অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

প্রকাশিত: ৪:২৭ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০১৮ | আপডেট: ৪:২৭:অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০১৮

আমতলী সরকারী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমান পেয়েছে তদন্ত দল। তারা এ টাকা ফেরতের সুপারিশ করেছে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালকের নিকট। এঘটনার সাথে জড়িত আরেক দোসর প্রদর্শক মো: মোজাফফর হোসেন সেলিম এর দুর্নীতির কথাও উল্লেখ রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
আমতলী কলেজ সূত্রে জানা গেছে, সাবেক অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমান ২০০৮ সালের ৫ জুলাই আমতলী সরকারী কলেজে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই অধ্যক্ষ মো: মুজিবুর রহমান নানা ভাবে দুর্নীতি করে আসছেন। তার এ দুনীতির বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী অধ্যাপক (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) গাজী মো: আব্দুল মন্নান বাদী হয়ে ২০১৭ সালের ১৪ ফেবরুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি আবেদন করেন। আবেদনে মো: আব্দুল মন্নান রশিদ বইয়ে জালিয়াতি, কলেজ শিক্ষকদের নিকট থেকে ঘুষ গ্রহন, গাছ বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ, ব্যাংকের হিসাব থেকে টাকা আত্মসাৎ, পরীক্ষায় দুর্নীতি এবং এসকল টাকায় নিজের নামে বিপুল পরিমান জমি ক্রয় করারসহ ৬ টি বিষয়ের উপর অভিযোগ আনেন। গাজী আব্দুল মন্নানের আবেদন পত্রটি ২৪ ফেরুয়ারি শিক্ষা অধিদপ্তর গ্রহন করে তা তদন্তের জন্য মাউসি ২৩ এপ্রিল ২০১৭ তারিখের ৩৭.০২.০০০০.১০৩.০৪.০১৪.২০১৭/১৫৮০/সি-৯ সি-১ নং স্মারকে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক (বর্তমানে বরিশাল বোর্ডের চেয়ারম্যান) প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসকে দায়িত্ব প্রদান করেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ২০১৭ সালের ৬ ও ৭ মে কলেজের সকল শিক্ষক ও কর্মচারী এবং অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানের উপস্থিতে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেন।
তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ২ আগস্ট প্রফেসর মো: ইউনুস শিক্ষা অধিদপ্তরের মাহাপরিচালক বরাবর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি দীর্ঘ দিন ধরে ধামা চাপা দিয়ে রাখার পর সম্পতি সেটি জানাজানি হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রফেসর মো: ইউনুস উল্লেখ করেন যে, ছাত্রদের নিকট থেকে ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, সেশন চার্জ, বেতন ও অন্যন্য টাকা রশিদের মাধ্যমে আদায় করার কথা। রশিদ জালিয়াতি করে ১৮৪৩ জন শিক্ষার্থীর নিকট থেকে এক বছরে আদায় করেছেন ৯২ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা। অথচ খাতায় আয় দেখিয়েছেন ২৩ লাখ টাকা। এভাবে ৮ বছরে অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমান আত্মসাৎ করেছেন ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। কলেজের ৪৪ জন শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট থেকে জাতীয় করণের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দেয়ার কথা বলে মজিবুর রহমান ২১ লাখ ১০ হাজার টাকা গ্রহণ করে নিজে আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় আমতলী সরকারী কলেজের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী ইউসুফ মিয়া বাদী হয়ে ২০১৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি ৪০ দিন হাজত বাস করেন। হাজত বাসের পরপরই তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আমতলী সরকারী কলেজেন অর্থনীতি বিভাগের জেষ্ঠ্য অধ্যাপক গাজী মো: আব্দুল মন্নানকে ২ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন রাষ্ট্রপতির আদেশ ক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ এর সিনিয়র সহকারী সচিব ফাতেমাতুল জান্নাত।
এছাড়া ২০১৫ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় অধ্যক্ষের সহযোগিতায় পরীক্ষা কেন্দ্রে ব্যাপক হারে নকল সরবরাহ করায় পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করা হয় এবং অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানকে ৫ বছরের জন্য পরবর্তী সকল পরীক্ষাকার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়। কলেজ জাতীয় করনের পরপরই তারাহুরা করে কলেজের অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমান কলেজ ক্যাম্পাসের আকাশ মনি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ বিক্রি করে ২ লক্ষ টাকাসহ সর্বমোট ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রফেসর মো: ইউনুস দুর্নীতি আশ্রয় নিয়ে আয় করা সমুদয় টাকা কলেজ তহবিলে ফেরৎ দেয়ার সুপারিশ করেছেন তার রিপোর্টে। এ ছাড়া অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমান কলেজের টাকা আত্মসাৎ করে তার নিজের নামে ৮৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার কৃষি জমি ক্রয়সহ তার ছেলেদের বিভিন্ন প্রাইভেট কলেজে আয় বর্হিভূত লাখ লাখ টাকা খরচ করে লেখা পড়া করান বলেও উল্লেখ করেন।
অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাকে হয়রানি করার জন্য প্রতিপক্ষ মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করেছে।
অভিযোগকারী গাজী মো: আব্দুল মন্নান জানান, অভিযোগের পর তদন্তে সকল অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে। এখন আমরা সাবেক অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানের বিচার দাবী করছি।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বরিশাল শিক্ষা অঞ্চলের পরিচালক (বর্তমানে বরিশাল বোর্ডের চেয়ারম্যান) প্রফেসর মো: ইউনুস জানান,উভয় পক্ষের কাগজ পত্র দেখে যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন মাহাপরিচালক বরাবর দাখিল করেছি।
ধরা ছোয়ার বাইরে সেলিম
আমতলী সরকারী কলেজে রসায়ন বিভাগের প্রদর্শক মোজাফফর হোসেন সেলিম সাবেক অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানের একজন দোষর। কলেজে তিনি একজন বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ ব্যাক্তি হিসেবে পরিচিত। শিক্ষক কর্মচারী সবাই তাকে বাঁকা চোখে দেখে। কলেজে ১জন হিসাব রক্ষক ও ২ জন অফিস সহকারী থাকলেও অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানের সময় তারা কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। অঘোষিত ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন আমতলী সরকারী কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রদর্শক মো: মোজাফফর হোসেন সেলিম। তিনি কলেজের সকল হিসাব নিয়ন্ত্রন করতেন। এক্ষেত্রে কলেজের ভর্তি, ট্রান্সক্রিপট প্রদান, শিক্ষার্থীদের মুল সনদ বিতরণ, শিক্ষার্থীদের জাতীয় পরীক্ষার প্রবেশ পত্র বিতরণ, রেজিষ্ট্রেশন করা থেকে সকল কাজের সাথে যুক্ত থেকে অধ্যক্ষ মজিবুর রহমানের সময়কালে ১০ বছর ধরে সে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মোজাফফর হোসেন সেলিম বিএনপি জামাত সমর্থক হলেও টাকার বিনিময়ে সকল দলের নেতাদের ম্যানেজ করে তার আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। কলেজে ‘মি: টেন পার্সেন্ট’ নামেও খ্যাতি রয়েছে এই দুর্নীতির বরপুত্র সেলিমের। কলেজ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অবৈধ অর্থের মাধ্যমে তিনি তালতলীর ছাতনপাড়া গ্রামে গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল অট্টালিকা। অধ্যক্ষ মজিবুর রহমানের অর্থ আত্মসাতের সাথে সেলিম জড়িত রয়েছে বলেও তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযুক্ত প্রদর্শক মোজাফফর হোসেন সেলিম সাবেক অধ্যক্ষ মো: মজিবুর রহমানেকে সহযোগিতার কথা স্বীকার করে বলেন, এখনো আমাকে ক্যাশিয়ারের কাজ করতে হয়। টাকা আত্মসাতের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।