এক মেয়ের মা হয়ে ওঠার গল্প

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৮ | আপডেট: ১০:৩৯:পূর্বাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৮
এক মেয়ের মা হয়ে ওঠার গল্প

সেঁজুতি হতাশ চোখে রাত কালো আকাশের বুকে ভেসে যাওয়া মেঘগুলো দেখছিলো জানলায় বসে। খানিকক্ষণ আগেই বিছানা ছেড়ে পা টিপে, টিপে নেমে বাথরুমে গেছিলো সে। প্র্যেগন্যান্সি টেস্ট স্ট্রিপে এবারও দুটো রেখা ফুটে উঠলো না। তার যে বড় ইচ্ছে একটা ছোট্ট, মিষ্টি সন্তান পাবার। তার কোনোই শারীরিক সমস্যা নেই, সমস্যা নেই তার স্বামীরও, তবুও কনসিভ কেনো হচ্ছেনা ডাক্তারেরাও বলতে পারছেন না। ভেসে যাওয়া মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে সেঁজুতি এটাই ভাবছিলো যে তার জীবনটাই কেমন যেনো উল্টোপাল্টা। যা, যা তার জীবনে হবার ছিলো বা বলা যায় হতে পারতো কোনোটাই কি ঠিক হলো! সবই তো নষ্ট হয়ে গেছে সেই কোন ছোটোবেলায়।

বাবা-মায়ের খুব আদরের একমাত্র সন্তান ছিলো সে। তবে বাবার আদরিণী ছিলো বেশি। বাবার সাথে বনতোও খুব। বছর যখন 4-5 বছর তার তখনই সেঁজুতির গানের গলা শুনে তাকে লেগে যেতো সবার। এই ব্যাপারে বাবার উত্‍সাহ ছিলো সবথেকে বেশি। নিজেও যে খুব ভালো গান গাইতেন, সে আবার সাধারণ গুনগুন করে সিনেমা বা প্রচলিত গান গাওয়া নয়। সেঁজুতির বাবা ছোটো বয়েস থেকে সংগীত শিক্ষা করেছিলেন ক্ল্যাসিকাল সংগীতজ্ঞ গুরুজীর কাছে। নাড়া বেঁধে গান শিখেছেন, ঘন্টার পর ঘন্টা পরে থাকতেন রেওয়াজ নিয়ে। সরগম থেকে রাগ প্রধান সংগীতে তাঁর গলা খেলা করতো দারুন।

 

ঠাকুর্দার চাপে পড়ে শেষপর্যন্ত বাবাকে কলেজ পেরিয়ে চাকরিতে ঢুকতে হয়েছিলো। সেই দুঃখ কমেছিলো মেয়ের গলায় কৃষ্ণ ভজন শুনে। বাবা আর মেয়ে রোজ সকালে হেঁটে বাজার করতে যেতো। ছোলা শাক থেকে ছোলা ছাড়িয়ে খেতে, খেতে সংগীত শিল্পীদের জীবনের গল্প বলতো বাবা তাকে। গতানুগতিক পড়াশোনার চেয়ে মেয়ের গান শেখার দিকেই বেশি মনোযোগ ছিলো তাঁর। প্রথম, প্রথম অফিস থেকে ফিরে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে যেতেন হাত-মুখ ধুয়েই মেয়ের সাথে। অনেকক্ষণ ধরে চলতো প্র্যাকটিস। পরে নাম করা সংগীতবিদকে নিয়োগ করলেন অনেক টাকা খরচ করে যাতে মেয়ের শিক্ষায় কোনো ত্রুটি না থাকে। বাবার স্বপ্ন পূরণে তত্‍পর মেয়েও জানপ্রাণ দিয়ে গলা চর্চা করতো। ওইটুকু মেয়েও এক ফোঁটা ঠান্ডা জল বা আইসক্রিম খেতো না! টক খাবার, মশলাদার খাবারও কম খেতো। কী না বাবার বারণ! সে যেন এক সাধনা।

 

