উপেক্ষিত ইসির নির্দেশনা, নির্বাচনী আচরণ বিধি লংঘনের হিড়িক

বরিশাল সিটি নির্বাচন

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:০১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০১৮ | আপডেট: ৩:৪০:অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০১৮

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে বরিশাল সিটি নির্বাচনের প্রার্থীদের অনেকেরই বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লংঘন করে আগাম প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মেয়র প্রার্থীদের কৌশলী প্রচারণা চোখে পড়ার মতো। তবুও নিশ্চুপ রয়েছে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বরিশাল সিটি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে প্রতীক বরাদ্দের আগে কোন ধরনের প্রচার-প্রচারণায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিষেধাজ্ঞা নির্দেশনা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে জোরদার তদারকি করতে না পারলে এমন আচরণবিধি কেন প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন? প্রশ্ন সচেতন মহলের।

Image may contain: one or more people and people standing

সূত্রে প্রকাশ, আগামী ৩০ জুলাই প্রথমবারের মত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বরিশাল সিটি নির্বাচন।  ৯ জুলাই মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং পরদিন ১০ জুলাই প্রতীক বরাদ্দের পর মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটযুদ্ধে নামার কথা ছিল। কিন্তু বরিশালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৭ মেয়র প্রার্থী কর্মীসভা, মতবিনিময় এবং গনসংযোগের আড়ালে প্রতিদিন প্রচারনা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পিছিয়ে নেই কাউন্সিলর প্রাথীরাও।

বরিশাল সিটি নির্বাচনে এখন পর্যন্ত মাঠে রয়েছেন ৭ জন মেয়র, ১১২জন কাউন্সিলর ও ৩৭ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী।

সব দল ও সকল প্রার্থীর জন্য সমসুযোগ অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করনেই এ উদ্যোগ বলে জানিয়েছিলেন ইসি সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ। তাই প্রচার-প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছিল।

শুরুও দিকটায় মেয়র প্রার্থীরা বিশেষ করে আ’লীগের সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ও বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার কৌশলীভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘরোয়া বৈঠকে নির্বাচনী প্রচারণার দিকনির্দেশনা ও সৌজন্য সাক্ষাতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছিলেন।

তবে অনুমতিবিহীন ঘরোয়া বৈঠকেও ছিল নিষেধাজ্ঞা।

এমন পরিস্থিতির মাঝেই অভিযোগ উঠেছিল বাসদের মেয়রপ্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী নির্বাচনী আচরণ বিধি ভেঙে গণসংযোগ চলাচ্ছে। যা নিয়ে গত ৫ জুলাই দৈনিক সময়ের বার্তায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

Image may contain: 1 person, sitting

এখন শুধু মনীষা একাই নন নির্বাচনী আচরণ বিধি ভেঙে শনিবার ও রোববার প্রকাশ্যে গণসংযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও বিএনপি মনোনীত মজিবর রহমান সরোয়ার।

সংশ্লিস্ট এলাকার ভোটার ও প্রার্থীদের নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, মেয়র প্রার্থীরা গনসংযোগকালে চাইছেন দোয়া। গনসংযোগের আড়ালে প্রকারান্তরে তাদের দলীয় প্রতীকে ভোট চেয়েছেন। কর্মীসভায়ও দলের প্রতীকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহবান জানানো হচ্ছে।

বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ রোববার সকালে নগরীর প্রধান ডাকঘর, রেজিস্ট্রি অফিস, গণপূর্ত বিভাগ, কালেক্টরেট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ চালান।

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন- বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম জাহাঙ্গীর, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ (বীর বিক্রম) প্রমুখ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রোববার সকালে মেয়র প্রার্থী সাদিক ভোটারদের খোঁজখবর নেন। মেয়র প্রার্থী সাদিক যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই ভিড় জমছে সাধারণ মানুষের।

গত শনিবার নগরীর মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কীর্তনখোলা নদীর দক্ষিনপ্রান্তে অবস্থিত সুবিধা বঞ্চিত চরজাগুয়া এলাকায় গনসংযোগ করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ্। এ সময় সাদিক ওই এলাকার মানুষের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার কথা শোনেন এবং নির্বাচিত হলে সেগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

এ সময় তার সঙ্গী ছিলেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম তোতা, দলের মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, সাধারন সম্পাদক একেএম জাহাঙ্গীর, সহ-সভাপতি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু এবং মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ বীর বিক্রম সহ অন্যান্যরা।

