরু হয়। কারন ইনহেলার দেওয়ার দু-তিন মিনিটের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট আর থাকে না। যদিও অনেকের ধারনা সর্বশেষ ওষুধ হিসেবে ইনহেলার ব্যাবহার করা হয় অর্থাৎ ট্যাবলেট, সিরাপ অথবা ক্যাপসুল সবই যখন ব্যর্থ তখন অ্যাজমার চিকিৎসায় ইনহেলার ব্যাবহার করা হয় কিন্তু কথাটা মোটেও সত্য নয়।

সবশেষে

পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে অ্যাজমার চিকিৎসা করা যাচ্ছে কিন্তু সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে যে, এমন কিছু ওষুধ নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করা হচ্ছে, যার ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অ্যাজমা রোগ পুরোপুরিভাবে দূর করা সম্ভব হবে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাজমা তৈরিকারী দ্রব্যসমূহ শ্বাসনালির টিস্যুতে গিয়ে সি এ এস আর কে কার্যকরি করে তোলে এবং এর ফলস্বরূপ অ্যাজমার লক্ষণসমূহ যেমন প্রদাহ এবং শ্বাসনালি সরু হয়ে যাওয়া প্রকাশ পায়। ক্যালসিলাইটিস সরাসরি ফুসফুসে ব্যবহার করলে এটি অ্যাজমার লক্ষণ অনেকাংশে হ্রাস করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা সফল হলে সি ও পি ডি’র মতো ফুসফুসের অনেক কঠিন রোগও নিরাময় করা সম্ভব হবে। এমনকি ২০২০ সালের মধ্যে অ্যাজমা বা হাঁপানির মতো বড় একটি রোগকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে।