আচরণবিধি ভেঙে মনীষার প্রচারণা, ভোট নিয়ে সংশয়ে সরোয়ার

প্রকাশিত: ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০১৮ | আপডেট: ২:৫০:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০১৮

বরিশাল সিটি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে প্রতীক বরাদ্দের আগে কোন ধরনের প্রচার-প্রচারণায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিষেধাজ্ঞা থাকায় ঘর গোছাতে ব্যস্ত মেয়র প্রার্থীরা।

ইসির নির্দেশনা মেনে জোরেশোরে ভোটযুদ্ধে নামার আগে সব মেয়র প্রার্থী বিশেষ করে আ’লীগের সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ও বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার কৌশলীভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘরোয়া বৈঠকে নির্বাচনী প্রচারণার দিকনির্দেশনা প্রদান ও সৌজন্য সাক্ষাতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কিন্তু ব্যতিক্রম প্রথা ভাঙ্গা নির্বাচনের দাবিকারী বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী।

ইসির নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে তিনি চালাচ্ছেন গনসংযোগ। সাথে তার মহান পেশাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। কোন রাখঢাক না রেখেই সেই গনসংযোগে গিয়ে রোগী দেখার চিত্র প্রকাশ করেছেন সোস্যাল মিডিয়ায়। তার আইডি ও পাতা থেকে প্রকাশিত গনসংযোগ ও প্রচারণার ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ন্তজাল দুনিয়ায়।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘণ করে এ তার কেমন প্রথা ভাঙ্গার নির্বাচন? প্রশ্ন সচেতন মহলের।

ভোট চাইলেন হাসানাত এর ছবির ফলাফল

অন্যদিকে আ’লীগের মেয়র প্রার্থীর বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ মন্ত্রীর মর্যাদায় থাকায় তার প্রভাব বিস্তারের কারনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।

নিরপেক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাতে সরকারের প্রতি সরোয়ার যে দাবি জানিয়েছেন সেই সুরে গলা মিলিয়েছেন বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী ও জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন তাপসও।

তবে রাজনীতিবিদের ছেলে মেয়র প্রার্থী হওয়াকে দোষের কিছু নয় উল্লেখ করে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সিটি নির্বাচনের আশাপ্রকাশ করেছেন মহানগর আ’লীগ নের্তৃবৃন্দ।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যপারে অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থার আশ্বাস নির্বাচন কমিশনের।

সূত্রে প্রকাশ, আগামী ৩০ জুলাই প্রথম বারের মত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। ১০ জুলাই প্রতীক বরাদ্দের পর মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটযুদ্ধে নামবেন। এর আগে প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় বাবস্থা নিতে বলেছেন।

সব দল ও সকল প্রার্থীর জন্য সমসুযোগ অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করনেই এ উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ।

প্রচার প্রচারণার জন্য হাতে তেমন সময় না থাকায় মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে ঘাম ঝড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। বিশেষকরে আ’লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা বেশি সময় দিচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীদের একত্র করতে। দফায় দফায় ঘরোয়া বৈঠকে প্রচারণা ও নির্বাচনী কৌশলের ওপর নেতাকর্মীদের দেয়া হচ্ছে নির্দেশনাও।

সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া ঘরোয়া বৈঠক চলছে গভীর রাত অবধি। এর মাধ্যমে প্রস্তুত করা হচ্ছে প্রচারণা টিম থেকে শুরু করে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এজেন্টদের।

এই ঘরোয়া বৈঠকের বিষয়েও নির্দেশনা দিয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন। কোন সভা করতে হলে অন্তত ২৪ ঘন্টা আগে স্থানীয় পুলিশের অনুমতি নিতে হবে প্রার্থীদের। জনসভা বা পথসভাতো নয়ই, ঘরোয়া বৈঠক করা যাবে না অনুমতি ছাড়া।

এই যখন পরিস্থিতি, ইসির নির্দেশনার কোন তোয়াক্কা না করেই গণসংযোগ করে ভোট প্রার্থনা করে যাচ্ছেন বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যানভাসের পাশাপাশি কারো মাপছেন ব্লাড প্রেসারতো, কারো দেখছেন এক্সরে রিপোর্ট।