বাবার স্বপ্ন সত্যি করে বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী হয়ে ওঠার। সেঁজুতি যখন ধীরে, ধীরে রাগ-রাগিণী চর্চা করছে, নতুন গান তুলে বাবা কে শোনানোর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতো সে। অফিস থেকে ফিরে চা খেতে, খেতে কতক্ষণে বাবা তার গানটা শুনবে, প্রশংসা করবে না কী ভুল সংশোধন করে দেবে, কত চিন্তাই ঘুরতো মাথায়। তখন ছিলো গরমের ছুটি। কাজেই সেঁজুতির সারাদিন কাটছিলো গানে, গানে। ক্ল্যাসিকাল শিখছে বলেই তাকে শুধু সেই আবর্তে বেঁধে রাখেননি বাবা, বরং তাকে কিনে এনে দিতো গানের ক্যাসেট। কবীর সুমন, মৌসুমী ভৌমিক সবার গানই তার কাছের হয়ে গেছিলো। কয়েকদিন ধরে অনেক চেষ্টা করে একটা সরগমের জটিল অন্তরাকে রপ্ত করছিলো সেঁজুতি। গানটা প্রথম গেয়ে উঠে সে কী আনন্দ তার। তারপর বারবার গেয়ে দেখছিলো ঠিক একইরকম সুন্দর হয় কিনা। অপেক্ষা করতে লাগলো কখন বাবা ফিরবে আর সে তাকে গেয়ে শোনাবে এই অপূর্ব সুরের বিস্তার। সাড়ে ছটা বাজলো, ক্রমে সাতটা, সাড়ে সাতটা বেজে গেলো, বাবা আর আসে না। আটটার সময় একজন পাড়াতুতো কাকু খবর নিয়ে এলেন ভগ্নদূতের মতন। বাবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে আর বোধহয় তিনি নেই। মা শুনে মাটিতে বসে পড়লো, ঠাম্মা আকুল স্বরে কেঁদে উঠলো। সেঁজুতি কিন্তু বিশ্বাস করলো না কথাটা। সে জেদ করতে লাগলো।

 

একই কথা বলতে লাগলো, “না, না এটা হতে পারে না কাকু আমায় নিয়ে চলো না, আমি বলছি তোমরা ভুল করছো, এটা হতে পারে না, বাবা কই, কেনো উল্টোপাল্টা বলছো।” এরকমই অসংলগ্ন অনেককিছু। তার অনেক পরে শরীরটা বাড়ি এলো। শুধু শরীরটুকু, সকাল অবধি যে শরীরে কথা ছিলো, হাসি ছিলো, ছিলো গান। শুধুই জীর্ণ শরীর হয়ে ফিরলো, অনেক রক্ত হারিয়ে, হারিয়ে থেঁতলানো দেহাংশ। বড় লরি পিষে দিয়ে গেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেনিয়মে। তবে মৃত্যুও এক বেনিয়মই তো যাকে মেনে নেওয়া যায় না। মানতে পারেনি সেঁজুতি, বাবাকে দেখে চিত্‍কার করে কেঁদে উঠতে পারেনি বরং বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলো। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তার মাও। বাড়িতে তখন তিনটি মেয়ে। সংসার চালানোর কাঁধ খানা বিসর্জিত, “বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়

নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি।

তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা-

ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ||” এরপর শুরু হলো পরীক্ষা। একটার পর একটা। বাবার ছিলো সরকারি চাকরি কিন্তু সেই চাকরি তদবির করে মায়ের পেতে, পেতে দু’বছর লাগলো। ক্লাস এইটে নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ছেড়ে কাছের গভর্নমেন্ট স্কুলে ভর্তি হলো সেঁজুতি। তার চোখের জ্যোতি মরে গেছিলো সেই দিনই যে দিন…আর যা গেছিলো ছেড়ে তা হলো গান। না সে আর একবারও গান গাইতে পারেনি। চেষ্টাও করেনি আসলে।

 

এক অদ্ভুত রকমের অভিমান তার মন আচ্ছন্ন করে দিয়েছিলো যার ঘেরাটোপে বন্দি হয়েছিলো সংগীত। একদিক থেকে হয়তো ভালোই কারণ অনেক টাকা মাইনে দিয়ে গানের শিক্ষক রাখার দিন তখন বিগত। গান গাইলে আরো আঘাতই পেতো মেয়েটা, হয়তো। পড়াশোনায় সে খুব আহামরি ভালো ছিলো না। হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পড়ার পরে ভালো একটা সম্বন্ধ পেয়েই মা তার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো। মানিয়ে নেওয়ার খেলা খেলতে নেমে সেঁজুতিরও সেই মুহূর্তে আর উপায় ছিলো না। শ্বশুর বাড়িতে যৌথ পরিবার। বৌমাদের ওপর অনেক দায়িত্ব, নজরদারি আর শাসনও ততোধিক। ছুঁত মার্গ প্রবল বেশি। রান্নাঘরে দুটো ফ্রিজ, একটা নিরামিষ, একটা আমিষ। একবার ভুল করে নিরামিষের ফ্রিজে পিঁয়াজ, রসুন রেখে ফেলে চরম অপমানিত হলো সেঁজুতি। বাড়িতে সবসময়েই লোকজন, আত্মীয় আর পুজো পার্বন। মন্দিরও আছে লাগোয়া। অনেক নিয়মকানুন নতুন করে শিখতে হলো, নিজের বিচার বিবেচনা বিসর্জন দিয়ে। একমাত্র ভরসা ছিলো বুঝদার স্বামীর মানসিক সাহচর্য। ভেতরে, ভেতরে চাকরির চেষ্টা করছিলো সে। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় সেঁজুতি আর ওর স্বামী অনিমেষ চলে আসে ব্যাঙ্গালোরে আইটি হাবে। তবে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে এলো এক মাথা চিন্তা। কেনো তাদের সন্তান আসছে না, অনেকদিনই তো হলো! ডাক্তার বললেন প্রচন্ড মানসিক স্ট্রেস। কিছু মাস পরে অনিমেষ চেষ্টা করে ছুটি নিলো অফিস থেকে, তারা বেড়াতে গেলো মায়াবী কুর্গ।

