সিডরের সেই ভয়াবহ তান্ডবের কথা আজও ভূলেনি দক্ষিনের মানুষ

প্রকাশিত: ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৭ | আপডেট: ৬:২৭:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৭
সিডরের সেই ভয়াবহ তান্ডবের কথা আজও ভূলেনি দক্ষিনের মানুষ

সুপার সাইক্লোন সিডরের সেই ভয়াবহ তান্ডবের কথা আজও ভুলেনি কলাপাড়া উপজেলার মানুষ। সেই রাতের কথা স্মরন হলে এখনও আঁতকে ওঠেন অনেকে। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর শুধু মানবকুলের অস্তিত্বই ধ্বংস করেনি, ধ্বংস স্তুপে পরিনত করেছে গোটা উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ জনপথ। তবে সিডরের আজ ১০ বছর পূর্ণ হলেও এখনও বহু মানুষ ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে।
আজকের এই দিনে দেশের উপকূলীয় এলাকার ১২টি জেলার উপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় সিডর। দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা ৬টার দিকে দমকা হাওয়ার সাথে গুরি গুরি বৃষ্টি ছিল। আবহাওয়া অফিস ৫নম্বর বিপদ সংকেতের পর ০৮ নম্বর মহা বিপদ সংকেত দিলেও উপকূলীয় এলাকার অনেকেই বুঝতে পারেনি এভাবে লন্ড ভন্ড হয়ে যাবে সবকিছু। রাত ১১টার দিকে প্রচন্ড বেগে আঘাত হানে কলাপাড়া উপজেলায়। মাত্র কয়েক মিনিটে ১০ থেকে ১২ ফুট সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়ে যায় বিস্তীর্ন এলাকা। মনে হয়েছে যেন বঙ্গোপসাগরের সব পানি যমদূত হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। নিমেষেই উড়ে যায় ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা। মাটির সঙ্গে মিশে যায় বহু স্থাপনা, রাস্তাঘাট, পশু-পাখি, জীবজন্তুু । বিধ্বস্ত হয় বেঁড়িবাধ। আহত হয় হাজার হাজার মানুষ। প্রান হারায় উপজেলার ৯৪ জন মানুষ। প্রকৃতির নিষ্ঠুর আঘাতে সে রাত তছনছ করে দেয় অনেকের সাজানো সংসার । অনেকের লালিত স্বপ্ন। প্রকৃতি যে মানুষের ওপর এতটা নিষ্ঠুর আচরন করতে পারে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর তার উৎকৃষ্ট উদাহরন। কোনদিন ওই স্মৃতির কথা ভুলতে পারবেনা উপকূলীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ হাজারো মানুষ।
সরকারী ও বে-সরকারী সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, সিডরে কলাপাড়া উপজেলায় ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে এক হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী হয়েছে ৯৬ জন। স্বামী হারা হয়েছে ১২ নারী। এতিম হয়েছে ২০ জন শিশু। নিখোঁজ হয়েছে সাত জেলে। এই উপজেলার মৃত গবাদি পশুর সংখ্যা চার হাজার নয়শত ৪৪টি। ক্ষতি হয়েছে পাঁচশত ৫৩টি নৌযানের। সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১২ হাজার নয়শত ৭০টি পরিবার। আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা ১৪ হাজার নয়শত ২৫টি।
সিডরের ১০ বছর পূর্ণ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বহু মানুষ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। সচল হয়নি অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য। কেউ কেউ অর্থাভাবে ফিরতে পারেনি নিজ পেশায়। আবার কেউবা হয়েছে প্রতিবন্ধি। তাছাড়া সিডরে উপকূলীয় এলাকার অনেক বেবিবাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে। যদিও বিধ্বস্ত বেড়িবাধঁ সিডর পরবর্তিতে মেমারমত করা হয়। তবে সেগুলোর অবস্থা এখন নাজুক। ইতোমধ্যে মহিপুর, লালুয়া, ও দেবপুর ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁেধর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে জোয়ারের পানির তান্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। অমাবস্যা-পূর্নিমায় বিধ্বস্ত বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে এখনো তলিয়ে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। এছাড়া সিডর পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে পূর্নবাসনের জন্য যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তার অধিকাংশই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
নীলগঞ্জ ইউনিয়নের আবসানের আব্দুর রব জানান, এ আবাসনে ২৮০ টি ঘর রয়েছে। প্রত্যেকটি ঘরই এখন বসবাসের অনুপযোগী। কোন ঘরে চাল নেই,আবার কোন ঘরে বেড়া নেই।
মহিপুর ইউনিয়নের নিজামপুর গ্রামের বিধ্বস্ত বাঁধ লাগোয়া বসবাসরত গৃহিনী আলেয়া বেগম বলেন, আবহাওয়ার সিগন্যাল দিলে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। এই বুঝি পানি উঠে তলিয়ে গেল। লালুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষক আবদুল মান্নান বলেন, সিডরের পরে তার এলাকায় বেড়িবাঁধের সংস্কার হয়েছে নামে মাত্র। ফলে জোয়ারের লোনা পানি ঢুকে ফসল নষ্ট করছে। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা গ্রামের সোয়াইবের কাছে সিডরের কথা জানতে চাইলে তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, তার দুই মেয়ে লুৎফুল নেছা ও রিয়া মনি সুপার সাইক্লোন সিডরে নিহত হয়। তার স্ত্রী তাসলিমা বেগম একই সাথে দুই মেয়ে হারিয়ে পাগল প্রায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, ইতোমধ্যে পাঁচ কিলোমিটার বেরিবাঁধ সংস্কারের জন্য টেন্ডার সস্পন্ন হয়েছে। যে কোন সময় বিধ্বস্ত বেঁরিবাধের কাজ শুরু হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.তানভীর রহমান জানান, সিডর পরবর্তি সময় ক্ষতিগ্রস্থদের পর্যায়ক্রমে বিভিন্নভাবে সহায়তা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বসবাস উপযোগী করার জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) মামুনুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, উপকূলীয় এলাকার দুর্যোগ ঝুকির সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানে কাজ চলছে।