নিজের টাকায় সরোয়ারের নির্বাচন, সাদিকের বাপ-ভাইয়ের দানে!

প্রকাশিত: ৯:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৮ | আপডেট: ৯:৪৩:অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৮
নিজের টাকায় সরোয়ারের নির্বাচন, সাদিকের বাপ-ভাইয়ের দানে!

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দামামা বেজে ওঠার পর আকাশে বাতাসে এখন কেবলই ভোটের আমেজ। নির্বাচনী বৈতারণী পার করতে চলছে নানা কলাকৌশল। এরইমধ্যে শেষ হয়েছে মনোনয়নপত্র উত্তোলন ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। রাজ্যের ব্যস্ততা নিয়ে চমকপ্রদ প্রচারণায় নামতে এখন কেবলই চলছে প্রতীকের অপেক্ষা। আগামী ১০ জুলাই সেই প্রতীক্ষারও ঘটবে অবসান। হালে আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মেয়র প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় ও সম্পদসহ হলফনামার অজানা সব তথ্য।

মেয়র প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা, আয়কর রিটার্ন এবং ঢ-ফরম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের বেধে দেয়া সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়ের পুরোটাই (১৫ লাখ টাকার) খরচ করবেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী। বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের নির্বাচনী ব্যয় বাবদ ধরা ১৫ লাখ টাকার পুরোটাই তার নিজের।

আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে বাবা ও ভাইয়ের কাছ থেকে দান বাবদ ১১ লাখ টাকা নেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন এবং যা অন্যসব প্রার্থীর থেকে সবথেকে বেশি দান বাবদ প্রাপ্তির অর্থ।

এদিকে নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা ৭ প্রার্থীর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় করবেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস। আর সবচেয়ে কম ব্যয়ের হিসাবটি দিয়েছেন বাসদের প্রার্থী ডা. মনিষা চক্রবর্তী। তবে কোনো প্রার্থীই টেলিভিশন কিংবা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমেও প্রচার-প্রচারণা চালাবেন না।

বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মো. মজিবর রহমান সরওয়ার হলফনামায় নিজস্ব ব্যবসা থেকে ১৫ লাখ টাকা প্রাপ্তির উৎসের কথা জানিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার অংশ হিসেবে ৩ লাখ পোস্টার এবং ৩০টি নির্বাচনী অফিস করবেন সরোয়ার। এছাড়া তিনি লিফলেট ছাপাবেন দেড় লাখ। অফিস আপ্যায়ন কিংবা কর্মীদের পেছনে কোনো রকম টাকা খরচ না করেই ১৫ লাখ টাকার পুরোটা সম্ভাব্য ব্যয়ের খাতে দেখিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহও হলফনামায় ১৫ লাখ টাকা প্রাপ্তির উৎসের কথা জানিয়েছেন। তবে ব্যয়ের খরচে আয়ের থেকে ৪৭ হাজার টাকার সম্ভাব্য খরচ বেশি দেখিয়েছেন তিনি। হলফনামা অনুযায়ী এই মেয়র প্রার্থীর অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে ৪ লাখ আসবে নিজস্ব আয় থেকে। বাকী ১১ লাখ টাকার ৭ লাখ দান বাবদ দেবেন তার বাবা মন্ত্রীর মর্যাদায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক পদে থাকা সংসদ সদস্য আবুলা হাসানাত আব্দুল্লাহ। ৪ লাখ দেবেন তার ছোট ভাই সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ। সাদিক পোস্টার ছাপাবেন ৫০ হাজার পিস, তবে লিফলেট ও হ্যান্ডবিল সবার থেকে বেশি ২ লাখ করে মোট চারলাখ ছাপাবেন। কেন্দ্রীয় অফিসসহ মোট ১১টি নির্বাচনী ক্যাম্প করবেন সাদিক। যেখানে আপ্যায়ন বাবদ
১৮ দিনে ব্যয় করবেন ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে কর্মী বাবদ তারও কোনো টাকা খরচ হবেনা বলে জানিয়েছেন হলফনামায়।

জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন (তাপস) নির্বাচনী মাঠে তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় ১২ লাখ টাকা খরচের কথা হলফনামায় লিখেছেন। ব্যয়ের এ অর্থ নিজস্ব ব্যবসার আয় থেকে খরচ করবেন তিনি।

