আজ মুহিত ম্যাজিক

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮ | আপডেট: ৪:০১:পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮
আজ মুহিত ম্যাজিক

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচনের ছয় মাস আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আজ জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন। বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এটা শেষ বাজেট। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ভোটের হিসাব বিবেচনায় সবাইকে খুশি করার চেষ্টা থাকবে বাজেটে। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, তিনি এবার নতুন কর বসাবেন না। সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করবেন। কিন্তু বাজেটের আকার বরাবরের মতো এবারও অনেক বড় হচ্ছে। ফলে নতুন কর না বসলেও জনগণের কাছ থেকেই অতিরিক্ত টাকা তাকে আদায় করতে হবে। এখন অর্থমন্ত্রী কী ম্যাজিক দেখাবেন, কোন কৌশলে রাজস্ব আদায় বাড়াবেন, তা নিয়ে জনমনে বিশেষ কৌতূহল রয়েছে। তবে আশার কথা হলো দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ আপাতত অনুকূলেই রয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে সারাদেশের জনপ্রতিনিধিদের এলাকায় বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বেশি বরাদ্দের চাপ আছে। চাপ রয়েছে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও খাতে। পিছিয়ে পড়া গরিব জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। এদিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে জিনিসপত্রের দাম। বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ব্যবসায়ীদের খুশি করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। নানামুখী চাপ মোকাবেলা করে ভোটারদের তুষ্ট করতে এ বাজেটে পদক্ষেপ নিতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। যদিও অর্থমন্ত্রী বলছেন, এটা নির্বাচনী বাজেট বা ভোটার তুষ্টির বাজেটও নয়। বাজেট সব সময় জনগণের সার্বিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই দেওয়া হয়। এটাও সে রকম একটি বাজেট। তবে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, নির্বাচনী ভাবনায় বিশাল বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।

ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদামবরম বাজেট দিয়ে বেশ বাহবা পান। চিদামবরমের বাজেটকে বলা হয়েছিল ‘স্বপ্নের বাজেট’। ভারতে এ পর্যন্ত যত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, তার দেওয়া বাজেটটিই ছিল অনেকটা ব্যতিক্রম। এ জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার শেষ বাজেটে কি জনগণকে স্বপ্ন দেখাতে পারবেন? তিনি কি পারবেন ভোটারদের মন জয় করতে? এ প্রশ্ন এখন অনেকের।

এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে আজ দুপুরে জাতীয় সংসদে। অর্থমন্ত্রী অবশ্য ইতিমধ্যে বলেছেন, এবারের বাজেটে জনগণ খুশিই হবেন। কারণ নতুন কোনো কর বসবে না। জিনিসপত্রের দামও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বর্তমান সরকার প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সময় পাবে ছয় মাস। বাকি সময় নির্বাচিত নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এই বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে বরাবরের মতোই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির পাঁচ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা ইতিমধ্যে এনইসিতে অনুমোদন হয়েছে। নতুন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রাক্কলন করা হয় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়াও সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান বাড়ানো। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তরুণ। তাদের কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। গত কয়েক বছর ধরে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসছে না। স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। এ কথা সবাই স্বীকার করেন, বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে না। অর্জিত হবে না কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অন্যতম দুশ্চিন্তার কারণ। জ্বালানি তেলের দাম যত বাড়বে, আমদানি ব্যয়ও তত বাড়বে। এর সঙ্গে যদি রফতানি প্রত্যাশিত হারে না বাড়ে, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া প্রভাব পড়বে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে মুহিতকে। এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে। গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না সরকারের হাতে। এতে সার্বিক উৎপাদন খরচ বাড়বে।

তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাত শান্ত। রফতানি আয় প্রবৃদ্ধি ও বিদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সও বাড়ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ আনেকটা অনুকূলে। এসব দিক বিবেচনা করলে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বাজেট আকারে বড় হচ্ছে। আবার বাস্তবায়নের হার কমছে। ফলে বাজেটের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি মনে করেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে বাড়তি কিছু সুবিধা থাকবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা সুষ্ঠু ও সময়মতো খরচ হবে কি-না। জনগণ এর সুফল পাবে কি-না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত সমকালকে বলেন, বিশাল এ বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের বছরে বাজেটে এর প্রতিফলন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়া হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও বাড়বে। নতুন করারোপ হবে না। এসব পদক্ষেপ তো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে করা হবে। তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নে মানসম্মত খরচের পরামর্শ দেন তিনি।