তবে মেয়র প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার কথা সরাসরি স্বীকার না করে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও দলের মেয়র প্রার্থীর মুখপাত্র অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, গনসংযোগ করার ক্ষেত্রে কোন আইনী বাধ্যবাধকতা নেই। তাদের প্রার্থী জনগনের সমস্যার কথা শুনেছেন এবং দোয়া চেয়েছেন মাত্র।

অন্যদিকে, বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার রোববার সকাল থেকে আদালত পাড়া, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সিঅ্যান্ডবি রোডসহ বিভিন্ন সড়কে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে গণসংযোগ করেন। পরে সিঅ্যান্ডবি সড়কে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পশ্চিম কাউনিয়ার নিজ বাসভবনে বিকেলে যুবদল ও সন্ধ্যায় ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতিসভা করেন সরোয়ার।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার গণসংযোগকালে সরোয়ারের সঙ্গে অনেক নেতাকর্মী ছিলেন। তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

গত শনিবার  সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা অফিসে গনসংযোগ এবং মতবিনিময় করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার। বিকেলে তিনি নগরীর পশ্চিম কাউনিয়ার নিজ বাস ভবনে ১৫ নম্বর এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতৃবৃন্দের সাথে ঘরোয়া বৈঠক করেন।

Image may contain: 7 people, people sitting, table and indoor

জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির সহকারী সম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিন বলেন, মজিবর রহমান সরোয়ার যেখানেই যান সেখানেই সাধারণ মানুষ ভিড় করেন। তিনি উপস্থিত জনগণের সঙ্গে ‘হাই-হ্যালো’ করেছেন মাত্র।তাদের মেয়র প্রার্থী এর আগেও ৫ বার সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং একবার সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনী আচরনবিধি সম্পর্কে তিনি ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল আছেন। আচরনবিধি মেনেই তাদের মেয়র প্রার্থী কর্মীসভাসহ গনসংযোগ করছেন বলে তার দাবি।

অপরদিকে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত নগরীর অক্সফোর্ড মিশন রোডের নিজ বাসভবনে সুধীজনসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং ভোট কেন্দ্রভত্তিক জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সাথে ঘরোয়া বৈঠক করেন।

Image may contain: 9 people, text

জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের প্রধান সমন্বয়ক জাপা নেতা অধ্যাপক মহসিন-উল-ইসলাম হাবুল বলেন, তাদের প্রার্থী ধারাবাহিকভাবে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে গনসংযোগ এবং কর্মীসভা করছেন। এতে তারা কোন আইন ভঙ্গ করছেন না।

এছাড়া প্রথা ভাঙার নির্বাচন ও গণমানুষের মেয়র প্রার্থী স্বঘোষিত দাবিদার বাসদের ডা. মনিষা চক্রবর্তী, কমিউনিস্ট পার্টির মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট একে আজাদ এবং ইসলামী শাসনতন্ত্রের প্রার্থী ওবায়দুর রহমান মাহবুবও গতকাল নগরীর বিভিন্ন স্থানে গনসংযোগ করে ভোট প্রার্থনা করেছেন বলে জানা গেছে।

শুধু মেয়র পদ প্রার্থীরাই নন, ৩০টি সাধারন ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্ধি ১১২ এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৭ জন প্রার্থী গত কয়েক দিনের মতো গতকালও স্ব-স্ব ওয়ার্ডে গনসংযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্ট ওয়ার্ডেও ভোটাররা।

নিয়ম বর্হিভূত প্রচারণার বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, মেয়র প্রার্থীরা আচরন বিধি লংঘন করে প্রচারনা চালাচ্ছেন বলে তার কাছেও খবর রয়েছে। কিন্তু কেউ যদি প্রার্থীদের প্রচারনার খবর আগেভাগে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে অবহিত করেন, তাহলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তাৎক্ষনিক প্রচারণার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়না। এতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

তারপরও আগামী ১০ জুলাই প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার সময় মেয়রসহ সকল প্রার্থীকে যথাযথভাবে নির্বাচনী আচরনবিধি অনুসরন করার তাগিদ দেওয়া হবে তিনি জানান। এরপরও কেউ আচরণবিধি ভাঙলে সংশ্লিস্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলে হুশিয়ারি দেন এই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।