ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস আজ

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮ | আপডেট: ৮:১৫:পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮
ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস আজ

১৯৬৬ সাল। প্রায় দু দশক ধরে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচারে নিষ্পেষিত পূর্ব বাংলার জনগণ। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দাবি জানালেন, পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। তিনি পূর্ব বাংলার পূর্ন স্বায়ত্তশাসন চাইলেন। আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিসহ এই দাবিটি তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রথম উত্থাপন করলেন ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে। পরে একই সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা দাবি পেশ করেন যা ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি হিসেবে খ্যাত হয়। এই ৬ দফা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত হয়।  ৬ দফা দাবি ঘোষিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ দেশজুড়ে ৬ দফার সমর্থনে মিছিল-সমাবেশ করতে থাকে। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে আন্দোলনরত অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদস্বরূপ আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন হরতাল আহবান করে যার সমর্থনে রাজপথে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ। তাদের কর্মসূচিতে পুলিশ গুলি চালায়। এতে শ্রমিক মনু মিয়াসহ নিহত হয় ৪১ জন এবং আহত হয় সহস্রাধিক। এ ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর ৭ জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস পালন করা হয়।

ভাষা ও সংস্কৃতিতে পার্থক্য থাকলেও ধর্মীয় সাদৃশ্যের কারণে ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান মিলে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করে। ব্রিটিশ রাজ থেকে মুক্তি পেয়ে সুশাসন ও সাম্যের স্বপ্ন নিয়ে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রথম থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়। পূর্ব পাকিস্তানেই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বাস কিন্তু গণপরিষদে এ অঞ্চল থেকে অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। আবার পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের বেশিরভাগই হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পূর্ব পাকিস্তান ছিল বঞ্চিত। পাকিস্তান প্ল্যানিং কমিশনের অ্যাডভাইজরি রিপোর্টের তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় ৬ হাজার ৩৩৯ কোটি রূপি, অথচ পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় ২ হাজার ৪৫২ কোটি রূপি।

এছাড়া ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অভূতপূর্ব নিষ্পেষণ চালায় পূর্ব পাকিস্তানের উপর। যার কারণে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রক্ত ঝরায় সালাম, রফিক, বরকতরা।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছিল অনাচার। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ভোটে জিতলেও পূর্ব পাকিস্তানের গদিতে বসতে পারেনি বাঙ্গালিদের প্রতিনিধি যুক্তফ্রন্ট। বিভিন্ন ঘটনার পর পাকিস্তানের ক্ষমতা সামরিক জান্তার হাতে চলে যায় এবং সামরিক শাসক আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসে। আইয়ুব খানের শাসনামলেই বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি পেশ করেন যা লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত করা হয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির প্রথম দফা ছিল, সরকার হবে Federal বা যৌথরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির। আর পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়া অন্যান্য দাবিগুলোর মধ্যে ছিল, রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর তাদের অভ্যন্তরীন সকল বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রন থাকবে। কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে থাকবে।

অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ৬ দফার ৩য় দফায় পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানানো হয় যা পারস্পরিকভাবে উভয় অঞ্চলে বিনিময় করার সুযোগ থাকবে। অথবা একই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে পশ্চিম পাকিস্তান ও পুর্ব পাকিস্তানের দুটো পৃথক রিজার্ভ ব্যাংকের শর্তে অভিন্ন মুদ্রা প্রচলনের প্রস্তাব করা হয় এবং মুদ্রা পাচার রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির চতুর্থ দফায় বলা হয়, অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান দেবে।

পঞ্চম দফায় বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও নিয়ন্ত্রনের অধিকার থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতাও আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে থাকবে।

আর ষষ্ঠ দফা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সাহায্যের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

৬ দফার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু সারা দেশের ঘুরে ঘুরে ৬ দফার পক্ষে প্রচার চালাতে থাকেন। একই সাথে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপর পাক সামরিক জান্তার অত্যাচার নিপীড়ণ বাড়তে থাকে। কিন্তু পাক জান্তা যত নিপীড়ণ করতে থাকে, বাংলার মুক্তিকামী জনগণের সমর্থন ততই ৬ দফা দাবির প্রতি বাড়তে থাকে। ৬ দফা দাবিকে তারা মুক্তির সোপান হিসেবে গ্রহণ করে। অন্যদিকে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে এই দফা ভীষণ ভীত করে তোলে। জেনারেল আইয়ুবের বিদেশ মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ৬ দফা দাবি প্রসঙ্গে শেখ মুজিবের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার ঘোষণা দিলে শেখ মুজিব তা গ্রহণ করেন। কিন্তু ভুট্টো আর বিতর্কে নামার সাহস করেননি। এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায় ৬ দফা দাবির নৈতিক শক্তি কীভাবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে ভীত করে তুলেছিল।

৬ দফা দাবি বাঙ্গালিকে স্বায়ত্ত্বশাসনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল এবং এর জন্য লড়াই করার সাহস জুগিয়েছিল। পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এ স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে ৬ দফা দাবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ৬টি দফার মধ্যে স্বাধীনতার বীজ লুকানো ছিল। এই ৬-দফার ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকার বিভিন্ন সেক্টরের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা করে এবং  দেশের অভ্যন্তরে সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক ৬ দফার উপর ভিত্তি করেই।

৬ দফা দাবি, এর সপক্ষে গণসমর্থন ও ৬ দফা দিবসের পেছনের রক্তাক্ত আন্দোলন এ কথাই প্রমাণ করে যে সেসময় বাংলার মানুষ কী গভীরভাবে স্বায়ত্ত্বশাসন চেয়েছিল। আর জনগণকে নিষ্পেষিত করে কোনো রাষ্ট্রই টিকে থাকতে পারে না বরং জনগণের মুক্তি ও স্বায়ত্ত্বশাসনের চেতনা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি সফল রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে এই শিক্ষাই আমাদের দিয়ে যায় ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস।

  • বাংলা ইনসাইডার