নির্যাতনের নির্মম ভয়াবহতায় মানুষের মমত্ববোধের মৌলিক বৈশিষ্ট্য পাল্টে যাচ্ছে

মন্তব্য প্রতিবেদন

এম. আর. প্রিন্স এম. আর. প্রিন্স

সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব

প্রকাশিত: ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৭ | আপডেট: ১:২৭:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৭
নির্যাতনের নির্মম ভয়াবহতায় মানুষের মমত্ববোধের মৌলিক বৈশিষ্ট্য পাল্টে যাচ্ছে

বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অনেক ভূমিকা রয়েছে যা নারী নির্যাতন নিয়ে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপে উঠে এসেছে । কিন্তু ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি । স্বামীর মাধ্যমেই কোননা কোন সময়ে বিভিন্ন ভাবে দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ।নারী নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছেন । প্রায় প্রত্যেকের জরিপেই দেখা যায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্য বিবাহ, যৌতুক, পরকিয়া, বয়সের ব্যবধান, নেশা, মতের অমিল সহ পারিবারিক নানা জটিলতার কারনে নারী নির্যাতন বাড়ছেই । এবং এ নির্যাতনের ভয়াবহতা এতটাই প্রকট যে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মমত্ববোধের মৌলিক বৈশিষ্ট্যই পাল্টে যাচ্ছে এবং সমাজ ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব বিস্তার করছে । সাম্প্রতিক হিস্রতার ঘটনাগুলি শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয় পুরুষ এবং শিশুদের ক্ষেত্রেও ঘটছে । হত্যার ধরন খুবই ভয়ানক । শরীর থেকে মাথা ও হাত পা বিচ্ছিন্ন এবং শরীরটাকেও বিকৃত ভাবে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে । যৌবনের সুদৃঢ় চেতনা আজ ভিন্ন রকম । এক সময় ছিল অন্যরকম । কিন্তু আজ ? কোথায় স্বাধীনতার সুদৃঢ় চাঞ্চল্য ? চেতনার ব্যবসা চলছে । মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্ত চলছে । প্রতিবাদ নেই । সারা জাতির বিবেক যেন ইয়াবা খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছে কেউ । ভাবনার জগৎ সুন্দর না হলে এগুলো চলতেই থাকবে ।

গত কিছুদিন আগে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বহরমপুর ইউনিয়নে এক পাষন্ড স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা যৌতুকের দাবীতে গৃহবধু তানিয়া (২০) কে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেছে । ১১ই নভেম্বর শনিবার রাতে নির্যাতিতার বাবা এ ঘটনায় দশমিনা থানায় নারী ও শিশু আইনের ১১(ক)৪(১)এর সংশোধিত ৩০ ধারায় মামলা করেছেন । স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র এবং দশমিনা থানা থেকে জানা যায়, দশমিনা উপজেলার বহরমপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মালেক শরীফের মেয়ে তানিয়া বেগমের (২০) সাথে ৪নং ওয়ার্ডের মালেক মুন্সীর ছেলে ইব্রাহীম মুন্সীর (২৩)সাথে দুই বছর আগে পারিবারিক ভাবেই আনন্দ আয়োজনে বিয়ে হয় । বিয়ের বেশ কিছুদিন পরেই যৌতুক ও নানা অজুহাতে স্বামী ও শ্বশুর পরিবারের সদস্যরা তানিয়ার উপর নির্মম নির্যাতন শুরু করেন । দাবীকৃত একলক্ষ টাকা যৌতুক না পেয়ে গত ৬ অক্টোবর স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় । এতে শরীরের অধিকাংশ ঝলসে যায় । পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য শ্বশুর বাড়ীর লোকজন প্রথমে পার্শ্ববর্তী উপজেলা বাউফলে হাতুরে কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে অবস্থা আরও সংকটাপন্ন করে তোলে । পরে বরিশাল এবং ঢাকায় নিয়ে কোন উন্নতি না দেখে বাড়ীতে নিয়ে আসে । খবর শুনে তানিয়ার বাবা মা অত্র ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোঃ আনোয়ার হোসেনকে ঘটনাটি জানায় । চেয়ারম্যান বিষয়টি থানায় অবহিত করলে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে গত ১১ নভেম্বর শনিবার রাতে তানিয়াকে উদ্ধার করে দশমিনা থানা সংলগ্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ।  মুমূর্ষ  তানিয়ার শরীরের ৩০ শতাংশ আগুনে ঝলসে গেছে । তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বার্ণ ইউনিটে নেয়ার কথা থাকলেও তার অসহায় বাবা মা অর্থের অভাবে নিতে পারছে না ।