সিটি কর্পোরেশনের শিশুবান্ধব নগরীতে চাকুরী করার সময়েও এমন নৈতিকতা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছিল নাগরিক মহলে।

আবার সেই নির্বাচনী প্রচারণায় স্থির চিত্র শেয়ার করেছেন তার ফেসবুক প্রোফাইলে। তার ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায়, মঙ্গলবার দুপুর ৩ টায় প্রচারনায় রোগী দেখার দুটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন ‘চলছে গণসংযোগ সাথে চলছে রোগী দেখা। এইতো জনগণের মেয়র প্রার্থী’।

তার প্রোফাইল ছবিতেও দেখা গেছে রঙীন মই মার্কার পোস্টার।

তিনি গতকালও (বুধবার) প্রচার-প্রচারণায় চালিয়েছেন বলে একাধিক ভোটার এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে। অভিযোগ সরাসরি স্বীকার না করে মনীষা চক্রবর্তী বলেন, আমি রোগী দেখতে গিয়ে তাদের সাথে নির্বাচনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছিলাম। গণসংযোগকে দোষের বলে কিছু দেখছেন না তিনি।

যিনি নিজেই আচরণবিধি মানেন না, তিনি জনগণের প্রার্থী দাবিদার হয়ে কি ধরনের নির্বাচনী প্রথা ভাঙবেন প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্বরত আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ’র প্রভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। আ’লীগের প্রার্থী প্রধানমন্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে (নিকটাত্মীয়) হওয়ায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা কঠিন হয়ে পরবে।

গতকাল দুপুরে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সাংবাদিকদের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ শংকা প্রকাশ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান খান ফারুক, মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, আনোয়ারুল হক তারিন, বরিশাল রিপোর্টাস ইউনিটির সভাপতি নজরুল বিশ্বাস, সাধারন সম্পাদক বাপ্পী মজুমদার, সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান খান স্বপন, সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষসহ সাংবাদিকবৃন্দ।

এসময় সরোয়ার বলেন, খুলনা, গাজীপুরের ভোট দেখে আমরা হতবাক হয়েছি। বরিশালে সুষ্ঠ নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। আমাদের দাবী থাকবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখবেন। কারন নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে সকল দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন নির্বাচনে জয়লাভ করতে গিয়ে যেন দলের কোন বদনাম না হয়। আর সে লক্ষ্যেই সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করি আমরা। কেননা এই নির্বাচনের মাধ্যমেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা তার ইঙ্গিত দেবে। সিটিতে সুষ্ঠু ভোট হলে সরকারের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থা ফিরে আসবে।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সর্ম্পকে সরোয়ার বলেন, গনতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকায় তারা চাইবে প্রশাসন দিয়ে নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপির ধানের শীষের জয় হবেই। নির্বাচনে জয়লাভ করলে বরিশালে পরিকল্পনা মাফিক টেকসই উন্নয়ন করা হবে বলে উল্লেখ করেন সরোয়ার।

সরোয়ারের আশঙ্কা থাকলেও সিটি নির্বাচনে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের প্রচারণার কোন আইনি বিধি নিষেধ নেই। পূর্বে এমন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আ’লীগের দাবির ভিত্তিতে ২৪ মে এমপিদের প্রচারণার সুযোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে সিটি নির্বাচনের আচরণ বিধির সংশোধনীতে এ প্রস্তাবনা আনা হয়েছে।

বরিশালের নির্বাচনে অন্য প্রার্থীদের সংশয়ের বিষয়ে মহানগর আ’লীগ সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বরেন, ‘রাজনীতিবিদের ছেলে রাজনীতিবিদ হতেই পারে। সারা বাংলাদেশ ও পৃথিবীজুড়ে এমন উদাহরন আছে। দেখতে হবে আমার দল কোন বেআইনী কিংবা আচরণবর্হিভূত কিছু করে কিনা’।

প্রধামন্ত্রী আত্মীয়করন করে নির্বাচনকে কলুষিত করবেন না বলে উল্লেখ করে জাতীয় পার্টি নেতা মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, বরিশাল সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ হবে। সম্প্রতি বরিশাল প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে এক সৌজন্য সভায় আ’লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহও বরিশাল সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন।