রোহিঙ্গা শিবিরে নেই ঈদ

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৮ | আপডেট: ১০:৩৫:পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৮
রোহিঙ্গা শিবিরে নেই ঈদ

আবদুর রহমান, টেকনাফ:

গত বছর মিয়ানমারের রাখাইনের হাসসুরাতা গ্রামে কাঠের তিনতলা বাড়িতে পরিবারকে নিয়ে আনন্দের ঈদ কাটিয়েছিলেন জাহানারা বেগম। এবার ঈদের প্রস্তুতি জানতে চাইলে জবাবে তিনি বলেন, ‘খাওয়া আর থাকা নিয়ে যেখানে চিন্তার শেষ নেই, সেখানে আবার কিসের ঈদ? যেখানে প্রতিমূহূর্ত অভাব তাড়িয়ে বেড়ায়, সেখানে আবার ঈদের প্রস্তুতি কেমন হবে?’

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের লেদা লবণের মাঠ আশ্রয়শিবিরে কথা হয় রোহিঙ্গা নারী জাহানারা বেগমের সঙ্গে। কথা বলার সময় তার কোলে ছিল একটি শিশুসন্তান। তবে তার গায়ে কোনো জামা-কাপড় ছিল না। আট মাস আগে পাঁচ সন্তান নিয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফে আশ্রয় নেন এ রোহিঙ্গা নারী।

মিয়ানমার থেকে তার মতোই পালিয়ে আসা নতুন সাত লাখ রোহিঙ্গার প্রথম ঈদ বাংলাদেশে। তারা সবাই আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারে। পুরনোসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

বহিরাগমন বিভাগ ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নোমান মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ জন রোহিঙ্গার নিবন্ধন শেষ হয়েছে। তবে বর্তমানে রোহিঙ্গা নিবন্ধন বন্ধ রয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঈদুল ফিতর দরজায় কড়া নাড়লেও কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা, মৌচনি, জাদিমুড়া, তুলা বাগান, বাহাছড়া, নয়াপাড়া, শীলখালী ও হোয়াইক্যংয়ের পটুবনিয়া রোহিঙ্গা শিবিরে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় এই উৎসবের কোনো প্রস্তুতি নেই।

স্বামীকে হারিয়ে ছয় সন্তান নিয়ে পটুবনিয়া রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন রোহিঙ্গা নারী ছেনোয়ারা বেগম। গত বছর ঈদ উদযাপনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, রাখাইনে স্বামী মো. কালামের সঙ্গে গত বছর ঈদে কাঠের তিনতলা বাড়িতে আনন্দের দিন ছিল। সেদিন ১৫ কেজি গরুর মাংস রান্না করেছিলেন। আত্মীয়-স্বজনকে আপ্যায়ন করেছিলেন চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি রুটি ও গরুর মাংস দিয়ে। নতুন জামা পরে সেদিন রিকশায় মংডু শহরে ঘুরেছিলেন পরিবার নিয়ে। সেসব এখন শুধু স্মৃতি। এবার ছেলেদের নতুন জামা দেওয়া দূরের কথা, ঠিকমতো খাবার দেওয়া নিয়েই চিন্তায় আছেন।

বৃদ্ধ আকবর আলী জানান, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে রাখাইনের হাসসুরাতাপাড়া গ্রামটি ঘিরে ফেলে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা। এরপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ শুরু করে। রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ চলে। এ সময় মাথায় গুলি লেগে ছেলে মোহাম্মদ নূর মারা যায়। ওই রাতেই আরও চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে টেকনাফে পালিয়ে আসেন তিনি।

আকবর আলী বলেন, গত বছর নূর আমাদের পরিবারের সবাইকে ঈদে জামা কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সে আর নেই। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে। এখানে ভালো পানির ব্যবস্থা নেই, বাথরুমের সুব্যবস্থা নেই। এই পরিস্থিতিতে ঈদের দিন আর সাধারণ দিনের পার্থক্য কী।

গত দুই মাস আগে লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে ছেলেসন্তান জন্ম দিয়েছেন মিনারা বেগম। একমাত্র ছেলের প্রথম ঈদে নতুন জামা কিনে দেবেন কীভাবে সেই চিন্তা তার। আরও পাঁচটি মেয়ে রয়েছে তার। তিনি বলেন, মিয়ানমারে স্বামী আবদুল হাকিমের তিনতলা কাঠের বাড়ি ছিল। ছিল তিন একর জমির চিংড়ি ঘের। এখন সব হারিয়ে ঝুপড়ি ঘরে থাকতে হচ্ছে। গত বছর ঈদে প্রত্যেক সন্তানকে নতুন জামা দিয়েছিলেন, কিন্তু এখানে নিয়মিত খাবারই জোগাড় করা যাচ্ছে না।

দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘ভাবছি একটি মাত্র ছোট মেয়েকে কিছু ত্রাণ বিক্রি করে নতুন জামা কিনে দেব।’ এদিকে রমজান ও ঈদ উপলক্ষে স্থানীয় দরিদ্রদের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও সাহায্যের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আবদুল্লাহ মনির বলেন, ‘ঈদের আগে প্রতি বছর গরিবদের কিছু সাহায্য করে থাকি। এবার রোহিঙ্গা আসার ফলে চাপটা অনেক বেশি। অবস্থাটা কাকে রেখে, কাকে দেব এমনই।’

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবদুল মতলব বলেন, ঈদ নয়, কীভাবে প্রাণে বেঁচে থাকবেন সেই চিন্তায় রয়েছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গারা যেভাবে পাহাড় ও বন কেটে ঘর করছেন, তাতে ভূমি ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, এ শিবিরে প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। এত মানুষের জন্য নেই কোনো টয়লেট বা খাবার পানির ব্যবস্থা। কখনও ত্রাণ পাই, কখনও পাই না। সবাই অনেক কষ্টে রয়েছে। সবার মনেই দুঃখ, ঈদের আনন্দ আসবে কোথা থেকে।

ঈদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা হচ্ছে বর্ষা শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবে। তখন এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কী হবে? এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য ঈদ উপলক্ষে আলাদা বরাদ্দ নেই। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কিছু বরাদ্দ রয়েছে।

ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো বরাদ্দ আসেনি বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল হাসান।

জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ঈদ উপলক্ষে রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারি বরাদ্দ এখন পর্যন্ত আসেনি। তবে বিভিন্ন এনজিওর পক্ষ থেকে তাদের জন্য ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বরাদ্দ রয়েছে।

  • সমকাল