 

সবুজে মোড়া কুর্গকে দেখে যেনো নতুন করে নিজেদের চিনলো দুজনে। দু’মাস পেরোতে জানতে পারলো সে গর্ভবতী। তাকে দেখে রাখতে শ্বাশুড়ি মা এসে রইলেন কাছে। কিন্তু তার যত্ন নিতে গিয়ে উল্টে সেঁজুতির কাজ গেলো বেড়ে। ক্রমশ প্রসবের দিন এগিয়ে এলো। পার্স থেকে বাবার একটা ফটো বের করে কপালে ঠেকায় সেঁজুতি, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, সে বলে, “তুমি দেখো, পাশে থেকো”। ছেলে হলো তার। চাঁদের কণার মতন ফুটফুটে। আঁতুরের নিয়ম, নিয়ম বলে শ্বাশুড়ি তাকে একঘরে করে দিলেন। এমনকি অনিমেষেরও তার ঘরে ঢোকার নিয়ম নেই। বেচাল দেখলেই চেঁচিয়ে, কেঁদে পাড়া মাথায় করতে লাগলেন। দুর্বল দেহে, না ঘুমিয়ে, একা শিশু কে সামলাতে হিমশিম খায় বছর তেইশের সেঁজুতি। ছেলে যে খালি কাঁদে। একদিন দুপুরে ছেলে কে কোনোমতে ভোলাতে না পেরে সে সুর কেটে বলে “আয় ঘুম, যায় ঘুম দত্ত পাড়া দিয়ে…” যেই সে গেয়ে ওঠে ছেলে কান্না থামিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে। সে থামলেই ঠোঁট ফোলায় কাঁদবে বলে। সেঁজুতি গাইতে শুরু করে, এই গান, সেই গান। ছেলে তার গান শুনে হাসে, তার গান শুনে ঘুমায়। আঁতুর শেষ হলো। শ্বাশুড়ি একসময় ফিরে গেলেন। ছেলে বড় হতে থাকে, সেঁজুতির গান আর থামে না। অনিমেষও তাকে উত্‍সাহ দিতে থাকে। প্রথমে তাদের ফ্ল্যাটের শারদীয় উত্‍সবে তারপর বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ইভেন্টে গান গাওয়ার ডাক আসে সেঁজুতির। এমন গলা কেউ নাকি শোনেনি।

 

ছেলের পাঁচ বছর বয়সে তার প্রথম সিডি বেরোলো। এখন তার সব প্রোগ্রামে আঙ্গুল ধরে উপস্থিত থাকেই তার ক্ষুদে সন্তান, যেনো তার বালক পিতা, গান সংক্রান্ত সব ব্যাপারে তারই আগ্রহ সবচেয়ে বেশি! ছেলের হাত ধরেই সেঁজুতি ফিরে পেয়েছে জীবনের সব হারানো সুর। সেই সুরের তাল কেটে যাবার আর ভয় নেই তার। কোন অমোঘ মন্ত্রে যেনো সে আজ বলীয়ান। নতুন কোনো সুর তুললে সবচেয়ে আগে ছেলেকেই শোনানো চাইই চাই। আসলে, যা হারায় কোনো না কোনো রূপ ধরে ফিরেও আসে। এটাই জীবনের মূল ছন্দ ও লয়! এই বিশ্বাস নিয়েই না হয় বাঁচি আমরা।

তথ্য সূত্র-ইন্টারনেট