কমছে কৃষি জমি, প্রভাবশালীদের কব্জায় জলাধার

হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০১৮ | আপডেট: ১২:৪৮:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০১৮
কমছে কৃষি জমি, প্রভাবশালীদের কব্জায় জলাধার

 বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ হারে ফসলিজমি হ্রাস পাচ্ছে, আর দৈনিক অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে ৬৬১.৪৫ একর ফসলিজমি। প্রতিবছর বরিশাল বিভাগে ছয় হাজার ৬৬১ হেক্টর কৃষিজমি অকৃষিতে পরিণত হচ্ছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য।

দক্ষিণাঞ্চলে ফসলি জমি কমে যাওয়ার কারন হিসেবে দ্রুত নগরায়ন ও বাণিজ্যিক মনোভাবকে দুষছেন গবেষকরা। দক্ষিণাঞ্চলে আবাদযোগ্য জমি হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে লবণাক্ততার মতো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবও। যার ফলে দিন দিন কমছে ফসল উৎপাদন। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কৃষি জমির শ্রেণির পরিবর্তন রোধে সরকার কঠোর অবস্থান না নিলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

বরিশালের কৃষি সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো ও পরিবেশবাদীদের মতে, ধান-নদী-খালের বরিশাল থেকে ধানের জাতের বিলুপ্তি ঘটেছে, সঙ্গে প্রাচ্যের ভেনিসের মূল আকর্ষণ খালগুলো। সংকুচিত ও দখল হচ্ছে নদীও। একশ্রেণির অতিলোভী মানুষ কৃষিজমি নষ্ট করছে, অন্যদিকে খাল-নদী দখল করে পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে প্রভাবশালীরা।

ঐ অসাধু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রশাসন ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার সঙ্গে সরকারের প্রতি কার্যকর আইনের বাস্তবায়নের জোর দাবি তুলেছেন নাগরিকমহল।

গতকাল শনিবার সকালে নগরীর সদররোডস্থ কীর্তনখোলা মিলনায়তনে কৃষি জমি, জলাধার রক্ষা ,নিরাপদ  খাদ্য ও টেকসই  উন্নয়নঃপরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বিষয়ক এক আলোচনা সভায় এসব দাবি উঠে আসে।

অন্যদিকে বগুড়া রোডের বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবড়ি) সভাকক্ষে পৃথক এক অনুষ্ঠানে বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিবিদ ও কৃষকদের কাজের গতি বৃদ্ধিসহ পরিবেশবান্ধব টেকসই কৃষির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

কৃষি সহায়ক প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত রিভিউ কর্মশালায় ফসল উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক চাষাবাদ ও জলবায়ুর বিরুপ প্রভাব মোকাবেলায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষতাবৃদ্ধি এবং কৃষি জমি রক্ষায় সরকারের পাশপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন কৃষিবিদরা।

সূত্র জানিযেছে, নগরীতে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) সহযোগিতায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজমি ও জলাধার সংরক্ষণ বিষয়ক আলোচনা সভার আয়োজন করে বরিশাল নদী, খাল, জলাধার ও পরিবেশ বিষয়ক পর্ষদ ও রান।

উন্নয়ন সংগঠক রণজিৎ দত্তের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি উপ-পরিচালক কৃষিবিদ হরিদাস শিকারী। ম্যাপের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ গাজী জাহিদ হোসেন।

মূল প্রবন্ধে অধ্যক্ষ গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, ২০০০ সাল থেকে ২০১১ এই ১২ বছওে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। গড়ে প্রতিবছর আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর করে কমছে, যা মোট ফসলি জমির শূন্য দশমিক ৭৩৮ শতাংশ। প্রতিবছর আবাসন খাতে ৩০ হাজার ৮০৯ হেক্টর, নগর ও শিল্পাঞ্চলে ৪ হাজার ১২ হেক্টর এবং মাছ চাষে ৩ হাজার ২১৬ হেক্টর জমি যুক্ত হচ্ছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ ফসলিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। গড়ে প্রতিদিন ৬৬১.৪৫ একর ফসলিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ হারে ফসলিজমি কমছে। সরকারি প্রকল্প, বাণিজ্যিক ব্যবহার, প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুদের কারণে দেশের ফসলিজমি ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে। ফসলিজমি রক্ষায় তিনি ১৪ টি সুপারিশ উত্থাপন করেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন সুশাসনের জন্য নাগরিক বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা আক্কাস হোসেন, বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক তোতা মিয়া, আইসিডিএর নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার জাহিদ প্রমুখ। আলোচক ছিলেন অ্যাড. হিরণ কুমার দাস মিঠু ও শিক্ষক টুনু রাণী কর্মকার।

নগরীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুসহ কতটা ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ গড়া সম্ভব হয়েছে তার ওপর। বরিশালে পুকুর-জলাশয়-খাল ভরাট করে বিভিন্ন অজুহাতে তার ওপর গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা। ফসলিজমি রক্ষার জন্য দেশে কার্যকর কোনো আইন নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ আইনই কাগুজে। ফসলিজমি রক্ষার জন্য ২০১০ সালের দিকে ‘জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি’ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সে আইন আর বাস্তবায়িত হয়নি। এসব আইনে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার কথা বলা হয়েছে। পরিবর্তন করলেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের কোথাও এ আইন প্রয়োগ হওয়ার নজির নেই।