আজ সকাল ১০টায় সংসদে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন দেওয়া হবে। এর পরই বাজেট বক্তৃতা শুরু করবেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে ৫ জুন থেকে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। ২৯ জুন অর্থবিল পাস হবে। এর পরের দিন পাস হবে নতুন বাজেট। প্রতিবারের মতো এবারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাজেট উপস্থাপন করা হবে সংসদে।

যেসব পদক্ষেপ থাকতে পারে :রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে বরাদ্দ থাকবে। বরাদ্দ থাকবে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির জন্য। রফতানিকে উৎসাহিত করতে আরও বেশি প্রণোদনা থাকবে। বিদ্যুৎ, কৃষি, খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেওয়া হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে পদ্মা সেতু, পদ্মা রেললিংক, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে বেশি বরাদ্দ থাকবে। বরাদ্দ থাকবে সরকারি চাকরিজীবীদের ফ্ল্যাট ক্রয় কিংবা বাড়ি নির্মাণে কম সুদে ঋণের জন্য আলাদা বরাদ্দ। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির কাজে গতি আনতে এবারও আলাদা বরাদ্দ থাকছে। নানা সমালোচনার মুখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে এবারও থোক বরাদ্দ থাকছে। অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ সময়ের লালিত স্বপ্ন ‘সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা’ বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখার ঘোষণা থাকবে। নির্বাচন সামনে রেখে এসবসহ আরও কিছু চমক থাকতে পারে অর্থমন্ত্রীর বাজেটে।

সামাজিক সুরক্ষা :প্রতিবছর বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়লেও এবার আগের চেয়ে বেশি বাড়ানো হচ্ছে। এবার আগের চেয়ে অতিরিক্ত দশ লাখ দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হচ্ছে। উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন ও দুগ্ধদানকারী গরিব কর্মজীবী মায়ের জন্য ভাতা বাড়ছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি ভাতা বাড়ানো হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতার পাশাপাশি বাড়তি সুবিধা হিসেবে বৈশাখী ভাতা এবং বিজয় দিবস ভাতার ঘোষণা থাকছে।

কিছু ‘নির্বাচনী’ প্রকল্প :ভোটের বছরে স্কুল ভবন, এলাকায় মাদ্রাসা ভবন নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন সাংসদরা। এর বাইরে মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে আরও দুইশ’ মাদ্রাসা নির্মাণের। এ ছাড়া এমপিদের নির্বাচনী আসনে মসজিদ-মন্দির, উপাসনালয় নির্মাণে আলাদা বরাদ্দ থাকছে। এ ছাড়া প্রত্যেক এলাকায় সাংসদদের জন্য পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে অবকাঠামো খাতের চলমান যে প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে তা নতুন বাজেটে অব্যাহত থাকছে।

কর প্রস্তাব :ব্যয়ের সিংহভাগ আসবে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্ক্ক থেকে। এই তিন খাত থেকে এনবিআরের মাধ্যমে দুই লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। কিন্তু বাজেটে নতুন কর বসছে না। ফলে কীভাবে বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। জানা গেছে, ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার কমিয়ে আয়করে বড় পরিবর্তনের ঘোষণা আসতে পারে। প্রান্তিক করদাতাদের আয়ে করহার কিছুটা কমতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট হার বাড়তে পারে :বর্তমানে আমদানি এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৪ শতাংশ ভ্যাট আরোপ আছে। এসব ক্ষেত্রে হার ৫ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে। আসবাবপত্র উৎপাদনে বর্তমানে ৬ শতাংশ ভ্যাট আরোপ আছে। এখানে সাত শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হতে পারে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বেশ কিছু পণ্য যেমন- টমেটো সস, ফলের জুস, বিভিন্ন ধরনের পেপার, কটন ইয়ার্নসহ আরও বেশ কয়টি পণ্যের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করা হতে পারে। সিগারেটের করহার বাড়তে পারে। এ ছাড়া গুল, জর্দাসহ তামাকজাত পণ্যের শুল্ক্ককর বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকছে। বর্তমানে ভ্যাট আইনে ছাড় দিয়ে একাধিক হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। এখন এমন দশটি স্তর আছে। এই দশটি স্তর থেকে কমিয়ে ছয়টি স্তরের ঘোষণা আসতে পারে। আমদানি শুল্ক্কে বেশ কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের শুল্ক্কহার বাড়তে পারে। তবে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় বেশ কিছু কাঁচামালের কাস্টমস ডিউটি ও সম্পূরক শুল্ক্ক কমতে পারে।

  • সমকাল