তানিয়ার ৫ মাস বয়সী একটি কণ্যা সন্তান রয়েছে । আগুনে তানিয়ার নাভীর উপরের অংশ সম্পূর্ণ ঝলসে যাওয়ায় শিশুটি বুকের দুধ পান করতে না পারায় ক্ষুধায় কাঁদছে । নাভী থেকে উপরের গলা পর্যন্ত আগুনে সম্পূর্ণ ঝলসে যাওয়ায় তানিয়া বেঁচে গেলেও এই অবুজ শিশুটিকে আর কখনও বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে কিনা সন্দেহ । বিভৎস্য ভাবে আগুন দিয়ে ঝলসে দেয়া মেয়েটির ভবিষৎ ভাবনায় দিনমজুর বাবা মালেক শরীফ ও অসহায় মা মাহিনুর বেগম দিকশূণ্য ভাবলেশহীন । এ রকম অসংখ্য নির্যাতিত তানিয়া ও অসহায় বাবা মা রয়েছে সমাজে । আবার অপধারীরাও রয়েছে । বিচার হীনতা থাকলেই বার বার একই ঘটনার পূর্নাবৃত্তি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক ।

সাম্প্রতিক যৌতুকের জন্য গৃহবধু তানিয়াকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টা

আমরা প্রায়শই আইন শৃংখলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের কাছে শুনি, যে ভাবেই হোক অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল আসামীদের ধরা হবে । আসলেই কি মূল আসামীদের ধরা হয় । আবার ধরলেও সঠিক বিচার হোক এ রকম সদিচ্ছা কয়জনের আছে । দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে যেভাবে পারছে চলছে, স্বার্থসিদ্ধি করছে ।

বর্তমান সময়ের এই অস্থিরতা ও নির্মমতার কারন, না বুঝেই অতি আধুনিকতা কিংবা সামাজিক বৈষম্যের কারনে জীবন যাপনের ভিন্নতা । সামাজিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে দাড়িয়েছে, চোখের সামনে নির্যাতন দেখলেও মানুষ নিরব ভূমিকা পালন করছে । সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েই ভাবছে দায়িত্ব শেষ । দুর্বল আইনের শাসনও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে । ভবিষৎতে সুষ্ঠ ও শান্তিপ্রিয় সমাজ গঠনে সকল চেষ্টা ও কাজগুলো সততার সহিত করা প্রয়োজন ।

বিবাহিত নারীদের যৌন নির্যাতনও বিভিন্ন জরিপে উঠে আসছে । ধারাবাহিক নানা ভাবে নারী নির্যাতনের সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে এ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব হবে না । এ ক্ষেত্রে নারীদেরও অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে । বাংলাদেশের নারীদের জীবনের মান উন্নয়ণ খুবই প্রয়োজন । শিক্ষা, আদর্শ, দায়িত্ববোধ, সতর্কতা সহ আদর্শ জীবনের গুনাবলী সমৃদ্ধ হলে নারী নির্যাতন অনেক কমে আসবে । অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের নারীরাও নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছেন না । স্বামী বা ছেলে বন্ধুর হাতে নির্যাতন বা খুন হচ্ছে । তাই বিশ্ব ব্যাপী নারী বিষয়ক দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন অত্যাবশকীয় হয়ে উঠেছে ।

