গুহায় আটকে পড়া কিশোরদের আবেগমাখা চিঠি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০১৮ | আপডেট: ১০:৪৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০১৮

থাইল্যান্ডের পাহাড়ের গুহায় আটকে পরা কিশোর ফুটবল দলটি উদ্ধারকারীদের সহায়তায় চিরকূট পাঠিয়েছে তাদের বাবা-মার কাছে। আর মৃত্যুর মুখে আটকে পড়া কিশোরদের আবেগঘন এই চিরকূটগুলো প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিশ্ব মিডিয়ায়।

দুই সপ্তাহ আগে কিশোরদের ওই ফুটবল দলটি একটি পাহাড়ের গুহা দেখতে যাওয়ার পর বাইরে পানি বেড়ে যাওয়ায় তারা সেখানে আটকে পড়ে। দলটির সাথে আছে তাদের কোচ এক্কাপল চান্তাওং। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তাদের খুঁজে পাওয়া গেলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এখনো। উদ্ধারকারীরা বলছে, কয়েক মাস সময় লাগতে পারে তাদের নিরাপদে উদ্ধার করে আনতে। উদ্ধারকারীদের সহায়তায় সেই কিশোররা তাদের পরিবারের কাছে হাতে লেখা চিরকূট পাঠিয়েছে। চিরকূটে ফুটে উঠেছে তাদের হৃদয়ের বেদনা, আতঙ্ক আর বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসার কথা। কোচ এক্কাপল অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এই ঘটনার জন্য।

বিউ ডাক নামের এক কিশোর লিখেছে, ‘চিন্তা করো না বাবা ও মা, আমি দুই সপ্তাহ ধরে তোমাদের কাছ থেকে দূরে আছি; কিন্তু আবার ফিরে আসবো। তোমাদের বেচা-কেনায় সাহায্য করবো।’ প্রসঙ্গত ছেলেটির বাবা একজন দোকানদার।
১৫ বছর বয়সী ফিফাত ফোতি চিরকুটে লিখেছে, ‘মা, বাবা ও ছোটভাইয়ের জন্য ভালোবাসা।’ নিক নামে পরিচিত এই কিশোর আরো লিখেছে, ‘আমি এখান থেকে বের হতে পারলে কি আমাকে কাবাব(গ্রিলড পর্ক) ও সবজি খাওয়াবে?’

ফিরাপত ওরফে নাইট তার পরিবারের উদ্দেশ্যে লিখেছে, ‘বাবা, মা ও আদরের ছোট বোন, তোমাদের সবাইকে খুব ভালোবাসি। আমার ব্যাপারে চিন্তা করো না। তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি।’

নিখোঁজ সন্তানের এই চিঠি পরিবারগুলোতে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দুই সপ্তাহ ধরে তারা আটকরা পড়ে আছে এক পাহাড়ের গুহায়। যেখান থেকে উদ্ধার করাও পথটিও বিপজ্জনক। নাইটের মা বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেছে, ‘ওর চিঠি পেয়ে খুব খুশি লাগছে, এটি ওরই হাতের লেখা। আমি এটি পাওয়ার পর থেকেই কাঁদছি। যতদিনই লাগুক অপেক্ষা করতে পারবো, শুধু ওরা যেন নিরাপদে ফিরে আসে’।

আরো পড়ুন :

শিশুদের বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি

“আমি বহু বছর তার খেলাধুলার সঙ্গী ছিলাম। সে ছিল একজন নিংস্বার্থ লোক যে অন্যের উপকার করতে ভালোবাসতো। তার কাজের ব্যাপারেও সে ছিল খুবই নিবেদিতপ্রাণ।” থাইল্যান্ডের চিয়াং রাইয়ে একটি গুহায় আটকে পড়া ১২ জন কিশোর এবং তাদের ফুটবল কোচকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারানো একজন ডুবুরি – ৩৮ বছর বয়স্ক পেটি অফিসার সামান কুনানকে এভাবেই বর্ণনা করছিলেন তার সাবেক সহকর্মী এবং বন্ধুরা।

সামানের কাজ ছিল পাহাড়ি সুড়ঙ্গের ভেতরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অক্সিজেন নিয়ে যাওয়া। ওই গুহা এবং সুড়ঙ্গ এতই দীর্ঘ যে এ কাজটা পর্যায়ক্রমে করতে হয়। সরবরাহ পৌছে দেয়ার পর থাম লুয়াং গুহা থেকে বেরুনোর পাঁচ ঘণ্টার যাত্রার সময় তিনি জ্ঞান হারান।

তার সঙ্গী ডুবুরি তাকে টেনে বের করে নিয়ে আসেন এবং তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি সফল হন নি। মেরিন স্কুলে সামানের সতীর্থ ছিলেন পিও সায়েরি রুয়াংসিরি। তিনি সামানের সাথে নানা রকম দুঃসাহসিক খেলায় অংশ নিয়েছেন। তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “সামান ছিল একজন হাসিখুশি লোক। সে তার কাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিল। আমি সাংবাদিক সম্মেলনের ঘণ্টা দুয়েক আগে খবরটা জানতে পারি। আমি মর্মাহত এবং স্তম্ভিত।

তিনি বলছিলেন, সামান বিবাহিত ছিলেন, তবে কোনো সন্তান ছিল না। বিবিসির সাথে আরো কথা হয় লেফটেন্যান্ট চালোং প্যানপংএর । তিনি একসময় সামানের প্রশিক্ষক ছিলেন।

“আমি যখন ফোনে খবরটা শুনলাম, স্তম্ভিত হয়ে গেলাম” – লেফটেন্যান্ট প্যানপং বলছিলেন, “সে ছিল একজন পাকা এ্যাথলেট। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য।”

“সে আমার ছাত্র ছিল। দুই বছর নন-কমিশন্ড অফিসারদের ট্রেনিং কলেজে ছিল, তার পর গ্রাজুয়েশন শেষে মেরিন স্কুলে যোগ দেয়। সেখানেই আমার সাথে তার পরিচয় হয়। তার পই সে শিখলো কিভাবে ডুবুরির কাজ করতে হয়। এর পর সে নৌবাহিনীর বিশেষ বাহিনীতে কাজ করেছিল।”

“তবে তার পর সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আরো কয়েকজন বন্ধুর সাথে এয়ারপোর্টে কাজ করতে শুরু করে।  তার বাড়ি উত্তরপূর্ব থাইল্যান্ডের ইসানে। দরিদ্র এলাকা। সে তার বন্ধুদের খুব ভালোবাসতো, সবার খোঁজখবর নিতো। তার গায়ে শক্তি ছিল, আর যেসব খেলা কঠিন সেগুলোর প্রতিই তার আকর্ষণ ছিল – যেমন ট্রায়াথলন। তার মধ্যে ছিল দারুণ প্রাণশক্তি” – বলছিলেন লেফটেন্যান্ট প্যানপং।

খেলোয়াড় হিসেবে বেশ কিছু পদকও জিতেছিলেন সামান। তিনি চাকরি করতেন একটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, গুহায় ১৩ জনের আটকা পড়ার ঘটনার পর উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে যে ১৫ জনকে দায়িত্ব দেয়া হয়, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সামান – কারণ তারা সাবেক সৈনিক এবং এধরণের কাজ করার দক্ষতা তাদের ছিল। সেই কাজে গিয়েই মৃত্যু হলো তার।