এছাড়াও মন্ত্রী পরিষদ থেকে নীতিগতভাবে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন ২০১৬ (খসড়া) অনুমোদন লাভ করলেও আজক প্রযর্ন্ত তা লাল ফিতার দৈরাত্ম থেকে আলোর মুখ দেখেনি বলে বক্তরা উল্লেখ করেন।

শিক্ষক শিবানী চৌধুরী জানান, উন্নত বিশ্বে নিজের জমি হলেও ব্যক্তি নিজের খেয়াল-খুশি মতো ব্যবহার করতে পারে না। কেনাবেচাও হয়না কৃষিজমি। সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই প্রতি ইঞ্চি কৃষিজমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এসময় বক্তারা কৃষিজমির সুরক্ষার সাথে বরিশাল নগরীকে রক্ষা করতে হলে খাল-জলাধারগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে বলে উল্লেখ করেন।

পরিবেশকর্মী অ্যাড. সুভাষ চন্দ্র বিপ্র বেদান্তি টোটকা হিসেবে নগরীর বৃক্ষ ও জলাধার খুনের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীতে উন্নয়নের নামে খাল ভরাট শুরু হয় বর্তমান বিসিসি মেয়র আহসান হাবিব কামালের পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালে। সে সময় (১৯৯৮ সাল) তৎকালীন বরিশাল পৌরসভা বটতলা খাল ভরাট করে দোকানপাট নির্মাণ করে। ২০০০ সালে বরিশাল পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে কিছুদিন কামাল অনির্বাচিত মেয়র থাকা অবস্থায় খালটির বটতলা থেকে হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা পর্যন্ত অংশ ভরাট করা হয় বলে এলাকাবাসী জানান।

২০০৩ সালে মজিবর রহমান সরোয়ার (বর্তমানে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী) মেয়র নির্বাচিত হয়ে খালের নবগ্রাম থেকে বটতলা মার্কেট পর্যন্ত এলাকা ভরাট করা হয়।

সাবেক মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরণ মেয়র থাকাকালে বটতলা খালের ওপর নির্মাণ করা হয় রাস্তা।

বটতলা খাল এলাকায় নির্মিত দোকানপাটগুলো জেলা পরিষদের ছিল বলে মেয়র ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যন আহসান হাবিব কামালের দাবি। মজিবর রহমান সরোয়ার বলছেন, তার আমলে বটতলা খাল ভরাট করা হয়নি বরং খালের পাড়ের ভরাট হওয়া অংশ ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। এবার তিনি সিটি মেয়র হলে দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধার করবেন বলে জানান।

হিরণ আমলে কয়েকজন কাউন্সিরর বলছেন, সড়ক নির্মাণের সময় ঐ এলাকায় খাল ছিল না। এরপরও রাস্তার নিচ দিয়ে পানি চলাচলের জন্য নালা নির্মাণ করেছেন হিরণ। মেয়র হিরণের সময়ে বিবির পুকুরসহ বরিশাল নগরীতে জলাধার সংরক্ষণে ব্যাপক ইতিবাচক উদ্যোগ ছিল বলে মনে করছেন ডাব্লিউবিবিবি ট্রাস্টের পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুল আলম।

অপরদিকে গতকাল বগুড়া রোডের খামারবাড়িতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিবিদ ও কৃষকদের কাজের গতি বিষয়ক রিভিউ কর্মশালায় অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ওমর আলি শেখ। অনুষ্ঠানে প্রকল্প কর্মকর্তা ড. সফিকুল ইসলাম জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র চাষিদের নিয়ে তিনটি গ্রুপ করে বিষমুক্ত সবজি ও উচ্চ সবজি উৎপাদন, দানা শষ্য উৎপাদন ও ফল আবাদ করার জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

আলোচনায় অংশগ্রহনকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্পের চার বছর পার হয়ে গেলেও প্রকল্প থেকে কৃষকদের মাঝে যে ধরনের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে তা অপ্রতুল। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া উৎপাদনবৃদ্ধি সম্ভব নয়। এছাড়া ভালো ফলাফল পেতে কৃষকদের আরো প্রশিক্ষণ দেয়ার তাগিদ দেন তারা।

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ হরিদাস শিকারী বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় তিন কোটি মানুষের জন্য টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জীবনমান উন্নয়নের জন্য বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীল উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি ব্যবহার করায় খাদ্য উৎপাদনের মাত্রা বেড়েছে। এছাড়া কৃষকদের মাঝে যথাসময় আইপিএম ও লোগ পদ্ধতিতে চাষ,পানচিং পদ্ধতি ব্যবহার, সুষম সারের ব্যবহার, আধুনিক জাতের বীজ সরবরাহ, ধানের বাজারের মূল্য নির্ধারণ করার ফলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি জমি কমায় উদ্বিগ্ন না হয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এর ফলে এক জমি থেকে যেমন অধিক ফসল ঘরে তোলা যাবে তেমনি পরিবর্তিত পরিস্থিতি কিছুটা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

প্রয়োজনে ফসলিজমি ব্যবহার সংরক্ষণে নতুন আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে বলে তিনি মনে করেন।