অন্য একটি জরিপ অনুযায়ী শহরের তুলনায় গ্রামে নারী নির্যাতনের ঘটনা একটু বেশী ঘটে । বয়স অনুযায়ী নির্যাতনের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন ।নির্যাতনের কারনে আত্মহত্যা কিংবা প্রতিশোধের নেশায় অন্যকে হত্যাও কম হচ্ছে না । ১৮ বছরের আগে বিবাহিতদের দেখা যায় পরবর্তীতে নানা কারনে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে । আবার ১৮ বছরের আগের অবিবাহিত টিনএজদেরও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে । বর্তমান সামাজিক কৃষ্টি কালচার থেকে শিক্ষানোর মধ্যেই শিশুরা খারাপ অনেক কিছুই শিখছে এবং সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে । আমরা পুলিশ অফিসারের অভাবহীন পরিবারেও নিজ আপন সন্তান ঐশী’র হাতে বাবা মাকে খুন হতে দেখেছি । আবার পরকীয়া প্রেম ও নেশার ঘোরে নিজ শিশু সন্তানকে মা হয়েও খুন করতে দেখছি । সম্পর্কের যায়গাগুলো হয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম ভাবলেশহীন । এভাবে চলতে থাকলে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না । ভবিষৎ প্রজন্মের কথা ভেবে সকল অভিবাবকদের সন্তানদের দিকে খেয়াল রাখতে এবং সচেতন হতে হবে ।

পূর্বে নির্যাতন গুলো প্রকাশিত হতো না, এখন প্রকাশিত হচ্ছে । নানা ভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে । অনেকগুলো টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক যে কোন ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ অতি দ্রুত অবগত হচ্ছে । সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে । তবুও থামছেনা কেন ? গভীরভাবে ভেবে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে । নির্যাতনের ধরনের পরিবর্তনের কারনে নতুন ভাবেই কঠোর আইন তৈরী করে প্রয়োগ করতে হবে ।

সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গুম, খুন, অপহরণ, মুক্তিপন দাবী সহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ানক সংবাদ । ধর্ষণের ও নির্মম নির্যাতনের শিকার যারা তাদের অধিকাংশই শিশু ও কিশোর কিশোরী । বিদ্যালয়, প্রাইভেট, কোচিং এমনকি আপন জনদের কাছেও নিরাপদ নয় এরা । নির্যাতন ও ধর্ষণের মূলে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, মাদকের নেশা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রতিবন্ধকতা ।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের (নারী ও শিশু মানবাধিকার সংগঠন) তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এক হাজারেরও বেশী নারী ও কণ্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং নির্যাতনের নির্মম ও নিষ্ঠুর ধরনকে উদ্বেগ জনক বলেছে । সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে বোঝাই যাচ্ছে ২০১৭ সালের সর্বশেষ হিসাব আরও উদ্বেগ জনক হতে পারে । যৌতুকের জন্য আগুনে ঝলসে দেয়া সহ নির্মম হত্যাকান্ড এই সভ্য আধুনিক সমাজে এখনও দেখতে হয় । কিছু সংবাদ গণমাধ্যম ও থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালেও অনেক ঘটনাই নানা কারনে থেকে যায় সবকিছুর আড়ালে । এখনই ভেবে দেখা ও সমাধানে যাওয়া উচিৎ । এখনই ভেবে দেখা উচিৎ  কেন অনেকেই অনেক ক্ষতির পরেও আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা প্রকাশ করে । আইনি দুর্বলতার কারনে জামিন অযোগ্য অপরাধে অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা এবং পরবর্তীতে আবারও উৎসাহ নিয়ে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে । যার ফলে অপরাধের নির্মমতা ও মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে । আবার অনেকে জানেনা কিসের জন্য কোথায় অভিযোগ করতে হয় । তাই সচেতনতা বৃদ্ধি করার নানা পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী প্রয়োজন ।

নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে নারীরাও কম দায়ী নয় । নারীরা নেশা, পরকীয়া সহ নানা অপরাধে জড়ানোর কারনে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে অহরহ । বহু ধরনের আবেগের তীব্রতা মাঝে মাঝে মানুষের চিন্তা ও চেতনাকে ভোতা করে দেয় । সকল আবেগ চেতনাকে সুন্দর ও উন্নত করতে হবে । যাতে নারীদের আত্ম সম্মান বাড়ে এবং নিজের অধিকারটা বুজতে পারে সেদিকে সচেতন হতে হবে । নারী পুরুষ উভয়ের দায়িত্ববোধ জাগ্রত এবং সমাজের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে ।