আ. লীগ মাঠে, নির্দেশনার অপেক্ষায় বিএনপি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:০২ পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮ | আপডেট: ৪:০২:পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮
আ. লীগ মাঠে, নির্দেশনার অপেক্ষায় বিএনপি

জেলা সদর ও হাইমচর উপজেলা নিয়ে চাঁদপুর-৩ আসন। মূলত গোটা চাঁদপুরের রাজনীতি আবর্তিত হয় গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি ঘিরে। মিজানুর রহমান চৌধুরীর দল ত্যাগের মধ্য দিয়ে (জাতীয় পার্টিতে যোগদান) তৃতীয় সংসদ থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়। এরপর ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ডা. দীপু মনির হাত ধরে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। তিনি বর্তমান সংসদেও আছেন।

আসছে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দীপু মনি আবার আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করবেন—এটা প্রায় নিশ্চিত বলে দাবি তাঁর সমর্থকদের। তবে দলের আরো দুই নেতা এখান থেকে নির্বাচন করতে চান। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী এবং কেন্দ্রীয় মত্স্যজীবী লীগ নেতা রেদওয়ান খান বোরহান।

অন্যদিকে নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। এ বিষয়ে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা। অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য এবং অন্যরা তাঁদের সতীর্থদের নিয়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মাঠ গরম রেখেছেন।

আওয়ামী লীগ : প্রথম দফা সংসদ সদস্য হওয়ার পর ডা. দীপু মনিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। দীপু মনির বাবা এম এ ওয়াদুদ ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী হলেও তিনি রাজনীতিতেও শক্ত অবস্থানে আছেন। তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

একসময় ডা. দীপু মনির সঙ্গে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া এবং বর্তমান সাধারণ সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম দুলাল পাটোয়ারীর চরম বৈরিতা ছিল। সেই বিরোধ কাটিয়ে তাঁদের মধ্যে এখন মধুর সখ্য। অন্যদিকে, দীপু মনির ঘনিষ্ঠজন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি, বর্তমানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ওচমান গণি পাটোয়ারীর মধ্যে দূরত্ব বেড়েই চলেছে। তাঁদের এই দূরত্বের কারণে স্বস্তিতে নেই তৃণমূলের অনেকেই। নেতাকর্মীদের অনেকেই বলছে, দীপু মনি ও ওচমান গণির বিরোধ নির্বাচন পর্যন্ত যদি গড়ায় তাহলে ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভার পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আইউব আলী বেপারী কালের কণ্ঠকে বলেন, এই সরকারের সময় চাঁদপুর শহরের পুরানবাজার থেকে দক্ষিণে জেলার হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার মেঘনা নদীর তীর রক্ষায় কাজ হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে ১৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, ডিপ্লোমা মেরিন ইনস্টিটিউট, ডিপ্লোমা মত্স্য ইনস্টিউটিউট, ২৫০ শয্যার চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন হয়েছে। তাঁর দাবি, এই সবই দীপু মনির অবদান।

হাইমচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ডা. দীপু মনির কারণে হাইমচরে এখন আর কোনো দুর্ভোগ নেই। নদীভাঙন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ায় এবং উন্নয়নের কারণে চরের মানুষ সুখে আছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটোয়ারী দুলাল বলেন, ‘নৌকার বিজয় ধরে রাখার জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে দীপু মনি তাঁর নিজের অবস্থান সুদৃঢ় বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সাংগঠনিক কাঠামোতে এসে নৌকার জন্য সবাই ভোট চায়।’

মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীর সরব উপস্থিতি রয়েছে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলের ভোটে এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। রাজনীতির বাইরেও সামাজিক কাজে বেশ অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে তাঁর।

জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রব ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখে তৃণমূলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সুজিত রায় নন্দী।’

আরেক নেতা নুরুল ইসলাম মিয়াজী বলেন, ‘ভোটের মাঠে সুজিত রায় নন্দী যোগ্য প্রার্থী। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে এই আসনটি আওয়ামী লীগের ঘরেই থাকবে।’

চাঁদপুর জেলা শাখা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক এস এম জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘সংসদ সদস্য না হয়েও সুজিত রায় নন্দী এলাকার উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে চাঁদপুরে আওয়ামী লীগ আরো শক্তিশালী হবে।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী সুজিত রায় নন্দী বলেন, ‘আমি শেখ হাসিনার হাতকে মজবুত করতে এবং দেশের জন্য কাজ করছি। আশা করি দল এবার আমাকে মূল্যায়ন করবে।’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে আরেকজন মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি হলেন কেন্দ্রীয় মত্স্যজীবী লীগের সহসভাপতি রেদওয়ান খান বোরহান। একই সঙ্গে তিনি চাঁদপুর জেলা কমিটিরও সভাপতি। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে সদর ও হাইমচরের রাজনীতির মাঠে নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

সাবেক ব্যাংকার ও মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু রাজনীতিতেই নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক কাজে রেদওয়ান খান বোরহানের বেশ অবদান রয়েছে। দুস্থ লোকজন ও জেলেদের সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করে ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছেন তিনি।

চাঁদপুর পৌর আওয়ামী লীগ নেতা রাধা গোবিন্দ সাহা বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই মত্স্যজীবী লীগ নেতার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং গণসংযোগ অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।’

হাইমচর উপজেলা মত্স্যজীবী লীগ সভাপতি মাসুদুর রহমান উজ্জ্বল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে রেদওয়ান খান বোরহান চাঁদপুর শহরে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী শোডাউন করেন। এ নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ থাকলেও অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছে।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী রেদওয়ান খান বোরহান বলেন, ‘মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর প্রাপ্যতা অনুযায়ী সম্মান এবং মর‌্যাদা দান করেন। এলাকাবাসীর জন্য যদি ভালো কিছু করে থাকি এবং করার ইচ্ছা পোষণ করি তাহলে তার প্রতিদান অবশ্যই পাব।’ তিনি আরো বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে সাধারণ মানুষের পাশে আছি। সেই লক্ষ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবার সমর্থনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার আগ্রহ রয়েছে।’

বিএনপি : দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে চাঁদপুরে বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে জেলা কমিটির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিককে ঘিরে বিএনপির কার্যক্রম চলছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন মামলা রয়েছে। প্রতিনিয়ত আদালতে হাজিরা দিচ্ছে এসব মামলায় জড়িতরা। এই অবস্থায় আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। চাঁদপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালে সাবেক মুসলিম লীগ, কিছু বাম নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ বিএনপিতে যোগদান করে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দলের প্রার্থী অ্যাডভোকেট দেওয়ান আব্দুল আলী আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছে হেরে যান। তবে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আসনটি নিজেদের দখলে নেয় বিএনপি। পর পর দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এম আব্দুল্লাহ। ২০০১ সালে প্রার্থী পরিবর্তন হলে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি এস এ সুলতান টিটো। নবম সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আবারও প্রার্থী পরিবর্তন। এবার মনোনয়ন পান জি এম ফজলুল হক। এর আগে মতলব দক্ষিণ উপজেলা ও সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-৩ আসনে দুইবার সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে নতুন সীমানা বিন্যাসে সদর উপজেলার সঙ্গে হাইমচর যুক্ত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. দীপু মনির কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান বিএনপির জি এম ফজলুল হক।

ওই সময় বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তুমুল আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের সমর্থকরা। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।

হাইমচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সফিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৮ সালে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক মনোনয়ন পেলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। তখন হাইমচরের মানুষের কাছে জি এম ফজলুল হক ছিলেন অনেকটা অপরিচিত। তাই বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি হেরে যান।

একই উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনউল্যাহ বেপারী বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হাইমচরের বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। চাঁদপুর-৩ আসনে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিককে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে দাবি জানান তিনি।

চাঁদপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সলিমউল্যাহ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের শত জুলুম, অত্যাচার, নির‌্যাতন সহ্য করেও মানিক সাহেব বিএনপিকে সংগঠিত করেছেন। আগামী নির্বাচনে যদি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিককে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে বিএনপির বিজয় সুচিশ্চিত।

জেলা যুবদলের সভাপতি শাহজালাল মিশন বলেন, তবে সবদিক বিবেচনায় মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে শক্ত অবস্থানে আছেন শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক।

ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, ‘আগে দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। তারপর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হোক। এতে প্রমাণ হবে বিএনপি কতটা জনপ্রিয়।’ তিনি আরো বলেন, তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় এই আসনটিতে বিএনপির জয় নিশ্চিত।

অন্যদিকে, বিএনপি থেকে এই আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন সাবেক সংসদ সদস্য জি এম ফজলুল হক, সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা ও চাঁদপুর পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান সফিকুর রহমান ভূঁইয়া।

অন্যান্য দল : গণফোরাম থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা সেলিম আকবর। জাতীয় পার্টি থেকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম আলমও নির্বাচন করতে পারেন বলে জানা গেছে।

  • সমকাল