এদিকে খেলাফত মজলিশের প্রার্থী একেএম মাহবুব আলমের প্রচার প্রচারণায় ৯০ জন কর্মী কাজ করবে বলে ব্যয়ের বিবরণীতে বলা হয়েছে। আর দাখিল করা হলফনামায় নির্বাচনী ব্যয় বাবদ মোট ৭ লাখ টাকা প্রাপ্তির উৎসের কথা জানিয়েছেন তিনি। যারমধ্যে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ের সম্ভাব্য খরচের বিভিন্ন খাতও দেখিয়েছে। হলফনামা অনুযায়ী এই মেয়র প্রার্থীর অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে নিজস্ব আয় অর্থাৎ চাকরির সঞ্চিত অর্থ বাবদ ৫০ হাজার টাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি খেলাফত মজলিসের দলীয় কর্মীরা অর্থাৎ পার্টি থেকে আসবে আড়াইলাখ টাকা। এরবাইরে বরিশাল নগরের নিউ সার্কুলার রোডের বাসিন্দা ও প্রার্থীর ভাই মো. শাহ আলমের কাছ থেকে ধার বা কর্য বাবদ নিবেন ১ লাখ টাকা। আত্মীয়ের বাইরে আরো ১ জনের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ধার বা কর্য বাবদ নিবেন এই প্রার্থী। এছাড়া স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দান হিসেবে প্রাপ্ত সম্ভাব্য অর্থের মধ্যে ঢাকায় বসবাসরত চাকরিজীবী ভাগিনা (আত্মীয়) রাজিবুল হোসেন তালুকদারের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা এবং আত্মীয়ের বাইরে বরিশালের আরো ১ জন ব্যক্তির কাছ থেকে ১ লাখ টাকার কথা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। ফলে ২ লাখ টাকা ২ জনের কাছ থেকে দান বাবদ পাবেন এ মেয়র প্রার্থী।

চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবাইদুর রহমান (মাহবুব)। তার নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে ৫ লাখ টাকা প্রাপ্তির উৎসের কথা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন তিনি। যারমধ্যে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৮শত টাকা ব্যয়ের সম্ভাব্য খরচের বিভিন্ন খাতও দেখিয়েছে। অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে শিক্ষক হিসেবে তার বেতন এবং হাদিয়া বাবদ রয়েছে ১ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তিদের কাছ থেকে দান হিসেবে তিনি পাবেন আরো ৪ লাখ টাকা। নির্বাচনে মোট ১০০ জন কর্মী তার প্রচার প্রচারণায় কাজ করবে বলে তিনি তথ্য দিয়েছেন হলফনামায়।

সিপিবি’র মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ যিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে পেয়েছেন ৮৮৫ ভোট। এবারের নির্বাচনে তার ৪৫ জন কর্মী প্রচার প্রচারণায় কাজ করবেন। তিনি নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য হলফনামায় মোট ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা প্রাপ্তির উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে তার নিজস্ব আইন ব্যবসা থেকে আয় দেখিয়েছেন ৭৫ হাজার টাকা। মামা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আ. খালেক তাকে ধার বা কর্য বাবদ দিবেন ৬০ হাজার টাকা। এছাড়া আত্মীয়ের বাইরে বরিশালের ২ ব্যক্তির কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা ধার বা কর্য বাবদ দেখিয়েছেন। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দান হিসেবে প্রাপ্ত সম্ভাব্য অর্থের মধ্যে পটুয়াখালীর গলাচিপায় থাকা মামাতো ভাই (আত্মীয়) ইলিয়াস হাওলাদারের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং আত্মীয়ের বাইরে বরিশালের ২ জন ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকার কথা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। ফলে ৫০ হাজার টাকা ৩ জনের কাছ থেকে দান বাবদ পাবেন এ মেয়র প্রার্থী। এর বাইরে পার্টি তহবিল থেকে আসবে ৫০ হাজার টাকা।

নির্বাচনে সবচেয়ে কম অর্থের কথা উল্লেখ করেছেন বাসদ’র মেয়র প্রার্থী ডাঃ মনিষা চক্রবর্তী। তিনি হলফনামায় মোট ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা প্রাপ্তির উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। যারমধ্যে ১ লাখ টাকা তার নিজস্ব আয়। এছাড়া মামা রবিন্দ্রনাথ মূখার্জী এবং ভাই সৌমিত্র শর্মার কাছ থেকে দান বাবদ পাবেন ৫০ হাজার টাকা। আত্মীয়ের বাহিরে দুই ব্যক্তি ডা. মঈন আহম্মেদ এবং মোস্তাফিজুর রহমান আরো ৫০ হাজার টাকা দেবেন তাকে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিভিন্ন ব্যাক্তি এবং প্রতিষ্ঠান থেকে সংগৃহীত (গনচাঁদা) ৪৫ হাজার টাকা। আর সম্ভাব্য ব্যয়ের খাতে ২ লাখ ৩৩ হাজার টাকার কথা উল্লেখও করেছেন।